kalerkantho

শনিবার ।  ২৮ মে ২০২২ । ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ২৬ শাওয়াল ১৪৪

শুভ বুদ্ধপূর্ণিমা

বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বুদ্ধের অহিংস নীতি

ভদন্ত বুদ্ধানন্দ মহাথেরো   

১৫ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বুদ্ধের অহিংস নীতি

ভারতীয় দার্শনিক চিন্তার জগতে মহামানব গৌতম বুদ্ধ সুপ্রাচীন কাল থেকে নিঃসন্দেহে একটি বিশেষ সম্মানিত স্থান অধিকার করে আছেন।

মানুষ সামাজিক জীব। সমাজ ছাড়া মানুষ পৃথিবীতে বাস করতে পারে না। সমাজ মানুষের জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

বিজ্ঞাপন

শুধু মানুষ কেন, জীবজন্তু, পশু-পাখি, কীট-পতঙ্গের মধ্যেও সমাজ আছে। তাই তথাগত বুদ্ধ সপ্ত অপরিহার্য ধর্মে মানবসমাজের উদ্দেশে বলেছেন, ‘অভিণহং সন্নিপাতা ভবিস্সন্তি’ অর্থাৎ সভা-সমিতির মাধ্যমে যাঁরা একত্র হয়, তাঁদের সর্বদা শ্রীবৃদ্ধি সাধিত হয়। ‘সমগ্গা সন্নিপতন্তি, সমগ্গা বুট্ঠহন্তি, সমগ্গা করণীয়ানি করোন্তি’—এর অর্থ হলো, যারা একতাবদ্ধভাবে সভা-সমিতিতে সম্মিলিত হয়, সভা শেষ হলে একত্রে চলে যায় এবং কোনো ধরনের নতুন করণীয় উপস্থিত হলে সবাই মিলিতভাবে সম্পাদন করে, তাদের সর্বদা উন্নতি, অগ্রগতি, শ্রীবৃদ্ধি হয়ে থাকে এবং অবনতির পথ বন্ধ হয়ে যায়। বুদ্ধ এখানে সংঘবদ্ধ হয়ে জীবন যাপন করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। সংঘ মানে একতা, একতা মানুষের অন্যতম শক্তি। একতাবদ্ধ থাকলে আমরা বাঁচতে পারি, দ্বিধাবিভক্ত হলে আমাদের পতন কেউ রুখতে পারবে না। ভগবান বুদ্ধ সব সময় সংঘকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। বুদ্ধ শুধু নির্দিষ্ট একটি জাতির কল্যাণের জন্য আবির্ভূত হননি। পৃথিবীর সব জাতির, সব প্রাণীর মুক্তির পথ দেখাতে এই ধরাধামে আবির্ভূত হয়েছিলেন।

বুদ্ধ তাঁর ধর্ম প্রচার করেছেন মানবজাতির দুঃখ মুক্তির জন্য। তার সঙ্গে আরো চিন্তা করেছিলেন ছোট-বড় সব প্রাণিজগেক নিয়ে। প্রাণিজগৎ বলতে দেব-মনুষ্য, পশু-পাখি, কীট-পতঙ্গ থেকে শুরু করে উদ্ভিদজগৎ পর্যন্ত। সব প্রাণীর মধ্যে সমাজ একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। তাই সমাজে সংঘবদ্ধ হয়ে পরস্পরের মধ্যে সম্প্রীতির মেলবন্ধন সৃষ্টির মাধ্যমে ক্ষণস্থায়ী জীবন সৎকর্ম সম্পাদনের মাধ্যমে কাটিয়ে দিতে পারলেই মানবজীবনের সার্থকতা।

বর্তমান যান্ত্রিক সভ্যতার প্রভাবে নতুন নতুন বিলাসসামগ্রী আবিষ্কারের ফলে মানুষের তৃষ্ণা দিন দিন বেড়েই চলেছে। অতৃপ্তি, অসন্তুষ্টি, লোভ, দ্বেষ, মোহ ইত্যাদি ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মানুষ পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে। আজ সারা বিশ্বে যে হিংস্রতার দাবানল জ্বলছে তার একমাত্র কারণ ওই ব্যাধি। ‘হায় যে বেশি চায়, আছে যার ভূরি ভূরি। ’ খাদ্য খেলে পশু-পাখির খিদে মেটে, কিন্তু মানুষের খিদে মেটে না। মানুষের খিদে যেন সর্বগ্রাসী। সারা পৃথিবীকে আত্মসাৎ করতে পারলেও মনে হবে বাকি আছে কিছু। এ অনন্ত খিদে এবং সীমাহীন তৃষ্ণার কারণেই মানুষ জীবজগতে সবচেয়ে দুঃখগ্রস্ত প্রাণী। এই দুরারোগ্য তৃষ্ণা-ব্যাধির প্রকোপে মানুষ নিজেও দুঃখী হয়, অন্যদেরও দুঃখের কারণ হয়।

