kalerkantho

মঙ্গলবার । ৫ জুলাই ২০২২ । ২১ আষাঢ় ১৪২৯ । ৫ জিলহজ ১৪৪৩

বাইডেনের সৌদি সফরে কি তেলের দাম কমবে

রবিন মিলস

২২ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বাইডেনের সৌদি সফরে কি তেলের দাম কমবে

তেলের বাজারে ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য সৌদি বাদশাহ ও ক্রাউন প্রিন্সদের সহায়তা চেয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টদের অনুরোধ জানানোর মধ্যে নতুন কিছু নেই। রিচার্ড নিক্সন, জর্জ বুশ সিনিয়র ও জুনিয়র, বারাক ওবামা ও ডোনাল্ড ট্রাম্প—সবাই তাঁদের মেয়াদকালের কোনো না কোনো সময়ে দেশটিকে তেলের উৎপাদন সমন্বয় করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক খারাপ যাচ্ছে। এ কারণে জো বাইডেন এই তালিকায় যোগ দিতে আগ্রহী ছিলেন না।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু তাঁর দেশ যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের মূল্য প্রতি গ্যালনে গড়ে পাঁচ ডলারের বেশি বৃদ্ধি পাওয়ায় তালিকাটিতে তাঁর যোগদান অনিবার্য হয়ে পড়ে।

তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংস্থা—ওপেকের সঙ্গে রাশিয়া এবং আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানিকারক দেশের সমন্বয়ে ওপেক প্লাস গড়ে উঠেছে। গত ২ জুন সর্বশেষ বৈঠকে সংস্থাটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আগামী তিন মাসের তেল উৎপাদন ধাপে ধাপে বাড়ানো হবে। এর অংশ হিসেবে বর্তমানে মাসের প্রতিদিন চার লাখ ৩২ হাজার ব্যারেলের পরিবর্তে জুলাই ও আগস্ট থেকে উৎপাদন ছয় লাখ ৪৮ হাজার ব্যারেল করা হবে। কভিড-১৯ মহামারির সর্বোচ্চ পর্যায়ের সময় ব্যাপক উৎপাদন হ্রাস থেকে সরে আসার চিত্র এটি। উৎপাদন কমানোর সময়সীমা চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের মধ্যে এমনিতেই শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। এখন এটি এক মাস এগিয়ে আসবে।

বিশ্বজুড়ে তৃষ্ণার্ত বাজার এবং যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কারণে এই ছাড় দিচ্ছে ওপেক প্লাস। কিন্তু তেলের বাজারে এর বাস্তবিক প্রভাব পড়বে খুবই সামান্য।

ওপেক প্লাসের তিনটি সমস্যা রয়েছে। প্রথমটি হলো, বেশির ভাগ সদস্যেরই কোটা পূরণ করার মতো উৎপাদন সক্ষমতা নেই। এর মধ্যে নাইজেরিয়া ও অ্যাঙ্গোলা এবং নিষেধাজ্ঞায় থাকা রাশিয়া উল্লেখযোগ্য। ইউক্রেনে আগ্রাসনের কারণে বছরের শেষের দিকে ইউরোপে রুশ তেলের প্রায় সব আমদানি নিষিদ্ধ করতে এবং রুশ তেল কার্গোগুলোর শিপিং ও বীমার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। নিষেধাজ্ঞার ফলে এশিয়ায়ও মস্কোর তেল বিক্রি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা বাধাগ্রস্ত করবে।

ওপেক প্লাসের বৈঠকের আগে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল যে  সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে অতিরিক্ত উৎপাদনের সুযোগ দিয়ে রাশিয়ার বাধ্যবাধকতা স্থগিত করা  যেতে পারে। কিন্তু সেটা ঘটেনি। এ ছাড়া ইরানের প্রতি মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির এক এমবিডি (দৈনিক মিলিয়ন ব্যারেল) থেকে দেড় এমবিডি তেল রপ্তানি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বিশ্ববাজার। তাই সব মিলিয়ে ওপেক প্লাস এপ্রিলে তার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ২.৬৬ এমবিডি থেকে অনেক পিছিয়ে ছিল এবং মে ও জুনে এটি আরো কমে যাওয়ার কথা।

