kalerkantho

মঙ্গলবার । ৫ জুলাই ২০২২ । ২১ আষাঢ় ১৪২৯ । ৫ জিলহজ ১৪৪৩

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ : পশ্চিমা বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দা কি আসন্ন

নিরঞ্জন রায়

২৭ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ : পশ্চিমা বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দা কি আসন্ন

পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনীতির ক্ষেত্রে একটি কথা প্রচলিত আছে—প্রতি ১০ থেকে ১৫ বছর পর অর্থনৈতিক মন্দা চক্রাকারে ঘুরে ঘুরে দেখা দেয়। আমাদের স্মরণকালে ১৯৯০ ও ২০০১ সালের দিকে স্বল্পমাত্রার অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিয়েছিল পশ্চিমা বিশ্বে। সর্বশেষ ২০০৮ সালে উন্নত বিশ্বের অর্থনীতি মারাত্মক মন্দা প্রত্যক্ষ করেছে। বলা হয়ে থাকে, ১৯৩০ সালের মহামন্দার পর উন্নত বিশ্বে ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দাই ছিল সবচেয়ে খারাপ অর্থনৈতিক অবস্থা।

বিজ্ঞাপন

তখন সাবপ্রাইম মর্টগেজ কেলেঙ্কারির মাধ্যমে আমেরিকায় অর্থনীতির ধস নামিয়ে সেই মন্দা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। আমেরিকার বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলো দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলে সরকারি অর্থ সাহায্যের মাধ্যমে কোনো মতে রক্ষা করা হয়। নতুন নতুন আইন প্রণয়ন এবং সরকারের সরাসরি আর্থিক সহযোগিতার (বেইল আউট প্যাকেজের) মাধ্যমে সেই মন্দা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হলেও পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনীতি সেভাবে আর কখনোই ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। উন্নত দেশের প্রবৃদ্ধি কখনোই সেই মন্দা-পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরে যায়নি। উন্নত বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ দীর্ঘদিন ব্যাংক সুদের হার বা বেঞ্চমার্ক রেট শূন্য বা শূন্যের কাছাকাছি রেখে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার চেষ্টা করেছে মাত্র।

২০০৮ সালের বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে উঠে ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে একমাত্র আমেরিকা হচ্ছে ব্যতিক্রম। কারণ আমেরিকার কয়েকটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য আছে তা হচ্ছে—১. বিশ্ববাজারে আমেরিকার ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্য; ২. আমেরিকার অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হচ্ছে বৃহৎ কয়েকটি প্রযুক্তিনির্ভর কম্পানি, যার সব কটিই আমেরিকায় অবস্থিত এবং ৩. আমেরিকার শক্তিশালী সর্ববৃহৎ ট্রেজারি বা বন্ড মার্কেট। প্রথমত, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে যত লেনদেন হয়, তার প্রায় ৯৫ শতাংশ হয় আমেরিকান ডলারে এবং বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ তাদের রিজার্ভের বেশির ভাগ এই ডলারেই সংরক্ষণ করে থাকে। ফলে আমেরিকান ডলারের চাহিদা সব সময়ই ঊর্ধ্বমুখী, যার একচেটিয়া সুফল ভোগ করেছে আমেরিকার অর্থনীতি। আমেরিকায় সুদের হার সর্বনিম্ন পর্যায়ে রেখেও এই ডলারের ক্রমবর্ধমান চাহিদা ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে, যা প্রকারান্তরে আমেরিকার অর্থনৈতিক মন্দা প্রতিরোধে ভালো সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। দ্বিতীয়ত, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আমেরিকার অর্থনীতির চালিকাশক্তি হচ্ছে প্রযুক্তিনির্ভর কয়েকটি বৃহৎ কম্পানি। আমেরিকায় একটি কথা প্রতিষ্ঠিত সত্য বলে ধরে নেওয়া হয় যে আমেরিকার অর্থনীতি চালায় ফাংগ অর্থাৎ ফেসবুক, অ্যাপল, অ্যামাজন, নেটফ্লিক্স ও গুগল ([email protected], Apple, Amazon, Netflix and Google)। এই পাঁচটি কম্পানির শেয়ারমূল্যের ঊর্ধ্বগতিই আমেরিকার অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে রেখেছে। এ কারণেই ফেসবুকের বিরুদ্ধে আমেরিকার নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের মতো গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও শুধু সিনেট কমিটির কাছে শুনানি ব্যতীত এই কম্পানির বিরুদ্ধে আমেরিকার সরকার তেমন কোনো ব্যবস্থাই কার্যত গ্রহণ করতে পারেনি। কারণ ফেসবুকের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কারণে যদি শেয়ারমূল্যের উল্লেখযোগ্য দরপতন হয়, তাহলে সমগ্র উন্নত বিশ্বের শেয়ারবাজারে ধস নেমে আসতে পারে। তৃতীয়ত, আমেরিকার আছে খুবই টেকসই এবং দীর্ঘমেয়াদি ট্রেজারি বা বন্ড মার্কেট, যেখানে ৩০ বছর থেকে শুরু করে শত বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ড কেনাবেচা হয়। বিশ্বের অনেক ধনাঢ্য ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং অনেক দেশ আমেরিকার দীর্ঘমেয়াদি ট্রেজারি বন্ড ক্রয় করে রেখেছে, যার ইতিবাচক প্রভাব আমেরিকার অর্থনীতি খুব ভালোভাবেই ভোগ করেছে।

