kalerkantho

শুক্রবার ।  ২৭ মে ২০২২ । ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ২৫ শাওয়াল ১৪৪

সৌদির নতুন তেল বাণিজ্য, অস্বস্তিতে যুক্তরাষ্ট্র

এম কে ভদ্রকুমার

১৩ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সৌদির নতুন তেল বাণিজ্য, অস্বস্তিতে যুক্তরাষ্ট্র

সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর পরিচালক উইলিয়াম বার্নসের বৈঠকের প্রায় তিন সপ্তাহ পর গত ৫ মে বৃহস্পতিবার ওপেক প্লাসের মন্ত্রী পর্যায়ের একটি ভিডিও কনফারেন্সের আয়োজন করা হয়। ওপেক সদস্য এবং সদস্য নয় এমন দেশগুলোর সমন্বয়ে ওপেক প্লাসের বৈঠকটিকে সফল বলা হচ্ছে। কারণ তেলের বাজারের মৌলিক ভিত্তি এবং পূর্বাভাস নিয়ে ঐকমত্য বজায় রাখতে পারায় বৈঠকটি একটি ভারসাম্যপূর্ণ বাজারের বার্তা দিয়েছে।

এ বিষয়ে ইঙ্গিত করে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সাবেক প্রকাশক কারেন এলিয়ট হাউস একটি শ্লেষাত্মক মন্তব্য করেছেন যে উইলিয়াম বার্নস যুবরাজ মোহাম্মদের সঙ্গে ‘প্রণয় নৃত্য’ করতে সৌদি গিয়েছিলেন।

বিজ্ঞাপন

ভাবখানা এমন, মোহাম্মদকে অবশ্যই ইউরোপীয় দেশগুলোর জ্বালানি ঘাটতি থেকে উদ্ধার করতে উৎপাদন বাড়িয়ে পশ্চিমাদের ‘নতুন তেল-সুরক্ষা কৌশল’কে সহায়তা করতে হবে।

বার্নস বাগদাদে অনুষ্ঠিত সৌদি গোয়েন্দা প্রধান ও ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের উপপ্রধানের মধ্যে বৈঠকের ঠিক আগমুহূর্তে যুবরাজের সঙ্গে সাক্ষািট করতে। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী মুস্তাফা আল-কাদিমি ইরান-সৌদি আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেন। তিনি গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘সৌদি আরব ও ইরানে আমাদের ভাইয়েরা বর্তমান আঞ্চলিক পরিস্থিতির দাবি অনুযায়ী একটি বড় দায়িত্ব নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নিচ্ছেন। আমরা নিশ্চিত যে পুনর্মিলন আসন্ন। ’

সুতরাং বার্নসের মিশনটি তেহরান-রিয়াদ পুনর্মিলন ইস্যুতে উদাসীন ছিল, সেটা বলার সুযোগ নেই। কারণ এমনিতেই ভিয়েনায় ইরানের পরমাণু চুক্তি নিয়ে আলোচনার ফলাফল অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ওয়াশিংটনের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য কৌশলের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে অস্বীকারকারী তেহরানের অনমনীয় অবস্থানের কারণ ওয়াশিংটন তার আঞ্চলিক মিত্রদের নিয়ে ইরানবিরোধী ফ্রন্টকে চাঙ্গা করার অক্ষম বিকল্পে ফিরে আসতেই বাধ্য হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে তেলের দাম প্রধান ইস্যু হয়ে পড়েছে। কারণ তেলের দাম বেশি হওয়া মানেই রাশিয়ার বেশি আয়। তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের আকাশছোঁয়া দামের ফলে রাশিয়ার আয় ২০২১ সালের প্রাথমিক পূর্বাভাসের চেয়ে অনেক বেশি, যা দেশটির মোট বাজেটের ৩৬ শতাংশের সমান। দেশটির রাজস্ব আয় ৫১.৩ শতাংশের প্রাথমিক পরিকল্পনাও ছাড়িয়ে গেছে, যার পরিমাণ মোট ১১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তাই রাশিয়ার অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়ার জন্য মার্কিন প্রশাসনের সর্বোত্তম পরিকল্পনাগুলো এখন প্রকাশ পাচ্ছে। একইভাবে তেলের উচ্চ মূল্য প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের জন্য একটি অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। সর্বোপরি ইউরোপ যদি তেলের ভিন্ন উৎস খুঁজে না পায়, তাহলে সে রুশ তেল ক্রয়ও চালিয়ে যাবে।

বাইরে যা-ই ঘটুক, যুবরাজ মোহাম্মদেরও নিজস্ব এজেন্ডা রয়েছে। তিনি সম্ভবত কয়েক দশক ধরে সৌদি আরব শাসন করবেন এবং তিনি যদি তাঁর বাবার মতোই ৮৬ বছর বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকেন, তাহলে তাঁর শাসনকালের মেয়াদ হবে অর্ধশতাব্দী। সে ক্ষেত্রে যুবরাজ একটি ‘পাওয়ার বেস’ তৈরিতে উল্লেখযোগ্যভাবে সফল হয়েছেন।

