kalerkantho

শুক্রবার । ১ জুলাই ২০২২ । ১৭ আষাঢ় ১৪২৯ । ১ জিলহজ ১৪৪৩

শুভ জন্মদিন

বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গীকারের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

আনু মুহাম্মদ

২৩ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গীকারের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের বয়স বাড়িয়ে দিল, আমাদের মন-মনোযোগে রাষ্ট্র, রাজনীতি ও সমাজ এলো প্রবলভাবে। মুক্তিযুদ্ধের পর পর আমি তখন স্কুলের ছাত্র, কিন্তু খুঁজছি নতুন নতুন সব প্রশ্নের জবাব। ১৯৭১ আমাদের মধ্যে স্বপ্ন তৈরি করেছে, দায়িত্ববোধ এনেছে—এই দেশকে কিভাবে মানুষের দেশে পরিণত করা যাবে? মুক্তিযুদ্ধের কারণে তখন বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের বিপ্লবী লড়াইয়ের খবর আমাদের কাছে, আগ্রহ-উদ্দীপনা তৈরি করেছে ভিয়েতনাম যুদ্ধ, কিউবার মোকাবেলা, এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বহু দেশে মুক্তির লড়াই। সে সময়ে সমাজের বিপ্লবী রূপান্তর প্রশ্ন নিয়ে, সমাজ-রাষ্ট্র নিয়ে যাঁরা ভিন্নভাবে কথা বলতেন, কাজ করতেন, যাঁদের বক্তৃতা ও লেখনীর প্রতি আমাদের আগ্রহ তৈরি হলো, তাঁদের মধ্যে প্রথম সারিতে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আহমদ শরীফ, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদত্যাগ করে যিনি বিপ্লবী রাজনীতির তাত্ত্বিক হিসেবে তখন পরিচিত—বদরুদ্দীন উমর।

বিজ্ঞাপন

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সাপ্তাহিক বিচিত্রায় ‘উপর কাঠামোর ভেতরই’ নামে সমাজ, রাষ্ট্র ও রাজনীতি নিয়ে নিয়মিত কলাম লিখতেন। তিনি আরেকটি কলাম লিখতেন ‘গাছপাথর’ নামে দৈনিক সংবাদে। তাঁর বই পড়ার আগে তাঁর কলামের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। সত্তরের দশকের শেষ দিকে বাংলাদেশ লেখক শিবির সূত্রে তাঁর সঙ্গে শারীরিকভাবে যোগাযোগ হয়। লেখক শিবির তখন নতুনভাবে সংগঠিত হচ্ছিল। তাতে তাঁরা সবাই ছিলেন। সেই সময় থেকে আমাদের একসঙ্গে কাজ করা শুরু।

শিক্ষক হিসেবে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বরাবরই খুব জনপ্রিয়। অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে তিনি নতুন চিন্তা, আগ্রহ নিয়ে এসেছেন। ক্লাসের বাইরেও তাঁর লেখা ও বক্তৃতার মধ্য দিয়ে অসংখ্য মানুষ এমন সব বিষয়ে আগ্রহী হয়েছে, যেগুলো আপাতদৃষ্টিতে কঠিন, জটিল ও প্রথাবিরুদ্ধ; সেগুলোকে তিনি সহজ ও আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরেছেন।

লেখালেখি ও শিক্ষকতার পাশাপাশি সম্পাদনায় রয়েছে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সুদীর্ঘ ইতিহাস। বেশ কয়েক বছর ধরে তিনি ‘নতুন দিগন্ত’ সম্পাদনা করছেন। এর আগেও তিনি ত্রৈমাসিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। এসব প্রকাশনার মাধ্যমে নতুন লেখক সৃষ্টি করা বা বিভিন্ন লেখকের লেখা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা তিনি দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছেন। সংগঠন ও সাংগঠনিক তৎপরতার সঙ্গেও নিজেকে অবিচ্ছিন্ন রেখেছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। ‘সমাজ রূপান্তর অধ্যয়ন কেন্দ্র’, ‘সমাজতান্ত্রিক বুদ্ধিজীবী সংঘ’—এগুলোর মধ্য দিয়েও চিন্তার জগৎ সংগঠিত করার চেষ্টা করেছেন। বাংলাদেশে যাঁরা সমাজ রূপান্তরের জন্য কাজ করেন, তাঁদের কাছে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর বড় ধরনের গ্রহণযোগ্যতা আছে। তাঁর কারণে তিনি বাংলাদেশে ‘অক্টোবর বিপ্লবের শতবার্ষিকী’ আয়োজনের ক্ষেত্রে নেতৃত্বের ভূমিকা রেখেছিলেন।

বাংলা-ইংরেজি মিলে শতাধিক বই লিখেছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি গল্প-উপন্যাসও লিখেছেন। তবে প্রধানত গবেষণামূলক কাজের প্রতি তাঁর আগ্রহ বেশি। তাঁর শিক্ষকতা, লেখালেখি, সম্পাদনা ও সাংগঠনিক কাজে যে কেন্দ্রীয় তাগিদ বা কেন্দ্রীয় লক্ষ্য তার ধারাবাহিকতায় কোনো ছেদ পড়েনি। তাঁর সব তৎপরতার কেন্দ্রীয় তাগিদ পুঁজিবাদী সমাজের অমানবিক, নিষ্ঠুর, বৈষম্যমূলক, সহিংস যে চরিত্র সেগুলোকে উন্মোচিত করে মানবিক মুক্তির পথ সন্ধান করা।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বিশ্বজুড়ে মানুষের চিন্তা ও সংগঠিত লড়াই থেকে নিজে অনুপ্রাণিত হয়েছেন, অন্যদের অনুপ্রেরণা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন এবং লক্ষ্যকে সুনির্দিষ্ট করার চেষ্টা করেছেন। তিনি সব কাজের মধ্যে, চিন্তার মধ্যে এবং বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মধ্যে সমাজকে বদলে দেওয়া বা সমাজের বিপ্লবী রূপান্তরের লক্ষ্য স্থির করেছেন, সমাজতন্ত্রের অপরিহার্যতা তুলে ধরেছেন।

একই সঙ্গে আনন্দের ও বিস্ময়কর ব্যাপার হলো—সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এই ৮৭ বছর বয়সেও তাঁর লক্ষ্যে কাজ করতে গিয়ে সামান্য ক্লান্তি স্বীকার করেননি। এখনো তিনি অক্লান্তভাবে কাজ করে চলেছেন। তাঁর সেই সক্ষমতারও কোনো ঘাটতি আমরা দেখছি না। আমরা আশা করি, আরো বহু বছর তিনি সুস্থ ও সক্রিয় থাকবেন এবং বৈষম্য ও নিপীড়নবিরোধী মানুষের চলমান লড়াইয়ে তাঁর কাজগুলো অনুপ্রেরণা দেবে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পথনির্দেশ করবে।

স্যারের ৮৭তম জন্মদিনে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র ভালোবাসা।

 

 লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়



সাতদিনের সেরা