kalerkantho

শুক্রবার । ১ জুলাই ২০২২ । ১৭ আষাঢ় ১৪২৯ । ১ জিলহজ ১৪৪৩

পরীক্ষার মুখে মার্কিন গণতন্ত্র

ইয়োসি মেকেলবার্গ

২৩ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পরীক্ষার মুখে মার্কিন গণতন্ত্র

যুক্তরাষ্ট্রে ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ভোটগ্রহণের অনেক আগে থেকে প্রায় দুই বছর ধরে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর সমর্থকরা দাবি করছিলেন যে নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কারচুপির আশ্রয় নেবে। এমনকি জো বাইডেনের কাছে ট্রাম্পের হেরে যাওয়া নিশ্চিত হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্তও তা চলতে থাকে। এখন সেই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলোর যে তদন্ত চলছে, তাতে নির্বাচনটির নির্বাচনী বিশুদ্ধতা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা এবং ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলে বিদ্রোহের ঘটনায় জনতাকে উসকে দেওয়া ব্যক্তিদের দায় নির্ধারণ করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

মার্কিন গণতন্ত্রের টিকে থাকার স্বার্থেই এই কাজটি করা উচিত।

বিজ্ঞাপন

শুধু তা-ই নয়, সেই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা এবং একটি প্রতারণামূলক নির্বাচন প্রক্রিয়ার কাছে ট্রাম্প হেরে গেছেন বলে লোককাহিনি প্রচারের বিষয়ে মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদের সিলেক্ট কমিটি যে তদন্ত করছে, তা যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ ঐক্যের জন্যই খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নির্বাচনকেন্দ্রিক অভিযোগ ও বিদ্রোহের ঘটনাটি তর্ক সাপেক্ষে ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির পর মার্কিন গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী ঘটনা।

ক্যাপিটল হিলে সহিংস ও ভয়ংকর হামলায় গড়ানোর ঘটনাগুলো সম্পর্কে সত্যে উপনীত হওয়ার যে চেষ্টাটি চলছে তদন্তকাজের মাধ্যমে, তা কখনোই আমেরিকার জন্য বিভেদ সৃষ্টিকারী একটি ইস্যুতে পরিণত হওয়া উচিত ছিল না। বরং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মঙ্গল ও টিকে থাকাকে যাঁরা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, সেই সব আইনপ্রণেতার এমন কিছুর পক্ষে স্বতঃস্ফূর্ত ও তাত্ক্ষণিক দাবি করা উচিত ছিল।

নির্জলা সত্য হলো, বেশির ভাগ রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা তদন্তটির বিরোধিতা করছেন। এর মধ্য দিয়ে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে ট্রাম্পের আচরণ এবং দেশটির ইতিহাসে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সবচেয়ে খারাপ আক্রমণের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে কিছু গোপন করার বিষয় আছে। অথবা ইঙ্গিতটা এমনও হতে পারে যে রিপাবলিকান পার্টির ওপর ট্রাম্প যে ইন্দ্রজাল তৈরি করেছেন তা থেকে মুক্ত হতে দল এবং এর আইনপ্রণেতারা এখন সাংঘাতিকভাবে ভীত।

গত সপ্তাহে এই বিষয়ে শুনানি হয়েছে। শুনানির প্রথম রাতে যেসব প্রমাণ হাজির করা হয়েছে তা কেবল আমেরিকানদেরই নয়, বরং যাঁরা এখনো যুক্তরাষ্ট্রকে মুক্ত বিশ্বের নেতা হিসেবে দেখেন বা এই ভূমিকায় দেশটির পুনঃপ্রতিষ্ঠার অপেক্ষায় আছেন, তাঁদেরও উদ্বেগাকুল করে তোলা উচিত। কারণ ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগী ও দোসরদের কাছ থেকে সাক্ষ্যের পর সাক্ষ্য থেকে একটা জিনিস পরিষ্কার যে প্রেসিডেন্টের চারপাশের লোকজন দুটি শিবিরে বিভক্ত ছিল।

একটি পক্ষ বিবেচনাবোধ, সততা ও সাহসের সঙ্গে ট্রাম্পকে নির্বাচনের রাতে বিজয়ী ঘোষণা না করার পরামর্শ দিয়েছিল। এর পেছনে সুস্পষ্ট কারণও ছিল যে নির্বাচনের ফলটি সেই সময়ে স্পষ্ট ছিল না এবং তখন ফলাফলের বিষয়ে যদি কোনো আন্দাজও করা হতো, সেটা ছিল বাইডেনের বিজয়ের ইঙ্গিত। অন্য পক্ষটি হচ্ছে, রুডি গিউলিয়ানির নেতৃত্বাধীন অংশ। তাঁরা ট্রাম্পকে তাঁর ডেমোক্র্যাট প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করেছেন বলে ঘোষণা দেওয়ার আহ্বান জানান, যদিও তিনি জানতেন যে এই দাবিটি একেবারেই অপরিণত এবং জঘন্যতম ইচ্ছাকৃত মিথ্যা এবং এটাই ছিল বাইডেনের জয়কে একটি ‘বড় জালিয়াতি’ দ্বারা সংঘটিত বলে মিথ্যা গল্প বা লোককাহিনি গড়ে তোলা শুরু।

