kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জুন ২০২২ । ১৪ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৭ জিলকদ ১৪৪৩

দিল্লির চিঠি

উপমহাদেশে শান্তি এবং অর্থনৈতিক স্থিরতা

জয়ন্ত ঘোষাল

১৬ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



উপমহাদেশে শান্তি এবং অর্থনৈতিক স্থিরতা

১৪ এপ্রিলের কথা। আভারুদুর রাত্রি।

আভারুদু হলো সিংহলিদের নববর্ষ। সেদিন কলম্বোর রাজপথে আনন্দের উৎসব দেখা যায়নি, শুধু দেখা গেছে বিক্ষোভ আর বিক্ষোভ।

বিজ্ঞাপন

উৎসবের বদলে স্লোগান উঠেছে ‘গোতা গো হোম’। এটা ইংরেজিতে ছন্দ করে হাজার হাজার মানুষ স্লোগান দিচ্ছে ‘গোতা গো হোম’। তামিল ও সিংহলি ভার্সনেও দেখা যাচ্ছে পোস্টার-ব্যানার। মানে একটাই। তিনটি ভাষায় যা বলা হচ্ছে সেটি হচ্ছে যে এই দ্বীপ-রাষ্ট্রের দাবি একটাই, ‘প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষে ইস্তফা দাও’। এই গোতাবায়া হলো গোতা। এত বড় বিক্ষোভ গত কয়েক দশকে শ্রীলঙ্কার মানুষ দেখেনি। শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক পটপরিবর্তন শ্রীলঙ্কায় হলো। অর্থনৈতিক সংকট ডেকে নিয়ে এলো মারাত্মক রাজনৈতিক পরিবর্তন। নতুন সরকার কি পরিস্থিতিটা বদলে দিতে পারবে? কাজটা সোজা নয়। মানুষ সম্পূর্ণ আস্থা হারিয়েছিল তদানীন্তন সরকারের ওপর থেকে।

১২ এপ্রিলের কথা। শ্রীলঙ্কা একটা সাংঘাতিক সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছিল। হালের ইতিহাসে এমন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত কোনো রাষ্ট্রে নেওয়া হয়েছে বলে শোনা যায়নি। বলা হলো যে সব আন্তর্জাতিক ঋণের পেমেন্ট রাষ্ট্র করবে না যত দিন না পর্যন্ত দেশের অর্থনীতির উন্নতি হয়। রীতিমতো অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এ ব্যাপারে বিবৃতি জারি করে বলা হলো—

‘It shall therefore be the policy of the Sri Lankan Government to suspend normal debt servicing...For and interim period pending an orderly and consensual restructuring of those obligations in a matter consistent with economic adjustment program supported by the IMF .’ আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডারের কী প্রতিক্রিয়া সে তো বোঝাই যাচ্ছে। শ্রীলঙ্কার মোট বিদেশি ঋণ দাঁড়াল ৫১ বিলিয়ন ডলার। সাংঘাতিক! এই পরিস্থিতিতে এই কাহিনি শুধু শ্রীলঙ্কার কাহিনি নয়, সমগ্র উপমহাদেশে একের পর এক অর্থনৈতিক বিপর্যয়।

নেপালের অবস্থা কি ভালো? নেপালের অর্থমন্ত্রী জনার্দন শর্মা বলেছেন, আর যাই হোক আমাদের অবস্থা শ্রীলঙ্কার মতো অতটা খারাপ নয়। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে এখন তুলনা করতে হচ্ছে সবাইকে। তিনি বলেছেন, আমাদের জাতীয় ঋণ অন্য রাষ্ট্রগুলোর থেকে তুলনামূলক কম। নেপালের বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয় কমে গেছে। ফেব্রুয়ারির শেষে দাঁড়িয়েছে ৯.৭৫ বিলিয়ন ডলার। জুলাইয়ের শেষে অর্থাৎ ফেব্রুয়ারির এই বছর থেকে জুলাইয়ের শেষে তার শতকরা ৬ ভাগ নিচে নেমেছে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বলেছে যে এপ্রিল মাসে নেপালের ঋণ বেড়ে গিয়ে ৪০.১ শতাংশ হয়েছে। যেটা ২০১৬ থেকে ২০১৯-এ ছিল ২৫.১ শতাংশ। সুতরাং নেপালের অবস্থা ভালো সেটাই বা বলি কী করে? ১৫ এপ্রিল কাঠমাণ্ডুতে একজন নেপালি মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কার তাঁর পরিবার নিয়ে ছবি তুলে বলেছেন, ‘আমি কাতারে চললাম, জানি না সেখানে কী হবে? কিন্তু এখানে আমার থাকা সম্ভব নয়। ’ সেই ছবি ত্রিভুবন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকে ফেসবুকের মাধ্যমে গেছে।

