kalerkantho

বুধবার । ২৯ জুন ২০২২ । ১৫ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৮ জিলকদ ১৪৪৩

নীরব ঘাতক উচ্চ রক্তচাপ : আমাদের করণীয়

লে. কর্নেল নাজমুল হুদা খান

১৭ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নীরব ঘাতক উচ্চ রক্তচাপ : আমাদের করণীয়

১৭ মে বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস। বিশ্ব হাইপারটেনশন লীগের (WHL) সদস্য হিসেবে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও উচ্চ রক্তচাপ দিবস পালিত হচ্ছে। উচ্চ রক্তচাপ একটি নীরব ঘাতক হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। কারণ বাংলাদেশে ২১ শতাংশ মানুষ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছে।

বিজ্ঞাপন

এর মধ্যে অর্ধেক নারী এবং দুই-তৃতীয়াংশ পুরুষই জানে না যে তাদের উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা রয়েছে। নীরবে এ ব্যাধি শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ক্ষতি করতে থাকে।

রক্ত সংবহনতন্ত্র আমাদের শরীরের অন্যতম তন্ত্র, যা মূলত শরীরের বিভিন্ন অংশে প্রয়োজনীয় পুষ্টি, হরমোন কিংবা বিভিন্ন উপাদান আনা-নেওয়ার কাজ করে। হৃৎপিণ্ডটি এ তন্ত্রের প্রধান কেন্দ্র; তা থেকে সাড়া দেহে ছড়িয়ে পড়ে মহাধমনি, মহাশিরা, ধমনি, রক্তনালি, শিরা ও উপশিরায়। নদীপ্রবাহের মতোই আমাদের সারা দেহে জালের মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে এসব শিরা-উপশিরা। এদের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয় তরল রক্ত। রক্ত সংবহনতন্ত্রের কেন্দ্র বা হৃৎপিণ্ড একটি গড় সাধারণ চাপে এসব নালি বা শিরার মাধ্যমে সারা শরীরে রক্ত ছড়িয়ে দেয় কিংবা শরীর থেকে হৃৎপিণ্ডে ফিরিয়ে আনে। রক্তনালির মাধ্যমে শরীরে রক্ত ছড়িয়ে দিতে হৃৎপিণ্ড সংকোচনের সময় যে চাপ প্রয়োগ করে সেটাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় সিস্টোলিক রক্তচাপ; আর সারা দেহ থেকে রক্তকে হৃৎপিণ্ডে ফিরিয়ে আনতে হৃৎপিণ্ড প্রসারিত হতে যে প্রসারণ চাপ প্রয়োগ করে তাকে বলা হয় ডায়াস্টোলিক চাপ। সাধারণভাবে সিস্টোলিক রক্তচাপ ১২০ মিমি অব মার্কারি এবং ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ ৮০ মিমি অব মার্কারি হয়ে থাকে।

রক্ত সংবহনতন্ত্রের যেকোনো অংশে কোনো সমস্যা দেখা দিলেই এ চাপ বেড়ে যেতে পারে; অনেক ক্ষেত্রে কমেও যায়। বেড়ে যাওয়া চাপকেই বলা হয় উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন। রক্তচাপ স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে গেলে সাধারণভাবে ১৪০/৯০ মিমি অব মার্কারি বা তার বেশি হলেই বুঝতে হবে উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা রয়েছে। তবে একবার প্রেসার বেশি হলেই হাইপারটেনশন বলা যাবে না। সাধারণত পর পর তিন মাস রক্তচাপ বেশি পেলে হাইপারটেনশন রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

বিশ্বব্যাপী ১৭০ কোটির বেশি মানুষ হাইপারটেনশনে ভুগছে। এই হার ২২ শতাংশ; আফ্রিকায় এই হার ২৭ শতাংশ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ২৫ শতাংশ, পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ২৬ শতাংশ। আমেরিকা অঞ্চলে এ হার কিছুটা কম, ১৮ থেকে ১৯ শতাংশ। বিশ্বে হাইপারটেনশনে বছরে মারা যাচ্ছে প্রায় এক কোটি মানুষ, যা সব সংক্রামক রোগে মৃত্যুর চেয়ে বেশি।

অনেক ক্ষেত্রেই হাইপারটেনশনের কারণ অজানা। তবে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বংশগত বৈশিষ্ট্য, দুশ্চিন্তা বা মানসিক চাপ, স্থূলতা, ডায়াবেটিস, অলস জীবনযাত্রা, শারীরিক পরিশ্রমে কমতি, চর্বিযুক্ত খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ, ধূমপান ও অ্যালকোহল পান ইত্যাদিকে মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

উচ্চ রক্তচাপের প্রধান লক্ষ্যস্থল মানবদেহের মূল অঙ্গ মস্তিষ্ক, হৃৎপিণ্ড, কিডনি, চোখসহ বেশ কিছু        অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। হাইপারটেনশনে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ কিংবা মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সারা বিশ্বে হার্ট অ্যাটাকের অন্যতম কারণ উচ্চ রক্তচাপ। দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপে মানুষের কিডনি বিকল হয়ে যায়। বাংলাদেশে কিডনি রোগে ভুগছে এমন রোগীর সংখ্যা দেড় কোটিরও বেশি। কিডনি রোগের ফলে এলডোস্টেরন নামের হরমোন বৃদ্ধি পায়, স্থূলতা বাড়ে এবং ডায়াবেটিসের উৎপত্তি হয়। শরীরের ফুসফুস ও রক্তনালিরও বিস্তর ক্ষতি সাধন করে হাইপারটেনশন। চোখের রেটিনা নষ্ট হওয়ার অন্যতম কারণও উচ্চ রক্তচাপ।

জীবনযাত্রায় সামান্য নিয়ম-কানুন মানলেই হাইপারটেনশনের টেনশন থেকে মুক্তি লাভ সম্ভব। মূলত খাদ্য নিয়ন্ত্রণ, ব্যায়াম, শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই টেনশন দূর করা যায়। অতিরিক্ত লবণ খাওয়া পরিহার, ফ্যাট যুক্ত খাবার নিয়ন্ত্রণ, ওজন কমানো, ধূমপান ও মদ্যপান পরিহার করতে পারলেই নীরব এ ঘাতক ব্যাধি আমাদের থেকে দূরে থাকবে। লবণ খেতে হবে প্রতিদিন পাঁচ গ্রামের কম, প্রতিনিয়ত শাক-সবজি ও ফলমূল খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে, যতটা সম্ভব দুশ্চিন্তামুক্ত থাকা, উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ মতো ওষুধ সেবন, নিয়মিত রক্তের চাপ পরিমাপ ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হতে হবে।

বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস ২০২২-এর প্রতিপাদ্য ‘সঠিকভাবে রক্তচাপ মাপুন, নিয়ন্ত্রণে রাখুন এবং দীর্ঘজীবী হোন’। হাইপারটেনশন নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি এটাই।

 লেখক : সহকারী পরিচালক, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, কুর্মিটোলা, ঢাকা

 



সাতদিনের সেরা