kalerkantho

মঙ্গলবার । ৫ জুলাই ২০২২ । ২১ আষাঢ় ১৪২৯ । ৫ জিলহজ ১৪৪৩

‘অস্ত্রের বিপরীতে গম’ : পশ্চিমা কূটকৌশল

অনলাইন থেকে

১৯ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘অস্ত্রের বিপরীতে গম’ : পশ্চিমা কূটকৌশল

পশ্চিমা দেশগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র তেলের মতো কৌশলগত সম্পদ নিয়ন্ত্রণের জন্য সব ধরনের চেষ্টা চালিয়ে যায়। যেহেতু বিশ্বে এই মুহূর্তে খাদ্যশস্য ক্রমান্বয়ে আরাধ্য ও কৌশলগত পণ্য হয়ে উঠছে, তাই পশ্চিমারাও এর প্রতি তাদের লোভী এবং অশুভ মানসিকতা প্রদর্শন করেছে।

গত সোমবার কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেলানিয়া জোলি বলেছেন, বৈশ্বিক খাদ্যসংকট মোকাবেলায় ইউক্রেনের বাড়তে থাকা খাদ্যশস্যের মজুদ রপ্তানিতে সহায়তা করতে পশ্চিমাদের অবশ্যই দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। তিনি আরো বলেন, ‘ইউক্রেনের সাইলো বা খাদ্যগুদামগুলোতে লাখ লাখ টন শস্য আটকা পড়ে আছে।

বিজ্ঞাপন

আমাদের আটকে পড়া ইউক্রেনীয় গম মুক্ত করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে এবং গমগুলো জাহাজে তোলার জন্য ইউরোপীয় বন্দরগুলোতে পাঠাতে হবে। ’

ইউক্রেন ‘ইউরোপের রুটির ঝুড়ি’ হিসেবে পরিচিত। তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান আইএইচএস মার্কিটের হিসাব মতে, ২০২১ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দ্বিতীয় বৃহত্তম শস্য সরবরাহকারী দেশ ছিল ইউক্রেন, যা ইইউয়ের মোট শস্য আমদানির ১৪ শতাংশ।

নিজেদের ‘রুটির ঝুড়ি’ রক্ষা করার জন্য ইউরোপীয় কমিশন গত বৃহস্পতিবার স্থলপথ সংযোগের উদ্যোগ হিসেবে ‘ইইউ-ইউক্রেন সলিডারিটি লেন’ কৌশল ঘোষণা করেছে। ইউক্রেনের সীমান্ত উন্মুক্ত করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে ইউক্রেনীয় শস্য রপ্তানির জন্য সড়ক ও রেল রুটগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে উদ্যোগটি নেওয়া হয়েছে। দ্য পলিটিকোর ইউরোপীয় সংস্করণ এ খবর প্রকাশ করে।

ইউক্রেন শুধু ইউরোপ নয়, সারা বিশ্বের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ শস্য রপ্তানিকারক দেশ। গত জানুয়ারিতে রয়টার্সের এক নিবন্ধে বলা হয়েছিল, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউক্রেন প্রতিবছর তার ভুট্টা ও গমের ৪০ শতাংশেরও বেশি মধ্যপ্রাচ্য বা আফ্রিকায় পাঠায়। কিন্তু যুদ্ধের কারণে এটা ব্যাহত হচ্ছে। এর মধ্যে জাতিসংঘ জানিয়েছে যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শস্য আমদানিকারক দরিদ্র দেশগুলোকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

একজন চীনা বিশেষজ্ঞ গ্লোবাল টাইমসকে বলেছেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই যে জোলি যে আহ্বান জানিয়েছেন তা বিশ্বের চেয়ে পশ্চিমাদের স্বার্থ রক্ষায় বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর মতে, “ইউক্রেনকে গম ছাড়তে সহায়তা করে কিছু পশ্চিমা দেশ তাদের খাদ্যসংকট সমাধানের চেষ্টা করছে। তারা ইউক্রেনের দুর্দশার সুবিধা নিয়ে অপেক্ষাকৃত কম দামে আরো খাদ্য ক্রয় করতে চায়। এ ধরনের ‘লুণ্ঠন’ এটাই তুলে ধরে যে ইউক্রেন সংকটে পশ্চিমাদের অবস্থান আত্মকেন্দ্রিক ও অর্থকেন্দ্রিক। ”

বিশ্ব খাদ্য সংকটের অবনতির কারণ হচ্ছে পশ্চিমারা রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার সংঘাত তীব্র করে তুলেছে। চীনা বিশেষজ্ঞের মতে, পশ্চিমারা চায় তারা যা করছে তাতে ইউক্রেন অর্থনৈতিকভাবে আরো বেশি লাভবান হোক। কিছু পশ্চিমা দেশ আশা করছে যে রাশিয়ার পরাজয় না হওয়া পর্যন্ত তারা যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে পারে।

এখন একদিকে আটকে যাওয়া ইউক্রেনীয় গম ‘উদ্ধার’ করার জন্য আহ্বান জানানো হচ্ছে, অন্যদিকে কিছু পশ্চিমা দেশ ইউক্রেনে অস্ত্র পাঠানো অব্যাহত রেখেছে। উদাহরণস্বরূপ ‘ইউক্রেনীয় গম মুক্তকরণের’ প্রস্তাবকারী দেশ কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো গত ৮ মে কিয়েভ সফরের পরই ইউক্রেনের জন্য নতুন অস্ত্র ও সরঞ্জাম পাঠানোর ঘোষণা দেন।

এভাবে ‘অস্ত্র প্রবেশ করা এবং গম বাহির হওয়া’ নীতি স্রেফ এটাই প্রমাণ করে যে কিছু পশ্চিমা দেশ কতটা ভণ্ডামিপূর্ণ। তারা শুধু বিজয় ও মুনাফার ভাগ নেয়, কিন্তু ব্যর্থতা বা ক্ষতির সামান্য অংশও নিতে চায় না। এই ধরনের নীতির কারণেই পাশ্চাত্য অন্যের দুর্ভোগের বিনিময়ে নিজেকে তুষ্ট করে।

ইউক্রেনে কী ঘটছে দেখুন। দেশটি রাশিয়ার বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে পশ্চিমাদের প্রক্সি হয়ে কাজ করছে। পশ্চিমারা ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন প্রদান ও সহানুভূতিশীল হওয়ার দাবি করে; কিন্তু তাদের কর্মকাণ্ড ইউক্রেনীয়দের জীবনকে উপেক্ষা এবং পূর্ব ইউরোপীয় দেশটিকে ধ্বংস করছে।

ইউক্রেনীয় শস্য রপ্তানি সমস্যা অবিলম্বে সমাধান করা প্রয়াজন। তবে এ বিষয়ে সমন্বয়ের কাজটি জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার দ্বারা পরিচালিত হওয়া উচিত। কোনোভাবেই রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের প্রবর্তক ও অনুঘটক হিসেবে পরিচিত পশ্চিমা দেশগুলো এ ধরনের আহ্বান জানানোর যোগ্য হতে পারে না।

উচিত হলো ‘ইউক্রেনীয় গম মুক্তকরণের’ আহ্বান না জানিয়ে যত দ্রুত সম্ভব যুদ্ধের সম্পূর্ণ অবসান ঘটানো। এই বিষয়টিতেই মনোনিবেশ করা উচিত, যাতে বিশ্বকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা যায়।

 

সূত্র : গ্লোবাল টাইমসের পর্যবেক্ষণ

ভাষান্তরিত



সাতদিনের সেরা