kalerkantho

শনিবার ।  ২৮ মে ২০২২ । ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ২৬ শাওয়াল ১৪৪

হাওরে বাঁধ নির্মাণে অনিয়মের বিচার হতে হবে

রাজন ভট্টাচার্য

১৪ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



হাওরে বাঁধ নির্মাণে অনিয়মের বিচার হতে হবে

গত পাঁচ অর্থবছরে সুনামগঞ্জে ফসল রক্ষায় বাঁধ নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৬২১ কোটি টাকা! তবু কৃষকের ফসল রক্ষা হলো না।

সর্বশেষ ২০১৭ সালে যখন হাওরডুবির ঘটনা ঘটল তখনো যথাসময়ে বাঁধ নির্মাণের কাজ না হওয়া, সামান্য মাটি আর বালু দিয়ে কোনো রকমে বাঁধের কাজ করা, কাজ পেয়ে কয়েক হাত বদলসহ নানা অভিযোগ আলোচনায় আসে। তদন্তে অনেক অভিযোগের সত্যতাও পাওয়া যায়। কিন্তু প্রতিকার মেলেনি।

বিজ্ঞাপন

যদি প্রতিকার পাওয়া যেত, তাহলে এর সুফল কিন্তু এবার হাওরাঞ্চলের কৃষকদের পাওয়ার কথা।

সুনামগঞ্জসহ গোটা হাওরাঞ্চলে ফসলডুবির ঘটনা তো নতুন নয়। ভাটি এলাকায় প্রতি তিন বছর পর একবার ফসলডুবির ঘটনা ঘটে। এই হিসাবে স্বাধীনতার পর এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ২০ বার কৃষকের সোনালি ফসল খেয়েছে সর্বনাশা পানি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ। অথচ ফসল রক্ষায় এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

যেসব বাঁধের কথা শোনা যায় সেগুলো তো পানির প্রথম চাপই প্রতিরোধ করতে পারে না! কথা হলো বিকল্প কোনো ব্যবস্থা কি নেই? ব্লক দিয়ে শক্তিশালী বাঁধ নির্মাণের ব্যবস্থা তো করা যায়। তাহলেও ফসল কিছুটা হলেও রক্ষা করা যেতে পারে। কিছুটা হলেও আশার আলো দেখতে পারেন কৃষক ও হাওর পারের মানুষ।

যতবারই ফসলডুবি হয়, ততবারই এর কারণ হিসেবে দেখা যায়, নির্মাণত্রুটি কিংবা সময়মতো বাঁধ সংস্কার না করা। দায়ী ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ সাজা হিসেবে বদলি করা হয়। এই সাজাকে অনেক সময় সাজাপ্রাপ্তরা সাজা নয়, বরং পুরস্কার হিসেবে উপভোগ করেন। এর বাইরেও ফসলডুবির আরো কিছু কারণ রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, প্রকৃতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো কঠিন। কিন্তু যতটুকু রক্ষা সম্ভব তাও তো হচ্ছে না।

প্রতিবছর বর্ষা শেষে বোরো ফসল রক্ষায় একই বাঁধ বারবার পুনর্নির্মাণ করা হচ্ছে। অথবা বিকল্প বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রয়োজনে কিংবা অপ্রয়োজনে নতুন নতুন বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ ও অর্থ বরাদ্দ দেখা যায়। এত উদ্যোগ নেওয়ার সুফল কতটা মিলেছে?

গত ৫ এপ্রিল সুনামগঞ্জের শাল্লার ‘কৈয়ার’ হাওরের বাঁধ পানির স্রোতে ভাঙতে দেখা যায়। আগের দিন থেকেই এলাকার নদীর পানি বাড়ছিল। দুর্বল বাঁধ ২৪ ঘণ্টাও পানির চাপ সামলাতে পারেনি। যে অংশটি ভেঙেছে সেখানে দেখা গেছে, কোনো রকম মাটি ফেলে রাখা হয়েছে। মাটি বসানো পর্যন্ত হয়নি। এমন দায়সারা বাঁধে তো প্রতিবছর টাকাই ব্যয় হবে—এটাই স্বাভাবিক। মানুষের কোনো কাজে আসবে না।

অভিযোগ আছে, সুনামগঞ্জের ফসল রক্ষা বাঁধ গত ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নির্মাণের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল পানি উন্নয়ন বোর্ড। বাঁধ নির্মাণে কোনো ধরনের অনিয়ম হলে কঠোর হাতে দমন করার কড়া হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল বোর্ডের পক্ষ থেকে। কে শোনে কার কথা? বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ অংশে ‘কজওয়ে’ নির্মাণের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কিছুই হয়নি। না হয়নি সময়মতো বাঁধ, হয়নি কজওয়ে। এ বছর ৭২৪টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) মাধ্যমে ৫৩২.৩৯ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৭২৪ কোটি টাকা।

গত ২ মার্চ সুনামগঞ্জের হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে ধীরগতির পাশাপাশি ৫৮ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠনে অনিয়ম হয়েছে বলে উঠে এসেছে পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার জরিপে। রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থনৈতিক সুবিধা নিয়ে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে গণশুনানি ছাড়াই পিআইসি গঠনেরও অভিযোগ রয়েছে।

