kalerkantho

শুক্রবার । ১ জুলাই ২০২২ । ১৭ আষাঢ় ১৪২৯ । ১ জিলহজ ১৪৪৩

শুভ জন্মদিন

সুফিয়া কামাল অনিঃশেষ প্রেরণা

সীমা মোসলেম

২০ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সুফিয়া কামাল অনিঃশেষ প্রেরণা

আজ ২০ জুন, ৬ আষাঢ় বাংলাদেশের নারীর অধিকার ও মর্যাদা আদায় আন্দোলনের কর্মীদের অনিঃশেষ প্রেরণা জননী সাহসিকা কবি সুফিয়া কামালের ১১১তম জন্মদিন, যিনি পথ চলেছিলেন মানুষের প্রতি ভালোবাসা আর ইতিহাসের দায় পালনের অঙ্গীকার নিয়ে। এই অভিযাত্রায় তাঁকে পার হতে হয়েছে বন্ধুর পথ, হোঁচট খেতে হয়েছে বারবার, কিন্তু তিনি তাঁর আদর্শ, নীতি ও দায়বদ্ধতা থেকে পিছপা হননি কোনো দিন। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের বিভিন্ন সমস্যা তাঁকে যখন বিপর্যস্ত করেছে, তখনো তিনি নিজ শক্তিতে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন এবং মানবকল্যাণের পথচলা থেকে সরে দাঁড়াননি। এমনই ছিলেন মানবতাবাদী সুফিয়া কামাল।

বিজ্ঞাপন

নারীর সামগ্রিক মুক্তি অর্জনের লক্ষ্যে তিনি কাজ করেছেন আজীবন। সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে নারীর মুক্তি অর্জন ছিল তাঁর ব্রত। এ কাজে তিনি প্রথাভাঙা নারী ছিলেন। আজকের দিনে নারী আন্দোলনের স্লোগান হচ্ছে যেখানেই বৈষম্য, সেখানেই চ্যালেঞ্জ ও প্রতিবাদ। সুফিয়া কামাল তাঁর সমগ্র জীবনে চ্যালেঞ্জ করেছেন, প্রথা ভেঙেছেন, নারীর অধিকার ও মর্যাদা আদায়ের পথ তৈরি করেছেন।

দেশভাগ-পরবর্তী পূর্ব পাকিস্তানে তিনি শুধু নারীর অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নিজেকে নিয়োজিত রাখেননি, বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর সব ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় বাঙালির জাতীয় লড়াইয়ে তিনি সব সময় যুক্ত ছিলেন। ভাষা আন্দোলন, রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদসহ পাকিস্তান সরকারের বিভিন্ন দমননীতির বিরুদ্ধে তিনি সব সময় সোচ্চার ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ছিল সক্রিয় ভূমিকা।

সামাজিক আন্দোলনের কাজের পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যচর্চা ছিল অব্যাহত। সেখানেও তিনি প্রথাভাঙা নারী। নারী লেখকদের ছবি নিয়ে প্রকাশিত সওগাতের বিশেষ সংখ্যায় যুক্ত ছিলেন সুফিয়া কামাল। ১৯৩৮ সালে প্রকাশিত হয় ‘সাঁঝের মায়া’ কাব্যগ্রন্থ। এর ভূমিকা লিখেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। রবীন্দ্রনাথ এটি পড়ে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে বলেছিলেন, ‘তোমার কবিত্ব আমাকে বিস্মিত করে, বাংলা সাহিত্যে তোমার স্থান উচ্চে এবং ধ্রুব তোমার প্রতিষ্ঠা। ’ এমনটি ছিলেন সুফিয়া কামাল। তাঁর আত্মশক্তি তাঁকে সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী করে তুলেছিল।

আজকের দিনের প্রেক্ষাপটে সুফিয়া কামালের আদর্শ আমাদের কী বলে? আজকে সমাজে নারীর প্রতি সহিংসতার উত্তরোত্তর বৃদ্ধি আমরা দেখছি, যুক্ত হচ্ছে নানা মাত্রা। করোনা অতিমারি সব ক্ষেত্রেই নারীকে আরো সংকটগ্রস্ত ও প্রান্তিক করে তুলেছে। নারীর প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে, নারী কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, শিক্ষায় মেয়েরা ঝরে পড়ছেন, বাল্যবিবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই প্রবণতা নারীর সামগ্রিক অর্জনের ক্ষেত্রে উদ্বেগের বিষয়। নারী ও কন্যার ওপর করোনার অভিঘাত বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে কর্মকৌশল গ্রহণ না করলে বাংলাদেশের উন্নয়নের যে গতি তা অব্যাহত থাকবে কি না, সেটি প্রশ্ন। বাংলাদেশে নারীর অবস্থানের চিত্রে একটি বৈপরীত্য বিদ্যমান। একদিকে দেখি নারীর অগ্রসরময়তার চিত্র। সমাজ ও রাষ্ট্রের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই, যেখানে নারী দৃশ্যমান নয়। নারী আপন দক্ষতায় সমাজ ও রাষ্ট্রে তাঁর স্থান করে নিয়েছেন। পাশাপাশি আমরা দেখি নারী ও কন্যার প্রতি ক্রমবর্ধমান সহিংসতা ও নারীর প্রতি সমাজের নেতিবাচক পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। এখনো নারী কী পোশাক পরবে, কোথায় যাবে, কিভাবে যাবে, কখন যাবে, কার সঙ্গে যাবে, অর্থাৎ সার্বিকভাবে নারী নিজের জীবন কিভাবে পরিচালনা করবেন—তা সমাজ ঠিক করে দেবে। নারীর ব্যক্তি অধিকার এখানে লঙ্ঘিত হচ্ছে, যেখানে সংবিধানে নারী-পুরুষের সম-অধিকারের কথা বলা হয়েছে। ব্যক্তিজীবনে নারীর অধিকারহীনতা নারী-পুরুষের সমতার প্রধান প্রতিবন্ধকতা, যা নারীর প্রতি অধস্তন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে। নারীর ব্যক্তিজীবনের অধিকারহীনতার ক্ষেত্রগুলো বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, অভিভাবকত্ব, উত্তরাধিকারের সমতা আনার জন্য প্রয়োজন ‘অভিন্ন পারিবারিক আইন’ বাস্তবায়ন; নারী যখন তাঁর শ্রম দিয়ে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড শক্ত করছেন, দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করছেন, ব্যক্তি নারীর শ্রম দেশের কোষাগারে জমা হচ্ছে—তখন সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে তা মূল্যায়িত হচ্ছে না। সময়, শ্রম ও পেশাদারির সঙ্গে নারী তাঁর দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছেন, কিন্তু নারীর প্রতি অধস্তন ও পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সমাজ নারীকে বিবেচনা করছে।

