kalerkantho

মঙ্গলবার । ৫ জুলাই ২০২২ । ২১ আষাঢ় ১৪২৯ । ৫ জিলহজ ১৪৪৩

দুর্যোগ মোকাবেলায় আমরা কতটুকু প্রস্তুত

ড. সুলতান মাহমুদ রানা

২২ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



দুর্যোগ মোকাবেলায় আমরা কতটুকু প্রস্তুত

প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন যেন আমাদের নিত্যসঙ্গী। জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে আবহাওয়াসংক্রান্ত দুর্যোগের ঘটনার পরিমাণ ও তীব্রতা বাড়ছে। বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে বড় বড় দুর্যোগে অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। যেমন ১৯৮৮ সালের বন্যায় প্রায় এক কোটি লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

২০০৭ সালের বন্যা ও নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল প্রায় সোয়া কোটি মানুষ। ক্ষেতের ফসল, বাড়িঘর, গবাদি পশু, গাছপালা—সবই ধ্বংস হয়ে যায়। ভেঙে পড়ে দেশের কৃষিনির্ভর অর্থনীতি। ১৯৯১ সালে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার সমুদ্র উপকূলে প্রাণ হারায় প্রায় দেড় লাখ মানুষ। বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ে বাংলাদেশে প্রতিবছর ৩২০ কোটি ডলার বা ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২.২ শতাংশ।

চলতি শতকের ২০ বছরে বিশ্বের যে ১০টি দেশ সবচেয়ে বেশি দুর্যোগে আক্রান্ত হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ নবম। যখন এই লেখাটি লিখছি, তখন সিলেট, সুনামগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থান ভয়াবহ বন্যায় আক্রান্ত। অসংখ্য মানুষ বিপত্সীমায়। সরকারি ও বেসরকারিভাবে অনেকেই ত্রাণ তৎপরতায় যুক্ত হয়েছেন। বন্যাকবলিত এসব মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষ বা যারা দিন আনে দিন খায় তারা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে এই বন্যার প্রভাবে।

এমন ধরনের দুর্যোগ মোকাবেলায় সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে দেশের মোট জনগোষ্ঠীর কোনো সুনির্দিষ্ট ডাটাবেইস নেই। মোট জনসংখ্যার পেশা, বয়স, আয়, পারিবারিক নির্ভরশীলতা প্রভৃতি বিবেচনায় নির্দিষ্ট একটি ডাটাবেইস দেশের যেকোনো দুর্যোগ মোকাবেলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে কতসংখ্যক মানুষ চাকরিজীবী (পেশাভিত্তিক আলাদা), গাড়িচালক, রিকশাচালক, চায়ের দোকানদার, ফুটপাতের হকার, কৃষক-শ্রমিক, কুলি, মজুর, পোশাক কারখানার কর্মী, মিল-কারখানার কর্মী, ব্যবসায়ী (ধরন অনুযায়ী) প্রভৃতির যথাযথ তালিকা কিংবা ডাটাবেইস আজ পর্যন্তও তৈরি করা সম্ভব হয়নি। হয়তো এ বিষয়ে পরিসংখ্যান আছে, কিন্তু পরিসংখ্যান আর ডাটাবেইস এক নয়। পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে কোনো কিছু অনুমান করা যায়। তবে ডাটাবেইসের ভিত্তিতে যেভাবে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব, সেটি তথাকথিত পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যেখানে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক জনসাধারণ, যারা দিন এনে দিন খায়, তাদের সুনির্দিষ্ট তথ্য সরকারের কাছে থাকা দরকার। একটি পরিবারে, একটি মহল্লায়, একটি পাড়ায়, একটি গ্রামে, একটি ইউনিয়নে, একটি শহরে, একটি উপজেলায়, একটি পৌরসভায়, একটি সিটি করপোরেশনে এবং একটি জেলায় আলাদা ইউনিটে কতসংখ্যক মানুষ, নিম্ন আয়ের মানুষ এবং উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্ত রয়েছে তার সুনির্দিষ্ট তথ্য কিংবা ডাটাবেইস থাকলে বর্তমান সংকটকালে চলমান ত্রাণ কর্মসূচি অনেকটা সহজ হতে পারত। যেকোনো দুর্যোগে ত্রাণ গ্রহণ-বিতরণ এক ধরনের বড় চ্যালেঞ্জ। ত্রাণের সুষ্ঠু বণ্টন ও ব্যবস্থাপনার ভিত্তিতে যেকোনো দুর্যোগ মোকাবেলা সহজ হয়।

