kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জুন ২০২২ । ১৪ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৭ জিলকদ ১৪৪৩

শিরিন আকলেহ : আক্রমণের মুখে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা

অনলাইন থেকে

১৬ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আরববিশ্বের বিখ্যাত সাংবাদিকদের একজন আলজাজিরার শিরিন আবু আকলেহকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ড শুধু তাঁর বন্ধু ও অনুরাগীদের জন্যই দুঃখজনক ও বিপর্যয়কর আঘাত নয়, বরং এটি এই ভয়ংকর বার্তাও দেয় যে পবিত্র ভূমিতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আক্রমণের মুখে রয়েছে। আবু আকলেহ গত বুধবার পশ্চিম তীরের জেনিন শহরে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর একটি অভিযান কাভার করতে যাওয়া একদল সাংবাদিকের সঙ্গে অবস্থান করছিলেন। উপস্থিত সাংবাদিকদের মতে, ইসরায়েলি সেনারা তাঁর মাথায় গুলি করে।

বিজ্ঞাপন

ওই সময় তিনি এবং তাঁর প্রযোজক (যাঁকে পেছনে গুলি করা হয়) দুজনই ‘প্রেস ভেস্ট’ পরা ছিলেন। তাঁর কাতারভিত্তিক নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানটির অভিযোগ, ইসরায়েলি সেনারা ‘ঠাণ্ডা মাথায়’ আবু আকলেহকে গুলি করেছে।

অভিযোগের ব্যাপারে ইসরায়েলও স্বভাবসুলভ জবাব দেয়। তাত্ক্ষণিকভাবে দেশটি দাবি করে যে শিরিনকে গুলি করা ব্যক্তিটি ছিল একজন ফিলিস্তিনি। কিন্তু এই দাবি অসার প্রমাণিত হয় এবং সেনাদের বক্তব্যও মারাত্মকভাবে গ্রহণযোগ্যতা হারায়। এখন ইসরায়েল বলছে, তাদের সেনারা ‘দুর্ঘটনাবশত’ তাঁকে গুলি করে হত্যা করেছে। কিন্তু গুলি ছোড়া নিয়ে সাধারণের যুক্তি বলছে, ইসরায়েলের ভাবনাটা এমন যে সন্দেহাতীতভাবে অপরাধ প্রমাণ করতে হবে অথবা এই হত্যা নির্দেশিত ছিল এই দোষারোপ করার সুযোগ নেই।

এই যুক্তিতর্ক এখন আদালতে নয়, বরং জনতার আদালতে উঠছে। আবু আকলেহ একজন আমেরিকান নাগরিক ছিলেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র এই ঘটনা তদন্ত করার আহ্বান জানিয়েছে। লজ্জাজনকভাবে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিজ ট্রাস এই কাজটি করতে পারেননি। এই ঘটনার অবশ্যই তদন্ত হওয়া উচিত। যে ব্যক্তি আবু আকলেহকে গুলি করেছে, তাকে জবাবদিহি করতে হবে। কিন্তু ইসরায়েলি সেনাবাহিনী নিজেরাই তদন্ত করছে, এ জন্য তারা ফিলিস্তিনি বা বৃহত্তর বিশ্বের আস্থা পাবে না। ২০০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে কমপক্ষে ৪৭ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। ফিলিস্তিনি সাংবাদিকরা বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ, প্রায়ই তাঁদের নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক হিসেবে নয়, বরং পক্ষপাতদুষ্ট বলে ভাবা হয়। তাঁদের খুব কমসংখ্যকই সরকারি অনুমোদন (অ্যাক্রেডিটেশন) পান। তাঁদের গতিবিধি সীমাবদ্ধ থাকে এবং দায়মুক্তি নিয়েই তাঁদের ওপর হামলা চালানো হয়।

গণমাধ্যমকর্মীদের মৃত্যুর জন্য ইসরায়েল কখনো কাউকে বিচারের আওতায় আনেনি। এবার আবু আকলেহের মৃত্যু নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে যেতে চাচ্ছেন ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। এ ছাড়া তাঁকে হত্যার আগে ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব জার্নালিস্টস একই আদালতে দাখিল করা এক অভিযোগে দাবি করেছে যে ইসরায়েল যেভাবে গণমাধ্যমকে লক্ষ্য বানিয়েছে, তা যুদ্ধাপরাধের শামিল। গত মে মাসে ইসরায়েল গাজা শহরের একটি মিডিয়া ভবনে বোমাবর্ষণ করে। ভবনটিতে ফিলিস্তিনি গণমাধ্যম ও অ্যাসোসিয়েট প্রেসের (এপির) কার্যালয় ছিল। তখন ইসরায়েলের পক্ষ থেকে (কোনো ধরনের প্রমাণ ছাড়াই) দাবি করা হয়েছিল যে ভবনটি হামাস ব্যবহার করছে।

এই মুহূর্তে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করছে এবং তা আরো উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গত জুনে ইসরায়েলের বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে ইসরায়েলি বাহিনী তাদের দখলকৃত অঞ্চলে অন্তত ১৩ শিশুসহ ৭৬ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে। এভাবে ইসরায়েলে আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করা উদ্বেগের বিষয়, কারণ ব্যাপক আকারে ফিলিস্তিনিদের বিতাড়ন ও ফিলিস্তিনি গ্রামগুলো ধ্বংসের বিষয়টি সরকারি সবুজ সংকেত পেয়েছিল। দখলকৃত ভূমিতে অবৈধ বসতি স্থাপন ও সম্প্রসারণ অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েল গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার ঢেউ দেখছে। বন্দুক, ছুরি, কুড়াল হামলায় ১৮ ইসরায়েলি নিহত হয়েছে।

গতকাল রবিবার ফিলিস্তিনে নাকবা দিবস (ইসরায়েল প্রতিষ্ঠায় সৃষ্ট বিপর্যয় স্মরণ দিবস)  পালন করা হয়। ফিলিস্তিনিরা এদিন নবগঠিত রাষ্ট্র ইসরায়েলের কাছে তাদের মাতৃভূমি হারানোর শোক প্রকাশ করে। এই মুহূর্তে যখন উত্তাপ কমানো উচিত, তখন ইসরায়েল পরিস্থিতি উত্তপ্ত করেছে। গত শুক্রবার আবু আকলেহের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় শোকার্ত মানুষ পুলিশের লাঠিপেটার শিকার হয়েছে। ইসরায়েল গণতন্ত্রের জন্য গর্ববোধ করে। তাই সাংবাদিকদের ইসরায়েলি দখলদারির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ কাভার করার সুযোগ পাওয়া উচিত এবং ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর প্রমাণ করা উচিত যে তাদের পদক্ষেপ সাংবাদিকদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ নয়।

 

সূত্র : সম্পাদকীয়, গার্ডিয়ান (যুক্তরাজ্য) ভাষান্তরিত

 



সাতদিনের সেরা