সম্প্রতি সংঘটিত তিনটি ঘটনা এর উদাহরণ তৈরি করেছে। টিপ দেওয়ার কারণে ঢাকার এক কলেজ প্রভাষিকাকে পুলিশ কনস্টেবলের অপমান, নরসিংদী রেলস্টেশনে পোশাকের জন্য তরুণীকে হয়রানি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে গণমাধ্যমকর্মীকে রিকশা থেকে টেনে নামানোর জন্য তাঁর কাপড় ধরে টানাটানি করে যৌন হয়রানি ও নির্যাতন। আমরা একদিকে নারীকে শ্রমবাজারে দেখব, বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান উচ্চতর করবে নারীর অংশগ্রহণ আর অন্যদিকে পথে-ঘাটে, রেলস্টেশনে, কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, পরিবারে নারী সহিংসতা, যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হবেন। এসব ক্ষেত্রে শুধু নারী নয়, পুরুষের গঠনমূলক ভূমিকা নেওয়া আবশ্যক। এটি মনে রাখতে হবে, নারীর প্রতি সহিংসতা নারী ইস্যু নয়, এটি মানবাধিকারের ইস্যু, যা সামগ্রিকভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রের বিকাশকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তাই নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ ও নির্মূলে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। কিন্তু এখনো যদি তরুণ ও পুরুষ সমাজ নারীর প্রতি নেতিবাচক পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে সামাজিক ভূমিকা না নেয়, তবে সমাজের সামগ্রিক উন্নয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যা শুধু নারী নয়, বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে নারী-পুরুষ সবাইকেই পেছনে ঠেলে দেবে, স্বাধীনতার ৫০ বছরে যে অর্জন তা হারাতে হবে। এ ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। কেন যথাসময়ে অপরাধ শনাক্ত করা যায় না, অপরাধী ছাড় পাওয়ার কারণে সে আবারও অপরাধ করতে সাহসী হয়, অন্য অপরাধীকে সাহস জোগায়। বিচারের ক্ষেত্রেও দেখা যায় দীর্ঘসূত্রতা বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে লালন করছে, যার কারণে নারী ন্যায়বিচার প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। পাশাপাশি অর্থ, পেশিশক্তি, সামাজিক প্রভাবের কারণে ন্যায়বিচার ব্যাহত হচ্ছে প্রতিনিয়ত, যার বহু উদাহরণ আমরা প্রত্যক্ষ করছি।

সুফিয়া কামাল আজীবন মানবকল্যাণে কাজ করে গেছেন, গড়ে তুলেছেন বিভিন্নমুখী সংগঠন। শিশু-কিশোর সংগঠন থেকে শুরু করে নারী সংগঠন, সাংস্কৃতিক সংগঠন, জাতীয় জীবনের বিভিন্ন সমস্যা-সংকটে প্রতিরোধ কমিটি ইত্যাদি কাজে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন সামগ্রিকতা ও সম্মিলিত শক্তিতে। সুফিয়া কামালের জন্মদিনে তাঁর জীবন থেকে যদি আমরা শিক্ষা নিতে চাই, তবে আত্মমর্যাদা, আত্মবিশ্বাস এবং চ্যালেঞ্জ ও প্রতিবাদের আদর্শে দীক্ষিত হতে হবে, চলতে হবে সম্মিলিতভাবে, নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে পরিণত করতে হবে সামাজিক আন্দোলনে। জীবনভর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সুফিয়া কামাল সমাজ ও নারীর জন্য মুক্তির পথ রচনা করেছেন এবং তাঁর প্রয়াণের পর হয়ে আছেন মুক্তির অনিঃশেষ প্রেরণা।

 লেখক : যুগ্ম সম্পাদকু

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ



সাতদিনের সেরা