পাকিস্তানের কথা তো বলাই বাহুল্য। ইমরান খানকে বিদায় নিতে হলো। সেনাবাহিনীর সঙ্গে ইমরান খানের যে দ্বৈরথ দেখা দিল, আগে যেটা ছিল আমেরিকা প্লাস পাকিস্তান, এখন সেটা হয়ে দাঁড়িয়েছে চীন প্লাস পাকিস্তান। দেশ-বিদেশের অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চূড়ান্ত আর্থিক বিপর্যয় পাকিস্তানের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ডেকে আনতে অনুঘটকের কাজ করেছে। সেই কার্ল মার্ক্সের পুরনো তথ্য, ‘অর্থনীতি হলো বৃত্তি, আর রাজনীতি এবং সংস্কৃতি হলো তার পরিকাঠামো। অর্থনীতিতে যদি বিসমিল্লাহয় গলদ হয় তখন পরিকাঠামো ধরে রাখা খুব কঠিন। ’

শ্রীলঙ্কা ও নেপালের মতো কিংবা তার চেয়েও আরো খারাপ অবস্থা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তানের। ইমরান খানের ক্ষমতার সময়সীমা মার্চ মাসে শেষ হওয়ার কথা ছিল না। সেটা এভাবে মার্চ মাসে শেষ হয়ে যাওয়াও কিন্তু ছায়া ফেলেছে। পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ আবার আশা দেখাচ্ছেন। বলছেন, আমেরিকার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ভালো করা হবে, আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডারের স্ট্র্যাকচারিং হবে। অর্থনীতির উন্নতি যদি না হয়, তাহলে প্রতিরক্ষার বাজেটেও টান পড়বে। প্রতিরক্ষা খাতেও শক্তিশালী হতে গেলে অর্থনীতিকে জোরদার হতে হয়। সুতরাং সব মিলিয়ে একের পর এক প্রতিকূল পরিস্থিতি।

এবার আসা যাক মালদ্বীপের কথায়। মালদ্বীপও এমন একটা দেশ, যেখানে অজস্র দ্বীপ। আর সেই দ্বীপে পরিবেশ যেমন একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তেমনি ধর্মীয় মৌলবাদের ভিত্তিতে অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও সংঘর্ষও আরেকটা বড় ফ্যাক্টর। স্বভাবতই মালদ্বীপের এই ঘটনা ভারতের ওপর কালো ছায়া ফেলেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, পরিবেশ একটা মস্তবড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রতিদিনের মানুষের কাছে। ফাউন্ডেশন ফর সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ বলছে, এক হাজার ৪০০ জঙ্গি মালদ্বীপে ২০১৯-এর ডিসেম্বরের তথ্য অনুযায়ী যারা বাইরে থেকে এসেছে, যারা আইএস বা ইসলামিক স্টেটের ছাতার তলায় কাজ করে তারা মালদ্বীপের সক্রিয় ৪২৩ জন, তারা ইরাক ও সিরিয়ায় ওয়ার জোনে ঢোকার চেষ্টা করেছিল। ১৭৩ জন মালদ্বীপে পৌঁছে গেছে। মালদ্বীপের মানুষের মধ্যে এরা বিপুলভাবে প্রবেশ করেছে। কী সাংঘাতিক কাণ্ড!

একদিকে মালদ্বীপের অর্থনৈতিক সংকট আর তার মধ্যে ইসলামিক মৌলবাদ। এত দিন অভিযোগ করা হতো যে বাংলাদেশের জমি কাজে লাগিয়ে পাকিস্তান ও ইসলামিক মৌলবাদী শক্তি ভারতবিরোধী কাজ করছে। আর আজ সরাসরি মালদ্বীপে দেখতে পাচ্ছি ভারতবিরোধী স্লোগান। একজন ভারতীয় চিকিৎসককে সম্প্রতি ট্যাক্সি থেকে তুলে বাইরে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এর পেছনেও মৌলবাদী শক্তি কাজ করেছে। যাতে সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ঘটনা বিপুলভাবে প্রচারিত হয় যে মালদ্বীপের অর্থনৈতিক উন্নয়ন মন্ত্রী ইজমাইল সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ভারতীয় নাগরিক মালদ্বীপে থাকে, তাদের ওপর বড় ধরনের হিংসার আশঙ্কা রয়েছে। এই বিপদ আছে বলেই এদিক থেকে ভারতের অভিযোগের ভিত্তিতে প্রায় ২০০ জন আন্দোলনকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর কোনো লোক মালদ্বীপের সরকারের অপশাসনের মধ্যে নেই।