গণমাধ্যম সূত্রে জানা যাচ্ছে, অনেকেই ব্যক্তিগত পর্যায়ে বিচ্ছিন্নভাবে বন্যাকবলিতদের পাশে ত্রাণ নিয়ে শামিল হয়েছেন। কিন্তু কেন্দ্রীয়ভাবে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ থাকলে বিদ্যমান সব ধরনের অব্যবস্থাপনার সুযোগ থাকত না বললেই চলে। যিনি প্রকৃত প্রাপ্য, তিনি না পেয়ে অন্য কেউ পাওয়া, একজন বারবার পাওয়া, ত্রাণ চুরি যাওয়া প্রভৃতি সমস্যা থেকে মুক্ত থাকতে হলে কেন্দ্রীয় সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই। আর এ জন্য যে বিষয়টি জরুরি, সেটি হলো জাতীয়ভাবে একটি ডাটাবেইস তৈরি করা।

উল্লেখ্য, প্রতিবছরই আমাদের দেশ ছোট-বড় কোনো না কোনো দুর্যোগের মুখোমুখি হয়। বিশেষ করে বন্যা, জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ থাকেই। ফলে সরকারকে মাঠ পর্যায়ে ত্রাণ বিতরণের কাজ করতে হয়। একটি রাষ্ট্রে কতসংখ্যক মানুষ বসবাস করে, কার নাম কী, কার মাসিক আয় কত, কার পেশা কী—এ বিষয়ে একটি ডাটাবেইস করা কঠিন হলেও কাজটি একেবারে অসম্ভব নয়। দেশের বিভিন্ন বাহিনীর সহযোগিতায় দীর্ঘমেয়াদি একটি প্রকল্প গ্রহণ করে এই কাজটি একবার সম্পন্ন করতে পারলে নানা দুর্যোগের মুহূর্তে সরকারের যেকোনো উন্নয়ন কার্যক্রম এবং দুর্যোগকালীন যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণ সহজ হবে। এমনকি বিদ্যমান স্মার্ট কার্ডের (জাতীয় পরিচয়পত্র) ব্যাপ্তিকে যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে এমন উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, আট বছর আগে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জাতীয় খানা জরিপ (এনএইচডি) প্রকল্পের আওতায় দেশের প্রতিটি জেলায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটি তালিকা করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। জরিপের কাজও শেষ, কিন্তু তালিকাটি এখন পর্যন্ত তৈরি হয়নি। ওই তালিকা হলে দুর্যোগের সময়ে ত্রাণ বিতরণ কিছুটা সহজ হতো। ২০২০ সালের এপ্রিল মাসে গণমাধ্যম সূত্রে জেনেছিলাম, পর্যায়ক্রমে পাঁচ কোটি দরিদ্রকে ডাটাবেইসের আওতায় আনতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। ওই বছরের ২০ এপ্রিল থেকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ডাটাবেইস তৈরির কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। কিন্তু সেই কার্যক্রমের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে কোনো তথ্য আমার জানা নেই। তবে সম্প্রতি সপ্তাহব্যাপী ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’ নামে দেশের ষষ্ঠ জনশুমারি ডিজিটাল পদ্ধতিতে করার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। দেশের মোট জনসংখ্যা এখন কত, তা জানতেই মূলত রেলস্টেশন, লঞ্চ টার্মিনাল, বাসস্ট্যান্ডসহ এ ধরনের স্থানগুলোতে ভাসমান মানুষ গণনাসহ তাদের সম্পর্কে মৌলিক জনমিতিক, আর্থ-সামাজিক ও বাসগৃহ সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের লক্ষ্যে এই জনশুমারি শুরু হয়েছে।

সরকার ঘোষিত ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে অবদান রাখার পাশাপাশি যুগের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সময়োপযোগী, নির্ভুল তথ্য দেওয়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবারই প্রথম ‘ডিজিটাল শুমারি’ পরিচালনার উদ্যোগ নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে আমার প্রস্তাব হলো, এই কার্যক্রমকে অবশ্যই একটি জাতীয় ডাটাবেইসের আওতায় আনা উচিত, যাতে যেকোনো ধরনের দুর্যোগ মোকাবেলা সহজে করা যায়।

শুধু দরিদ্রদের কিংবা ভাসমানদের নয়, পুরো দেশের জনসংখ্যাকে একটি জাতীয় ডাটাবেইসের আওতায় আনতে পারলে শুধু ত্রাণ বিতরণ নয়, বহুমুখী সমস্যা সমাধানে জাতীয়ভাবে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে। কারণ অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও দুর্যোগ একটি নিয়মিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ফলে অপ্রত্যাশিত নানা রকম সংকট ও দুর্যোগের কার্যকর সমাধানের লক্ষ্যে টেকসই ও স্থায়ী প্রস্তুতি হিসেবে একটি জাতীয় ডাটাবেইস তৈরির বিষয়টি সরকারকে গুরুত্বসহকারে ভেবে দেখার অনুরোধ জানাচ্ছি।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 



সাতদিনের সেরা