kalerkantho

সোমবার । ২৭ জুন ২০২২ । ১৩ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৬ জিলকদ ১৪৪৩

নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরু যেমন হওয়া উচিত

ড. নিয়াজ আহম্মেদ

২৪ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরু যেমন হওয়া উচিত

জাতীয় সংসদে আইন পাসের মধ্য দিয়ে একটি বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ণতা পায়। এর আগেও অনেক কর্মযজ্ঞ থাকে, যেমন—আইনের খসড়া প্রণয়ন ও তা মন্ত্রিসভায় অনুমোদন, প্রয়োজনে আইনটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পর্যবেক্ষণের জন্য প্রেরণ, আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং এবং সর্বোপরি সংসদে আলোচনা। একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা মানে শিক্ষায় আমাদের দেশ আরো এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া। একটি বিশ্ববিদ্যালয় মানে দেশ ও দেশের বাইরে কর্মসংস্থানের নতুন নতুন দ্বার উন্মোচিত হওয়া।

বিজ্ঞাপন

যে জায়গায় বিশ্ববিদ্যালয়টি স্থাপিত হবে সেখানকার মানুষের কর্মসংস্থান ও আয়ের ওপরও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাব আছে। শিক্ষার আলো ছড়াতে অনবদ্য ভূমিকা রাখে বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমের শুরুটা যদি প্রস্তুতিমূলক এবং পরিকল্পিত না হয়, তাহলে এটির দাঁড়াতে অনেক সময় লাগে। বর্তমান সরকারের লক্ষ্য, বিশেষ করে অঞ্চলভিত্তিক চাহিদাকে মাথায় রেখে বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা। এটিকে আমরা অবশ্যই সাধুবাদ জানাই। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো এবং শিক্ষা কার্যক্রমের শুরুটা যদি সঠিক ও প্রস্তুতিমূলক না হয় সে ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় হয়তো চলে, কিন্তু অনেক সমস্যা মোকাবেলা করতে হয়। গুণগত শিক্ষার জন্য অবকাঠামো, কর্মকৌশল এবং শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত উপকরণগুলো সঠিক, মানানসই এবং মানসম্মত না হলে সমস্যা থেকে যায়। তাই আমাদের এসব বিষয় মাথায় নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা সমীচীন। সব কিছু মোটামুটিভাবে ঠিক না করে শিক্ষার্থী ভর্তি করে ক্লাস শুরু করলে প্রথম দিকের শিক্ষার্থীদের জানার ক্ষেত্র পরিপূর্ণ হয় না। একটু সময় নিয়ে কাজ করলে তখন এ ধরনের ঘাটতি দূর করা যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শিক্ষার গুণগত মানের সঙ্গে অবকাঠামো অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। প্রথমে ভূমি অধিগ্রহণ এবং পরবর্তী সময়ে অবকাঠামো তৈরির কাজ শুরু হয়। স্থানীয় প্রশাসন ভূমি অধিগ্রহণে সহায়তা করে। এর পরের কাজ অবকাঠামো তৈরি। নতুন কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ন্যূনতম অবকাঠামো ছাড়াই ভাড়া বাসা কিংবা অন্য কোনো ব্যবস্থায় শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করছে, যা আদৌ সঠিক নয়। প্রথমেই বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া উচিত, যাঁকে শিক্ষক হতেই হবে এমন নয়। তাঁর শিক্ষার অতীত সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কিংবা আর্কিটেকচার হলে ভালো হয়। যাঁর নেতৃত্বে থাকবে পরিকল্পনা ও উন্নয়ন এবং ইঞ্জিনিয়ারিং দপ্তর। দক্ষ ও অভিজ্ঞ লোক দিয়ে এই দুটি দপ্তর সাজাতে হবে। যাঁদের কাজ হবে মাস্টারপ্ল্যান অনুসারে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সুন্দর অবকাঠামোর নকশা তৈরি ও কাজ শুরু করা। তাঁদের অন্তত দুই থেকে তিন বছর সময় দেওয়া উচিত। এই সময়ে তাঁরা প্রয়োজন অনুযায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করবেন। আমাদের নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং কৃষিশিক্ষার ওপর জোর দিচ্ছে। কাজেই বিশেষায়িত এ বিষয়কে মাথায় রেখে ল্যাব সুবিধা ও ফার্ম তৈরিসহ যাবতীয় বিষয় বিবেচনায় অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান নির্বাচনে শহরের কাছাকাছি জায়গা বিবেচনায় নেওয়া উচিত। একেবারে শহর থেকে দূরে স্থান নির্বাচন করলে যাতায়াত ও নিরাপত্তার বিষয়টি ঝুঁকিতে থাকে। এ ছাড়া স্থানীয়দের অহেতুক প্রভাব থেকেও বিশ্ববিদ্যালয়টির মুক্ত থাকা কঠিন হয়।

অবকাঠামো একটি যৌক্তিক জায়গায় পৌঁছানোর পর শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর বিষয়টি ভাবতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে, বেশি সময় নেওয়া ঠিক নয়। এ পর্যায়ে একজন সৎ, দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষককে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ করতে হবে। তাঁর নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হবে। এক বছরের মধ্যে শিক্ষা কারিকুলাম তৈরি ও শিক্ষার্থী ভর্তির বিষয়টি ভাবতে হবে। প্রথমে অভিজ্ঞ শিক্ষকদের খোঁজ করতে হবে এবং প্রয়োজনে বিশেষ প্রণোদনা দিয়ে তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ দিতে হবে। প্রয়োজনে বড় কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রেষণে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। তাঁরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলাম পর্যালোচনা করে একটি মানসম্মত কারিকুলাম তৈরি করবেন। মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। তবেই শিক্ষার গুণগত মান উন্নত হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন পাস থেকে শুরু করে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করতে অন্তত তিন থেকে চার বছর সময় লাগতে পারে। তাতে কোনো সমস্যা নেই বরং একটি সুন্দর শুরু আমরা দেখতে পাব। আমরা যদি আজ আইন পাস করে কাল উপাচার্য নিয়োগ দিয়ে তার পরের দিন শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করি, তাহলে আমাদের শিক্ষার্থীরা শেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে। কোনো কাজের শুরুটা ভালো না হলে সামনের পথ মসৃণ হয় না। মনে রাখতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিকের সময়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে সব কিছু ঠিকমতো না হলে পরবর্তী সময়ে সমস্যা হবেই। আমরা যদি শুরুতে ভালো অবকাঠামো এবং ভালো শিক্ষক নিয়োগ দিতে না পারি, তাহলে গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। বর্তমানে আমাদের বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে যেগুলোর বয়স একেবারে কম নয়; কিন্তু অবকাঠামোসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার বড় অভাব। ঠিক এ কারণে তারা ভালো শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আকৃষ্ট করতে পারছে না। শিক্ষার্থীদের পরিবার শিক্ষাকে বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করে হয়তো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া সত্ত্বেও সেখানে তাঁদের সন্তানদের ভর্তির বিষয়ে নারাজ।

ধারাবাহিকভাবে সঠিক পথ অবলম্বন করলে আমরা ভালো বিশ্ববিদ্যালয় উপহার দিতে পারব। যেখানে শিক্ষার্থীরা শুধু সংখ্যায় নয়, গুণগত মান নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে নিজেকে উৎপাদনশীল নাগরিক হিসেবে পরিচিত করতে পারবেন।

 

 লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 



সাতদিনের সেরা