সুতরাং তদন্ত কমিটির কাজ হচ্ছে, এই নিছক মিথ্যাটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বারবার পুনরাবৃত্তি করেছেন কি না, তাঁকে চ্যালেঞ্জকারীদের বিরুদ্ধে তিনি উসকানি দিয়েছেন কি না এবং যারা ক্যাপিটলে হামলে পড়েছিল এবং এটিকে অপবিত্র করেছিল, তাদের উৎসাহিত করেছিল কি না।

কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশান্ত মহাসাগর তীরবর্তী পশ্চিম উপকূল এবং আটলান্টিক মহাসাগর তীরবর্তী পূর্ব উপকূলের অধিক প্রগতিশীল, উদারমনস্ক আমেরিকানদের প্রিয় মূল্যবোধ এবং এর মধ্যে বসবাসকারী অধিক রক্ষণশীল শক্তির মূল্যবোধগুলোর মধ্যে একটি বিশাল ব্যবধান মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। রক্ষণশীলরা মনে করে, আর্থ-সামাজিকভাবে তারা পেছনে পড়ে আছে। তারা ভাবে, তাদের জীবনযাত্রা হুমকির মধ্যে রয়েছে এবং একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। তারা অনুভব করে, তারা অর্থনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অভিজাত দ্বারা পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত এবং ক্ষমতার সব কেন্দ্রকে তারা নিয়ন্ত্রণ করে। এই মানসিকতাই ট্রাম্পের লোকরঞ্জনবাদের বিশাল প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি করেছে, যা মতাদর্শিক মৌলিকত্বের দিক থেকে ফাঁকা হলেও লাখ লাখ মানুষের ভয় ও আবেগকে সফলভাবে কাজে লেগেছে, বিশেষ করে বিশ্বব্যাপী অনিশ্চয়তার সময়ে।

কিন্তু যেহেতু তিনি এখনো রিপাবলিকান পার্টি এবং তাঁর সমর্থকদের মধ্যে একটি বিশাল শক্তি এবং এই বছরের শেষের দিকে মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রার্থী বাছাইয়ের ওপর একটি বড় প্রভাব রয়েছে এবং যেহেতু তিনি ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে ইচ্ছুক, তাই ৬ জানুয়ারি বিদ্রোহের তাঁর প্রকৃত উদ্দেশ্য অবশ্যই বর্তমান তদন্তের মাধ্যমে প্রকাশ করা উচিত।

জনগণকে শোনানো এবং যোগ্যতা বিচার করার জন্য ট্রাম্প ঘনিষ্ঠদের সাক্ষ্য সম্প্রচারের যে সিদ্ধান্ত কংগ্রেসের সিলেক্ট কমিটি নিয়েছে, তা একটি স্মার্ট এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ছিল। আমেরিকাজুড়েই জনগণকে শুনতে হবে যে বাইডেনের নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন সৃষ্টিকারী মিথ্যা দাবিগুলো কিভাবে তৈরি করা হয়েছিল।

একটি প্রতারণামূলক নির্বাচনের লোককাহিনি ভেঙে দেওয়া দেশটির ইতিহাসের একটি অন্ধকার অধ্যায়ের অবসান ঘটাতে পারে। আরো গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র যেটা সব সময়ই চেয়ে আসছে যে নিজেকে ‘বিশ্বের আশার আলোকবর্তিকা’ হিসেবে দেখা, সেই শ্রদ্ধার জায়গায় অর্জন করতে হলে তাঁকে এই সব কিছু পেছনে রাখতে হবে এবং কল্পনা নয়, বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে আলোচনার কেন্দ্র ফিরে আসতে হবে এবং বাস্তবিক উপাদান রয়েছে এমন একটি সভ্য ও গঠনমূলক জাতীয় বিতর্কে ফিরতে হবে।

লেখক : ব্রিটেনের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাটাম হাউসের অধ্যাপক ও মেনা কর্মসূচির অ্যাসোসিয়েট ফেলো

সূত্র : আরব নিউজ (সৌদি আরব)



সাতদিনের সেরা