দ্বিতীয়ত হলো, ওপেক প্লাসের ব্যবস্থাপনাগত সমস্যা রয়েছে। উৎপাদন কমানোর জন্য ২০২০ সালের চুক্তিটি ডিসেম্বর পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। তাই প্রশ্ন হচ্ছে, সেপ্টেম্বর থেকে উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত মানা হবে কি না। কারণ সৌদি আরব, আরব আমিরাত এবং কিছু পরিমাণে ইরাকের পক্ষেই কেবল উচ্চতর লক্ষ্যমাত্রা থেকে সুবিধা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু যেহেতু এই তিনটি দেশেরও অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে, তাই তাদের হিসাব হচ্ছে, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞার সম্পূর্ণ প্রভাব প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এবং ত্রিপোলি, তেহরান বা অন্য কোথাও থেকে উদ্ভূত অপ্রত্যাশিত বিপদগুলো সামাল দেওয়ার জন্য তেল কিছুটা আটকে রাখাই উচিত। এ ছাড়া  চীনে লকডাউন ঝুঁকি, মূল্যস্ফীতিজনিত চাহিদা হ্রাস এবং বিশ্বের সম্ভাব্য তীব্র অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকি সম্পর্কেও ওপেক প্লাসকে সতর্ক থাকতে হচ্ছে। কারণ অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে এরই মধ্য শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও লেবাননের মতো বেশ কয়েকটি দেশ ধুঁকছে।

সুতরাং উৎপাদন হ্রাস আবারও শিগগিরই প্রয়োজন হতে পারে। তাই ওপেক প্লাস কাঠামোটিকে বিপর্যস্ত করা ঝুঁকিপূর্ণ হবে। এ ছাড়া কৌশলগত ও রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়ার কারণে রিয়াদ সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্ককে মূল্য দিতে শুরু করেছে—এটাও বিবেচনায় নিতে হবে।  

তৃতীয়ত হলো, পরিশোধনের বিষয়টি। মহামারিতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিশোধনকারী সংস্থাগুলো গ্যাসোলিন ও ডিজেলের মার্জিনে ব্যারেলপ্রতি ৪০-৫০ ডলার কামিয়ে নিচ্ছে, যা স্বাভাবিক পর্যায় থেকে অনেক বেশি। এটাই তেল পাম্পগুলোকে রেকর্ড মূল্যের দিকে ধাবিত করছে। এই বছরের শেষের দিকে মধ্যপ্রাচ্য, চীন ও নাইজেরিয়ায় পরিশোধন সক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে পরিস্থিতি সহজ হয়ে আসতে পারে। কিন্তু তত দিন পর্যন্ত বাজারে পর্যাপ্ত তেল ছাড়তে না পারা ওপেকের জন্য একটি বড় যুক্তি হয়ে দাঁড়াবে পরিশোধনগত সমস্যাটি, যেহেতু সে নিজে পরিশোধন করে না।

সুতরাং এই কারণগুলো বলছে যে একা সৌদি আরবের পক্ষে ওপেক প্লাস ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে খুব বেশি কিছু করার সুযোগ নেই। এখন পর্যন্ত দেশটি একটি চতুর ভারসাম্য বজায় রাখতে পেরেছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে খুশি করার জন্য সে ব্যবস্থা গ্রহণের একট প্রদর্শনী তৈরি করেছে এবং শেষ পর্যন্ত রাশিয়াকে বিচ্ছিন্ন না করেই বাইডেনকে সৌদি আরবে আসতে বাধ্য করেছে। এর মধ্য দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রাজতন্ত্রটির স্থায়ী গুরুত্বও তুলে ধরবেন।

অন্যদিকে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কম্পানি আরামকো জুলাই মাসের জন্য এশিয়ায় তার সরকারি বিক্রয়মূল্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়িয়েছে এবং তুলনামূলকভাবে ইউরোপের জন্য কম বাড়িয়েছে। দেশটি রাশিয়ার কাছে চীন ও ভারতের বাজার কিছুটা হারালেও রুশ তেল নিয়ে সতর্ক থাকা জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলোর বাজার ঠিকই ধরে রাখতে পারবে।

সুতরাং যাই ঘটুক, যুক্তরাষ্ট্র তার অবস্থান থেকে মুখ রক্ষার চেষ্টা করেছে। আর এ কারণেই বাইডেনের সৌদি আরবের সফরটিকে সুনির্দিষ্টভাবে তেলের ওপর গুরুত্ব না দিয়ে ইসরায়েল ও দখলকৃত পশ্চিম তীরসহ বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য সফরের অংশ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। কিন্তু সফরটির সময় এবং এ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের মধ্যপ্রাচ্য দূত ব্রিট ম্যাকগার্ক এবং জ্বালানি উপদেষ্টা অ্যামোস হোচস্টেইন যে পরিমাণ প্রস্তুতিমূলক কাজ (গ্রাউন্ডওয়ার্ক) করেছেন, তাতে প্রকৃত বার্তাটি পাওয়া যায় এবং সেটি হচ্ছে তেলের বাজারে সৌদি আরবের হস্তক্ষেপ, তা যত সীমিতই হোক।

লেখক : কামার এনার্জির সিইও এবং ‘দ্য মিথ অব দি অয়েল ক্রাইসিস’-এর লেখক

সূত্র : এশিয়া টাইমস

ভাষান্তর ও সংক্ষেপণ : আফছার আহমেদ

 



সাতদিনের সেরা