kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জুন ২০২২ । ১৪ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৭ জিলকদ ১৪৪৩

ন্যাটোতে যোগদানে ফিনল্যান্ডের সিদ্ধান্ত কি চাপে পড়ে?

মারকু সিইরা

২৩ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



গত বুধবার আমাদের ফিনল্যান্ড ন্যাটোর সদস্যপদের জন্য আবেদন করেছে। এর আগে গত ১২ মে ‘ফিনিশ জাতীয় পরিচয় দিবসে’ ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট সৌলি নিনিস্তো ও প্রধানমন্ত্রী সানা মারিন ন্যাটোতে যোগদানের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তটি ঘোষণার মধ্য দিয়ে একটি রাজনৈতিক নাটকের অবসান ঘটে।

ফিনল্যান্ডের ন্যাটোতে যাওয়ার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই পাইপলাইনের মধ্যে ছিল।

বিজ্ঞাপন

এই সিদ্ধান্তের পেছনে প্রকৃতপক্ষে বাস্তবিক ‘নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তনের’ কোনো কারণ নেই, বরং এটা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে তার হারানো আধিপত্য কিছুটা ধরে রাখার জন্য একটি মরিয়া প্রচেষ্টা। যেভাবেই হোক, বৈশ্বিক রাজনীতির এই সর্বশেষ পরিবর্তনটি যতটা ভাবা হচ্ছে, ততটা নাটকীয় নয়। আমি বিশ্বাস করি না যে রাশিয়া এর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে খুব শক্তশালী কোনো পদক্ষেপ নেবে।

কয়েক দিন আগে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন রুশ নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট কালেক্টিভ সিকিউরিটি ট্রিটি অর্গানাইজেশনের (সিএসটিও) নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে করেছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, ফিনল্যান্ড ও সুইডেনের সঙ্গে রাশিয়ার কোনো সমস্যা নেই। ন্যাটোতে তাদের প্রবেশ তাত্ক্ষণিক হুমকিও নয়। কিন্তু প্রবেশের বিষয়ে রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া নির্ভর করবে জোটের অবকাঠামোগত সম্প্রসারণের ওপর।

ন্যাটোতে যাওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে যা-ই কাজ করে থাকুক না কেন, ক্রেমলিন এটা জানে যে পশ্চিমা সংগঠনগুলো দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় ফিনল্যান্ডের রাজনীতিবিদদের আজকের এই অবস্থানের জন্য গড়ে তুলেছে। আমাদের এই মানসিকতাও সরবরাহ করা হয়েছে যে একটি দেশ হিসেবে এই মুহূর্তে আমাদের যে অবস্থান, তাতে আমরা শুধু ইউরোপীয় ইউনিয়নের একই অংশই নই, বরং মার্কিন নেতৃত্বাধীন বৃহত্তর শক্তির বলয়েরও অংশ। এই পরিস্থিতি তত দিন অব্যাহত থাকবে, যত দিন পর্যন্ত অ্যাংলো-আমেরিকান বলয়ের অস্তিত্ব থাকবে।

এখন ফিনল্যান্ডের পাশ্চাত্য ধাঁচের নিরাপত্তা নীতি বিষয়ে এ দেশের পেশাদার ও স্বতঃপ্রণোদিত উভয় ধরনের নীতি বিশেষজ্ঞরাই সর্বশেষ জুয়া খেলাটি নিয়ে আহ্লাদিত। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ কয়েক দশক ধরেই ফিনল্যান্ডকে ন্যাটোতে নিয়ে যাওয়ার জন্য লেগেছিলেন। সামরিক জোট সম্পর্কে আমার নিজস্ব নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি আছে, তবে আমাদের অবশ্যই জানতে হবে যে আসন্ন বহিরাগত নিরাপত্তা নীতির পদক্ষেপগুলোর কী পরিমাণ তাৎপর্য রয়েছে।