এটা পরিষ্কার যে রাশিয়াকে শাস্তি দিতে তাঁর অস্বীকৃতি তাঁর নিজস্ব অবস্থানের কথাই জানান দিচ্ছে। এর পেছনে তাঁর দেশের নিজস্ব একটি কারণও থাকতে পারে। সেটা হচ্ছে সৌদি আরবকে একটি ‘অস্পৃশ্য রাষ্ট্র’ (পারিয়া স্টেট) হিসেবে বাইডেনের অবজ্ঞাপূর্ণ মন্তব্য। যুবরাজ সম্প্রতি জো বাইডেনের ফোনকলে সাড়া না দিয়ে একটি পাল্টা জবাব দিয়েছেন। এ ছাড়া সৌদি আরবে অস্ত্র বিক্রির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, হুতি বাহিনী কর্তৃক সৌদি আরবের ওপর হামলার বিষয়ে অপর্যাপ্ত প্রতিক্রিয়া, ২০১৮ সালে জামাল খাশোগি হত্যার বিষয়ে মার্কিন প্রতিবেদন প্রকাশ—এই সবই এর পেছনে কাজ করছে। এখন মার্কিন প্রশাসন যদি সৌদি আরবের জন্য নতুন নিরাপত্তা গ্যারান্টি কংগ্রেসের অনুমোদন আদায় করে নিতে পারে, তাতেও যুবরাজকে টলানো যাবে না। কারণ দিন শেষে তেলের উচ্চ মূল্য সৌদি বাজেটকেও সমৃদ্ধ করে।

প্যারাডক্স হলো সৌদি আরব ও রাশিয়া উভয়ই ওপেক প্লাসের অংশীদার। গত মাসে ওপেকের মহাসচিব মোহাম্মদ বারকিন্দোর ইউরোপীয় ইউনিয়নকে যে সতর্কবার্তা দিয়েছেন, তাতে এটা স্পষ্ট যে রুশ পেট্রোলিয়ামের বিরুদ্ধে ভবিষ্যৎ নিষেধাজ্ঞা বা স্বতঃস্ফূর্ত ব্যবস্থার কারণে সৃষ্ট শূন্যতা খুব একটা পূরণ করা সম্ভব নয়।

এই পরিস্থিতিতে চীনা প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সৌদি আরব সফরের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা বাইডেন প্রশাসনকে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি হতাশ করছে। এর মধ্যে উপসাগরীয় তেল বিক্রিতে ডলারের পরিবর্তে ইউয়ানে মূল্য নির্ধারণের লক্ষ্যে রিয়াদ ও বেইজিং আলোচনা করছে বলেও একের পর এক সংবাদ প্রকাশ পাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত যদি ইউয়ানে মূল্য নির্ধারণের ঘটনাটি ঘটে, তাহলে সেটা প্রকৃতপক্ষে তেলের বাজারের জন্য একটি বড় ধরনের পরিবর্তন সূচনা করবে এবং অন্যান্য দেশ ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের চীনা মুদ্রায় লেনদেনে উৎসাহিত করার বিষয়ে বেইজিংয়ের প্রচেষ্টা এগিয়ে নেবে।

লেনদেনের ক্ষেত্রে ইউয়ান বেছে নেওয়ার বিষয়ে সৌদি আরবের নিজস্ব ব্যাখ্যা রয়েছে। সেটি হচ্ছে রিয়াদ নতুন বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের অংশ হিসেবে পেট্রোলিয়াম রপ্তানি করে ইউয়ান গ্রহণ করবে এবং এর বিপরীতে দেশটিতে চলমান মেগাপ্রকল্পগুলোতে কর্মরত চীনা ঠিকাদারদের অর্থ পরিশোধ করতে পারবে।

ওয়াশিংটনের জন্য এটি নিশ্চিতভাবেই একটি সংবেদনশীল ইস্যু। কারণ ইউয়ানে সৌদি-চীন লেনদেন সুইফট মেসেজিং সিস্টেমের পর্যবেক্ষণ আয়নায় প্রদর্শিত হবে না। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত বৈশ্বিক লেনদেন পর্যবেক্ষণ অকার্যকর হয়ে পড়বে।  

অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একের পর এক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হচ্ছে যে চীনের সহায়তায় সৌদি আরব পারমাণবিক প্রযুক্তির অর্জন ত্বরান্বিত করতে     আল-উলা নগরীর কাছে একটি নতুন ইউরেনিয়াম প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র নির্মাণ করতে পারে। এ ছাড়া পাকিস্তানের জন্য সৌদি আরব গত সপ্তাহে আট বিলিয়ন ডলারের উদার অর্থনৈতিক সহায়তা ঘোষণা করেছে। এ বিষয়টি প্রায় নিশ্চিতভাবেই ওয়াশিংটনে হেঁচকি তুলবে।

আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট পরিচালিত চায়না গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্ট ট্র্যাকারের তথ্য মতে, সৌদি আরব চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের একটি কেন্দ্রীয় স্তম্ভ এবং চীনা নির্মাণ প্রকল্পের শীর্ষ তিনটি দেশের একটি। সুতরাং এটা বলা যায় যে সৌদি যুবরাজের সঙ্গে সিআইএ প্রধানের আলোচনাটি বন্ধুত্বপূর্ণ হওয়ার কথা নয়।

 

লেখক : সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক

সূত্র : এশিয়া টাইমস, সংক্ষেপিত ভাষান্তর



সাতদিনের সেরা