পৃথিবীতে যুগে যুগে মহাপুরুষের আবির্ভাব ঘটেছে এ রকম দুঃসময়ে মানুষের মধ্যে শুভবুদ্ধি জাগিয়ে তোলার জন্য। মহামানব গৌতম বুদ্ধের আবির্ভাবও এ জন্যই হয়েছিল। তিনি মানুষের মধ্যে সুপ্ত শুভবুদ্ধিকে জাগিয়ে তোলার সাধনায়ই সারা জীবন অতিবাহিত করেছিলেন। এই যুগসন্ধিক্ষণে মহারাজ শুদ্ধোদনের ঔরসে, রানি মহামায়ার গর্ভে রাজকুমার সিদ্ধার্থের জন্ম হয়। যার প্রভাবে মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে। তিনিই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মানবপ্রেমের মর্মবাণী, উদঘাটন করেছিলেন অমৃত সত্যের পথ।

বাল্যকাল থেকে তাঁর মধ্যে গভীর সংযম ও বৈরাগ্য ভাব পরিলক্ষিত হয়। বিপুল ভোগবিলাসের মধ্যে লালিত-পালিত হলেও দিনের পর দিন যেন তাঁর চিন্তাশীলতায় সংসারের প্রতি বিতৃষ্ণা ভাব প্রকট হচ্ছিল। এমন সময় একদিন রাজপুত্ররূপে নগর ভ্রমণে বের হয়ে জরাজীর্ণ, ব্যাধিগ্রস্ত, মৃত কলেবর অবলোকন করে মানবজীবন যে পরিবর্তনশীল, ক্ষণস্থায়ী এবং অনন্ত দুঃখে জর্জরিত—এসব বিষয় গভীরভাবে উপলব্ধি করে তাঁর মন পীড়িত হয়েছিল। তখন তিনি অতুলনীয় ভোগ-ঐশ্বর্যের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে সত্যের অনুসন্ধানে দুঃখ-পীড়িত মানবের কল্যাণে নিজের জীবন উৎসর্গ করে ছয় বছর কঠোর সাধনার মধ্য দিয়ে বোধিজ্ঞান লাভ করে আত্মজয়ী হয়েছিলেন।

ভারতবর্ষজুড়ে যখন চলছে হাহাকার, হিংসা, হানাহানি, মারামারি, কাটাকাটি, তখন একদল মানুষ অন্যদের মানুষ বলে গণ্য করত না। সর্বত্রই চলছিল শোষণের রথচক্র। লাখো পশুর রক্তের বন্যায় ভেসে গিয়েছিল ধরাধাম। ভোগবিলাসের তাণ্ডবে, সুরার ফেনিল উচ্ছ্বাসে নগরনটীর নূপুর নিক্বণে ভরে উঠেছিল চারদিক। সেই অন্ধকার সময়ে যখন ধর্ম শাসনের নামে শুরু হয়েছিল সব ধরনের অধর্ম আর শোষণ, তখন সব অন্ধকারের আবরণ ভেদ করে, সব মোহ মাদকতার প্রলোভন অস্বীকার করে, সুখের গৃহকোণ, স্ত্রীর ভালোবাসা, শিশুপুত্রের মায়াময় মুখের হাতছানি, স্নেহশীল পিতার আহবানকে জয় করে, সেই অন্ধকার ভরা সময়ে সমাজের সব অত্যাচার-নিপীড়নের ভয় তুচ্ছ করে একজন গর্জে উঠে বলেছিলেন, সব মানুষ সমান, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ করার চেয়ে বড় অন্যায় আর কিছুই হতে পারে না। কে সেই মানব? সেই অন্ধকার সময়ে কে গর্জে উঠে বলেছিলেন, শুধু ভেদাভেদ করাই অপরাধ নয়, আরো বড় অপরাধ হচ্ছে ব্যক্তিগত সম্পত্তির লোভেই এত অশান্তি। যিনি সেই যুগে সমাজপতিদের ভ্রুকুটি অস্বীকার করে সব ধরনের কুসংস্কার গ্লানির বিরুদ্ধে এক আপসহীন সংগ্রাম গড়ে তুলেছিলেন। কে এই মহামানব? তিনি আর কেউ নন, তিনি হলেন মহামানব গৌতম বুদ্ধ।