সুতরাং মালদ্বীপের ইয়ামিন প্রশাসনের বিরুদ্ধে মৌলবাদীদের আক্রমণ ভারত বিরোধিতায় একটা চূড়ান্ত জায়গায় গেছে। আবার ভারতের মধ্যে সংখ্যালঘু সমাজের নিরাপত্তার অভাব বোধ হচ্ছে বলে যে রিপোর্ট আসছে, তাদের ওপর আক্রমণ হচ্ছে, এর ফলে আজ ভারতবিরোধী সেন্টিমেন্ট মালদ্বীপে ছড়িয়ে পড়েছে। দ্রুত সংখ্যালঘু ইস্যুতে মালদ্বীপে ইসলামিক মৌলবাদ বাড়তে শুরু করেছে। ভারত যে পরিস্থিতিটা জানে না, তা নয়। বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করেছেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল। হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা, যিনি কয়েক দিন আগেও পররাষ্ট্রসচিব ছিলেন, তিনি সাউথ ব্লকের যুগ্ম সচিব হিসেবেও মালদ্বীপের সমস্যাগুলোর সমাধানের চেষ্টা করেছিলেন সেই সময়। কেননা এখানকার অনেক পরিবার আছে, যারা মালদ্বীপে একটা মিশ্র জনবসতি, যেখানে মালদ্বীপ ও ভারতের সংস্কৃতির সংমিশ্রণ ঘটেছে। এখন এই আর্থিক পরিস্থিতিতে মুসলিমবিরোধী আক্রমণ যেগুলো ভারতে হচ্ছে, সেগুলো প্রশমিত করার জন্য ভারত সরকার যথেষ্ট সচেষ্ট হয়েছে।

এ রকম একটা পরিস্থিতিতে বলা যেতে পারে, ভারত ও বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে এই চূড়ান্ত অস্থিরতার মধ্যেও অনেক বেশি স্টেবল। বাংলাদেশের কি কোনো প্রভাব পড়ছে না? এর জবাবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। ন্যাশনাল বোর্ড অব রেভিনিউ-এনবিআর ও অর্থ বিভাগ বাংলাদেশের বিদেশি ঋণ সম্পর্কে জানিয়েছে, এখনো সেটা ‘রিস্কি লেভেল’-এর মধ্যে যায়নি। অর্থাৎ বাংলাদেশের মুদ্রাস্ফীতি এখনো শতকরা ৬ ভাগের নিচে। কভিডের মতো ভয়াবহ মহামারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পরও বাংলাদেশ ৬.৯৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি রাখতে সক্ষম হয়েছে। মাথাপিছু আয় বাড়িয়ে দুই হাজার ৫১১ ডলারে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। সুতরাং অতীতের অর্থনৈতিক সংকট সরিয়ে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশের পরিকল্পনামন্ত্রী বলেছেন, শ্রীলঙ্কার সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের পরিস্থিতি অনেক ভালো। বাংলাদেশের অর্থনীতি এই পরিস্থিতির মধ্যেও সামলানো গেছে। বাংলাদেশে কোনো খাদ্যসংকট নেই। বাংলাদেশ এখন আমদানিনির্ভর নয়। বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও সাফল্য দেখা গেছে। বাংলাদেশ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৪.৪ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যেতে পেরেছে। শ্রীলঙ্কার বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয় দুই বিলিয়ন ডলারের নিচে চলে গেছে। মির্জ্জা আজিজুল ইসলামের মতো অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কারণ বাংলাদেশ রাইট ট্র্যাকে আছে। কিন্তু এই আশা থাকলেও বাংলাদেশকেও সচেতন হতে হবে। বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নতি হয়েছে, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক সেই অর্থনীতির প্রশংসা করে বলেছে যে এই অর্থনীতির বৃদ্ধি দারিদ্র্য নিয়ন্ত্রণ করছে ২০০০ সাল থেকে। এর ফলে আজকে এ রকম সংকট মোকাবেলা করতে বাংলাদেশ সফল হয়েছে।

ভারতে এখন পর্যন্ত এই চূড়ান্ত অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও, ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধের ক্রমান্বয়ে ঝামেলা বাড়ার পরও ভারত পরিস্থিতি অনেক সামলাতে পারছে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বোঝাপড়া অনেক বেড়েছে। রাজনীতি ও কূটনৈতিক দিক থেকেও অনেক বেশি সচেতন হয়েছে। এখন নরেন্দ্র মোদি পাকিস্তানের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ব্যাপারে আগের তুলনায় কঠোর মনোভাব পরিত্যাগ করেছে। এমনকি জুলাই মাসে পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আলাপ-আলোচনার সম্ভাবনাও উঁকিঝুঁকি মারছে সিঙ্গাপুরের বৈঠকে।

এ রকম একটা পরিস্থিতিতে সত্যি সত্যিই আমাদের এখন ঝগড়া, সংঘাত, বৈরিতা—সব ভুলে গিয়ে এই উপমহাদেশকে একত্র হতে হবে। বাংলাদেশ ও ভারত যৌথ অঙ্গীকার নিয়েছে সেই মৈত্রীর পথনির্দেশিকায় সব দেশকে একত্রে শামিল হতে হবে। সেখানে এশিয়ার সব রাষ্ট্র একত্র হয়ে হাতে হাত মিলিয়ে চলতে হবে। অগ্রাধিকার দিতে হবে অর্থনৈতিক উন্নতিকে। সাম্প্রদায়িক হানাহানি এখন কোনো কাজের কথা নয়। এই মুহূর্তে তাই ভারত আর বাংলাদেশের যৌথ ভূমিকা এই উপমহাদেশে শান্তি ও আর্থিক সুস্থিরতা নিয়ে আসার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠের

বিশেষ প্রতিনিধি

 



সাতদিনের সেরা