সুনামগঞ্জ জেলার বিভিন্ন উপজেলার ৭২২টি বাঁধের মধ্যে দৈবচয়ন পদ্ধতিতে ১০৮টি বাঁধের পরিচালিত জরিপের ফল অনুযায়ী মাত্র ৮ শতাংশ বাঁধে মাটির কাজ সম্পন্ন হয়। ঘাস লাগানো হয়েছে ৩ শতাংশ বাঁধে। সংশোধিত কাবিটা নীতিমালা অনুযায়ী ৫০ মিটার দূর থেকে বাঁধের মাটি আনার কথা থাকলেও ৩৫ শতাংশ বাঁধে এই নিয়ম মানা হয়নি। অনিয়মের মাধ্যমে বাঁধের কাছ থেকে মাটি দেওয়া হয়েছে। যেসব বাঁধে মাটির কাজ সম্পন্ন করা হয়নি, এসব বাঁধে দুরমুজ (কম্পেকশন) ও ঢাল বজায় রাখার কাজও অসম্পূর্ণ।

সরকারি হিসাব বলছে, সুনামগঞ্জে মোট এক হাজার ৭১৮ কিলোমিটার বাঁধ রয়েছে, এর মধ্যে ৫৩৫ কিলোমিটার বাঁধের কাজ ড্রোনের মাধ্যমে ছবি সংগ্রহ করে যাচাই-বাছাই ও মনিটর করা হয়েছে। এবারের বন্যার প্রথম ধাক্কায় হাওরের তিনটি স্থানে ১৭০ মিটার বাঁধ ভেঙেছে বলেও সরকারি তথ্য বলছে।

দেশে সাতটি হাওর জেলার ৩৭৩টি হাওরের মধ্যে সর্বাধিক হাওর সুনামগঞ্জে। এ বছর জেলায় মোট দুই লাখ ২৩ হাজার হেক্টর জমিতে ফসল চাষ করা হয়েছে বলেও জানানো হয়। আকস্মিক বন্যায় হাওরের পাঁচ হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। এটাই তো কৃষকের সবচেয়ে বড় সর্বনাশ। এ ছাড়া সিলেট ও সুনামগঞ্জে হাওরের বাঁধে ১৩৬টি স্থানে সিপেজের সৃষ্টি হয়েছে; এর মধ্যে ৮৮টি সম্পূর্ণ মেরামত করা হয়েছে, ৩৮টির কাজ চলমান রয়েছে।

হাওরে বন্যায় ধারাবাহিক কৃষকের ক্ষতি হলেও সরকারি কাগজে ডেল্টা প্ল্যান-২১০০ অনুযায়ী ৬৪টি জেলায় নদী খননের লক্ষ্যে ৫১১টি নদীর জায়গায় ৬২৭টি ছোট নদী/খাল খননকাজ চলমান রয়েছে বলা হচ্ছে। সুনামগঞ্জ জেলার জন্য এক হাজার ৫৪৭ কোটি টাকার ১৪টি নদী খনন একটি প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, যার দৈর্ঘ্য ৩২৭ কিলোমিটার বলা হচ্ছে। সংযুক্ত খাল রয়েছে ২৫০ কিলোমিটার।

গত প্রকল্পটি নভেম্বরে একনেকে পাস হলে ২০২৩ সালে কাজ শুরুর কথা রয়েছে। ৯০টি কজওয়ে প্রকল্পও রয়েছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন। সুনামগঞ্জ হাওরের ১৪টি নদীতে পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে খননকাজ চলমান রয়েছে; এরই মধ্যে পাঁচ জেলার ৩৭৪ কিলোমিটার নদী খনন চলছে। গ্রামবাসী বোরো ধান কাটা শেষ হলে কৃষকরা বাঁধ কেটে দেয় মাছ চাষের পানি প্রবেশের জন্য, ফলে বাঁধগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমন দাবিও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের। শেষ পর্যন্ত সরকারি উদ্যোগগুলো কবে নাগাদ বাস্তবায়নের পথে হাঁটবে তা সঠিক বলা দুষ্কর। তবে পরিকল্পনা নিলেই হবে না, একফসলি হাওরের বোরো আবাদ রক্ষা করতে হলে দুর্নীতি রোধ করে কার্যকর ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যেতে হবে।

ফসল নষ্ট হওয়ায় একদিকে কৃষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। মহাজনদের কাছ নেওয়া দেনা কিভাবে পরিশোধ হবে? কিভাবে চলবে এনজিওর ঋণের কিস্তি? ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো জরুরি।

নির্ধারিত সময়ে বাঁধের কাজ শেষ না হওয়ার পেছনে প্রকল্প প্রাক্কলন ও পিআইসি গঠনে বিলম্ব, অর্থ ছাড়ে বিলম্ব, হাওর থেকে দেরিতে পানি নামা ও ড্রেজারের স্বল্পতা রয়েছে। এ ছাড়া বাঁধের মাটির দুষ্প্রাপ্যতা ও প্রকল্প গঠনে অনিয়মের সমস্যা পুরনো। হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধের বিকল্প হিসেবে উজান ও ভাটিতে নদী খনন জরুরি। নির্মাণ করতে হবে স্থায়ী বাঁধ, খনন করতে হবে নদী। রাজনৈতিক বিবেচনায় কাজ পাওয়া বন্ধ, কাজের হাত বদল ঠেকানো জরুরি। বিচারের আওতায় আনতে হবে অপরাধীদের। হাওরের ফসল কিভাবে রক্ষা করা যায় এ নিয়ে আরো বেশি বেশি গবেষণা জরুরি।

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক

[email protected]



সাতদিনের সেরা