যখন ধর্মের নামে শত শত পশু বলি, নরবলি আর শত শত মণ ঘৃতের অপব্যবহার, লতা সাধনার ব্যাপক প্রথা, কামনা-বাসনায় ভরে উঠেছিল আচারসর্বস্ব প্রথায়; সেই সময়ে সবল দুই হাতে সব অন্ধকারের কালো মেঘ সরিয়ে আলোর শিশু বলেছিলেন, এসব ধর্ম নয়, মানুষ ঠকানোর কদাচার, এতে কোনো উন্নতি হয় না, হয় অধঃপতন। ভাবতে অবাক লাগে, সেই মানবসভ্যতার ঊষালগ্নে এই মহামানব কিভাবে এত প্রগতিশীল চিন্তা-ভাবনা করতে সক্ষম হয়েছিলেন! যাঁর আহ্বানে সেই যুগের লাখো কোটি মানুষ তাঁদের সব কিছু বিলিয়ে দিয়ে বেছে নিয়েছিলেন সংযম, সেবা ও সাধনার পথ। সেদিন তিনি শিখিয়েছিলেন ‘ভোগে সুখ নেই, ত্যাগেই সুখ। ’

জাতিসংঘ বিশ্বশান্তির পক্ষে সহায়ক হিসেবে মহামানব গৌতম বুদ্ধ কর্তৃক প্রবর্তিত ‘পঞ্চশীল’ নীতিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে পঞ্চশীল নীতিকে সংবিধানে সন্নিবেশিত করেছেন এবং আরেকটি বিশ্বযুদ্ধ থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছেন। সে জন্য ‘বুদ্ধের জন্ম, বুদ্ধত্বলাভ ও মহাপরিনির্বাণ’ ত্রি-স্মৃতি বিজড়িত পবিত্র বৈশাখী পূর্ণিমাকে ‘বেসাখ ডে’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন এবং দিনটি আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বসহকারে উদযাপন করে থাকেন।

এখন সময় এসেছে তথাগত বুদ্ধের পঞ্চশীল ও অহিংস নীতিকে গভীরভাবে অনুধাবন করা। তাতে বিশ্বে অচিরেই শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। বুদ্ধ আরো বলেছেন, একা তোমার কোনো শক্তি নেই, সংঘবদ্ধ হলেই তোমার শক্তি। অতএব সংঘবদ্ধ হও, ভক্তি চিন্তায় আবদ্ধ থেকো না। কেননা সবার আনন্দই হোক তোমার কাম্য, সবার সচেতনতাই হোক তোমার আদর্শ। তিনি আরো বলেছিলেন বিশ্বভ্রাতৃত্বের কথা এবং বিশ্বপ্রেম আর মানবতার কথা। তাই আজ মহান বৈশাখী পূর্ণিমা দিবসে মহাপুরুষ তথাগত বুদ্ধকে জানাই হৃদয়ের গভীর থেকে অজস্র শ্রদ্ধা, বন্দনা। এই শুভ দিনে প্রার্থনা জানাই এই বলে—‘হে মহাকারুণিক তথাগত, পৃথিবী আবার হিংসায় উন্মত্ত হয়ে উঠেছে। এই দুঃসময়ে তোমার মহাকরুণা ও মৈত্রী আবার সমগ্র পৃথিবীতে বর্ষিত হোক। তোমার মহাশান্তিময় অমৃতবাণী প্রশান্ত করুক হিংসায় উন্মত্ত মানুষের মন। ’

বিশ্বের সবাই মঙ্গল লাভ করুক, সুস্থ ও নিরাপদ জীবনের অধিকারী হোক। জগতের সব প্রাণী সুখী হোক, দুঃখ থেকে মুক্তি লাভ করুক।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা উপাধ্যক্ষ, ঢাকা আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহার এবং সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ বুদ্ধিস্ট ফেডারেশন, সংগঠক, লেখক ও মানবতাবাদী বৌদ্ধ ভিক্ষু

[email protected]



সাতদিনের সেরা