সমাজে বড় আকারের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক পুনর্গঠন অব্যাহত রয়েছে। ফলে বিশ্ব আবার দ্বিকেন্দ্রিক (বাইপোলার) বা বহুকেন্দ্রিক (মাল্টিপোলার) যা-ই হয়ে উঠুক না কেন, একই ধরনের বিশেষায়িত পদক্ষেপ বিশ্বজুড়েই নেওয়া হচ্ছে। এটা পশ্চিমে যেমন ঘটছে, অন্যান্য জায়গায়ও ঘটছে।

যখন ডিজিটাল ও সবুজ রূপান্তরগুলো ধেয়ে আসছে, তখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটি বিশেষভাবে জটিল জায়গায় অবস্থান করছে। যদিও কিছু বিশ্লেষক ইউক্রেন সংকট পশ্চিমা বিশ্বকে ‘একীভূত’ করেছে বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন; কিন্তু এটাও কাজ করে থাকতে পারে যে ওয়াশিংটন অনেক ইউরোপীয় দেশকে তাদের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে চাপ দিয়েছে, যা এড়ানো তাদের জন্য কঠিন।

নিঃসন্দেহে বাল্টিক দেশগুলো ও পোল্যান্ডের মতো কিছু দেশ সব সময়ই রুশবিরোধী চিন্তা করতে গিয়ে আমেরিকান যুদ্ধবাজদের সঙ্গে যোগ দেয়। তবে এটা ঠিক যে এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি সব ইইউ সদস্য রাষ্ট্রের সঙ্গে বিনিময় করা হয় না। এ ক্ষেত্রে হাঙ্গেরি পরিপক্ব নেতৃত্ব প্রদর্শন করেছে এবং রাশিয়া ও চীনের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে ভিন্নমত পোষণ করেছে।

যখন ইউক্রেনের উপকণ্ঠে যুদ্ধের কুয়াশা পরিষ্কার হয়ে যাবে, আমরা দেখতে পাব যে যুক্তরাষ্ট্র কিভাবে তার জিরো-সাম (আপসহীন) স্বার্থগুলো অনুসরণ করার জন্য পুরো ইউরোপকে একই বাহনে তুলবে। আমেরিকার ইউরোপীয় রায়তরা কি তাদের মার্কিন প্রভুকে রাশিয়াবিরোধী পদক্ষেপের মাধ্যমে সন্তুষ্ট করার প্রচেষ্টায় তাদের নিজস্ব অর্থনীতিকে কোরবানি দেবে?

ঠিক এমন একটা সময়ে রাশিয়া ও পাশ্চাত্যের মধ্যে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ফিনল্যান্ডের অতীত সুখ্যাতির অবসান ঘটতে যাচ্ছে। ফিনল্যান্ড হয়তো সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এই চিন্তা থেকে যে তার একমাত্র কাজ হলো আমেরিকার নেতিয়ে পড়া আধিপত্যের পুনরুজ্জীবনে সহায়তা করা এবং চীন ও রাশিয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের শক্তিশালী অবস্থানে উঠতে না দেওয়া।

এটা হতে পারে যে পুনর্গঠিত বিশ্বব্যবস্থাকে ‘শক্তির বলয়’ বা ‘জোট’ আকারে দেখার প্রবণতা বাড়ছে। তাই পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো ফিনল্যান্ডের সিদ্ধান্তটিকে অ্যাংলো-আমেরিকান উদারতাবাদের নবায়ন ও বিজয় হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করতে পারে। তবে ন্যাটো সম্প্রসারণের মাধ্যমে অর্জিত এই বিজয়কে বড়জোর ‘মর্মান্তিক সাফল্য’ (পরাজয়ের নামান্তর) বলে অভিহিত করা যেতে পারে। ইউক্রেনের মতোই অবনতশীল পশ্চিমারা মূলত ইন্টারনেটে জয়লাভ করছে, অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে নয়।

 

লেখক : ফিনল্যান্ডের ফ্রিল্যান্স লেখক এবং

ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক

সূত্র : সিজিটিএন

ভাষান্তর : আফছার আহমেদ



সাতদিনের সেরা