২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে আমেরিকা ঠিকই তাদের অর্থনীতির ঊর্ধ্বগতি ওপরে উল্লিখিত কারণে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে মনে হয় আমেরিকাসহ পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনীতি পুনরায় মন্দার কবলে পড়ার মতো লক্ষণই শুরু হয়ে গেছে। প্রথমত, পশ্চিমা বিশ্বে দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি মানুষের জীবনযাত্রার ওপর প্রচণ্ড অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধ শুরুর তিন মাস অতিবাহিত হয়নি অথচ জ্বালানি তেলের মূল্য দ্বিগুণ হয়ে গেছে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পশ্চিমা বিশ্ব যেভাবে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রাশিয়াকে মোকাবেলা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তাতে বিশ্বের জ্বালানি তেলের বাজারে যে এমন সংকট দেখা দেবে, তা খুবই স্বাভাবিক। যুদ্ধ শুরুর পরপরই পশ্চিমা বিশ্বের এ রকম অদূরদর্শী ব্যবস্থা গ্রহণের অবস্থা দেখে ওপেক আগেই সতর্ক করেছিল যে রাশিয়াকে বাদ দিয়ে বিশ্বে জ্বালানি তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে না।

উন্নত বিশ্বে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ঊর্ধ্বগতি যেভাবে চলছে, তাতে জ্বালানি তেলের মূল্য যে কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা কেউ আঁচ করতে পারবে না। রাশিয়ার বিরুদ্ধে ঢালাও নিষেধাজ্ঞার কারণে পশ্চিমা বিশ্বের সাধারণ মানুষের পকেট কাটা যাচ্ছে আর পরোক্ষভাবে লাভবান হচ্ছে রাশিয়া। তাদের জ্বালানি তেল বিক্রি থেমে আছে বলে মনে হয় না। কারণ রাশিয়ার রেভিনিউ বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে এবং সেই সঙ্গে তাদের মুদ্রা রুবলের মানও বেড়েছে। অনেক দেশ যদি অপেক্ষাকৃত কম মূল্য নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে স্থানীয় মুদ্রায় রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি তেল আমদানি করে থাকে, তাহলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না। এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে এই অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার সুবিধা পেতে শুরু করেছে রাশিয়া আর খেসারত দিচ্ছে পশ্চিমা বিশ্বের সাধারণ মানুষ। রাশিয়া যদি ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর করে, তাহলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।   

পশ্চিমা বিশ্বে শুধু যে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে তা-ই নয়, প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে মাত্রাতিরিক্ত। এর ওপর আছে আর্থিক খরচ অর্থাৎ মর্টগেজ এবং ব্যক্তিগত ঋণের ওপর প্রদত্ত সুদ। কেননা সম্প্রতি আমেরিকা ও কানাডার কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের বেঞ্চমার্ক রেট বা ব্যাংক রেট বাড়িয়ে দিয়েছে এবং আরো বৃদ্ধি করবে বলে আগাম জানিয়ে দিয়েছে। এটিও খুবই স্বাভাবিক। কারণ মুদ্রাস্ফীতি রোধ করতে হলে তাদের একমাত্র হাতিয়ার ব্যাংক রেট বৃদ্ধি। এর কোনো বিকল্প নেই। আর এই রেট বৃদ্ধির কারণে প্রত্যেকের মর্টগেজ ও ব্যক্তিগত ঋণের ওপর প্রদত্ত সুদের হার বেড়ে গেছে। ফলে জনগণ অতিরিক্ত অর্থ ব্যাংকে পরিশোধ করতে বাধ্য হবে। এসব মাত্রাতিরিক্ত খরচ বৃদ্ধির বিপরীতে এখানকার মানুষের আয় বৃদ্ধির কোনো রকম সুযোগ নেই। ফলে এই অতিরিক্ত খরচের অর্থও সংগ্রহ করতে হবে ব্যক্তিগত ঋণের বা ক্রেডিট কার্ডের ঋণের পরিমাণ বাড়িয়ে, যার ওপর গুনতে হবে আরো অতিরিক্ত সুদ। অর্থাৎ জনগণ এরই মধ্যে মাত্রাতিরিক্ত খরচ বৃদ্ধির দুষ্টচক্রে পড়ে গেছে, যা অর্থনৈতিক মন্দার অশনিসংকেত। কারণ এই অস্বাভাবিক খরচ বৃদ্ধির কারণে যদি কিছু মানুষ মর্টগেজ ও ব্যক্তিগত ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয় এবং সে কারণে ব্যাংক যদি তাদের মর্টগেজ ঋণ আদায়ে বন্ধকি বাড়ি বিক্রির উদ্যোগ নেয়, তাহলে অর্থনীতিতে যে প্যানিক বা আতঙ্ক সৃষ্টি হবে, তা-ই অর্থনৈতিক মন্দা ত্বরান্বিত করবে, ঠিক যেমনটি হয়েছিল ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দার সময়। সব মিলিয়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে আমেরিকাসহ পশ্চিমা বিশ্বে এক ধরনের অস্থির অবস্থা বিরাজ করছে, যার সর্বোচ্চ খেসারত দিতে হচ্ছে এসব দেশের সাধারণ মানুষকে। যদি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সত্যি দীর্ঘ হয় এবং পশ্চিমা বিশ্ব যদি তাদের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা অপপ্রয়োগের কৌশল না বদলায়, তাহলে পশ্চিমা বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

 লেখক : সার্টিফায়েড অ্যান্টি মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা

[email protected]

 



সাতদিনের সেরা