kalerkantho

বৃহস্পতিবার ।  ২৬ মে ২০২২ । ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ২৪ শাওয়াল ১৪৪

পরিবেশ রক্ষায় সবুজ কর

মো. শফিকুল ইসলাম

২৬ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



পরিবেশ রক্ষায় সবুজ কর

বিশ্ব এখন প্রযুক্তিনির্ভর। কিন্তু প্রযুক্তি যেমন বিশ্বকে অনেক সহজ করেছে, তেমনিভাবে আবার পরিবেশ দূষণ করছে। তাই প্রযুক্তি হতে হবে পরিবেশবান্ধব। প্রযুক্তি ছাড়া শিল্পায়ন সম্ভব নয়, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে প্রযুক্তি ব্যাপক ভূমিকা রাখবে, যা টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখবে।

বিজ্ঞাপন

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব হলো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রচলিত উৎপাদন ও শিল্পব্যবস্থার আধুনিকীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সম্ভাবনা আমাদের কাজে লাগাতে হবে; কিন্তু পরিবেশ ও বায়ুদূষণ আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কারণ বায়ু ও পরিবেশদূষণ যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে তা মানুষ এবং পরিবেশের জন্য ভয়াবহ। কিন্তু ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরের চারদিকে ধূলিকণা ভাসছে কুয়াশার মতো। বুকভরে শ্বাস নেওয়া যাচ্ছে না। শীতের শুরু থেকেই বায়ুদূষণের দিক থেকে ঢাকা প্রায়ই উঠে আসে বিশ্বের শীর্ষে। গত বছরের তুলনায় এ বছর শীত মৌসুমে ঢাকায় বায়ুদূষণ বেড়েছে ১৯ শতাংশ। বাতাসের বিষে চরম ঝুঁকিতে পড়েছে জনস্বাস্থ্য। গবেষণায় উঠে এসেছে, নানা ধরনের দূষণে বাংলাদেশে প্রতিবছর মারা যায় এক লাখ ২৩ হাজার মানুষ। এভাবে প্রতিটি বড় বিভাগীয় শহরে, শিল্প এলাকায় বায়ু এবং পরিবেশদূষণ বাড়ছে। বিশেষ করে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, ইটভাটা, বর্জ্য পোড়ানো, কলকারখানা ও গাড়ির কালো ধোঁয়া দূষণের জন্য দায়ী। তাই দূষণ রোধে সবুজ কর আরোপ করা একান্ত জরুরি।

মানুষকে পরিবেশবিরোধী আচরণ বা কাজ থেকে নিরুৎসাহ করতে পরিবেশদূষণকারী পণ্য বা কার্যকলাপের ওপর সবুজ কর আরোপ করা হয়। সবাইকে পরিবেশের প্রতি সংবেদনশীল করে তুলতে সবুজ কর বিষয়টি অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরিবেশদূষণ কমানো ও বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে পরিবেশ আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব যন্ত্রপাতি ও সম্পদ আহরণের জন্য বিনিয়োগ কর ছাড় এবং সবুজসেবা প্রদানকারীদের আয়কর মওকুফের বিষয়টি বিবেচনা করছে সরকার। একই সঙ্গে পরিবেশদূষণ নিরুৎসাহ করার লক্ষ্যে সবুজ কর আরোপ করার বিষয়টিও বিবেচনায় নিচ্ছে সরকার। এটা খুবই যুগান্তকারী পদক্ষেপ। সবুজ কর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। এতে পরিবেশ যেমন রক্ষা পাবে, তেমনি মানুষের অনেক রোগের ঝুঁকি কমে যাবে।

সবুজ কর প্রণোদনা এবং সবুজ কর আরোপের প্রধান লক্ষ্যগুলো হলো—পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, সবুজ প্রযুক্তিসমৃদ্ধ সম্পদ সংগ্রহে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎসাহ প্রদান, সবুজ প্রযুক্তিসেবা প্রদানকারীদের প্রসার এবং দূষণ সৃষ্টিকারী কার্যক্রম নিরুৎসাহকরণ।

বিশ্ব জলবায়ু হুমকির মুখে এবং দিন দিন জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে। তাই জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় কপ-২৬ সম্মেলন হয়েছে। এই সম্মেলন জলবায়ু মোকাবেলায় অনেক ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে যদি সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী দেশগুলো তাদের প্রতিশ্রুতি রাখে। মনুষ্য কারণে জীবাশ্ম জ্বালানির নির্গমন বৃদ্ধির ফলে পৃথিবী দিন দিন উষ্ণ হচ্ছে। দাবদাহ, দাবানল ও বন্যার মতো জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চরমভাবাপন্ন আবহাওয়া তীব্রতর হচ্ছে। তাই জলবায়ু পরিবর্তন রোধে আমাদেরও দায়িত্ব রয়েছে। যেসব কার্যক্রম পরিবেশদূষণ বা জলবায়ুতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, সেসব কাজ থেকে আমাদের বিরত থাকতে হবে। এখানে সবুজ কর কাজে লাগতে পারে। তাই সবুজ কর আরোপের বিষয়ে সরকারকে জোর দিতে হবে এবং এর প্রয়োগে কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা করতে হবে। কেউ বা কোনো কম্পানি পরিবেশ দূষণ করলে সঙ্গে সঙ্গে তাদের বা তাদের প্রতিষ্ঠানকে জরিমানার আওতায় আনতে হবে। সবুজ করকে অনেক সময় পরিবেশ বা দূষণ কর নামে অভিহিত করা হয়। যে নামে হোক না কেন, এই কর আরোপের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। সবুজ করের অনেক সুবিধা আছে, যেমন—এনার্জি সেভ এবং পরিবেশবিরোধী কার্যকলাপকে নিরুৎসাহ করে। এই কর শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে টেকসই পন্থা উদ্ভাবন করতে উৎসাহিত করে। সবুজ কর পরিবেশকে একদিকে রক্ষা করে, অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি করতে ভূমিকা রাখে। সবুজ কর নেতিবাচক পরিবেশগত প্রভাবও হ্রাস করে। দেশের টেকসই অর্থনৈতিক, পরিবেশগত এবং সামাজিক উন্নয়নে সবুজ করের বিকল্প নেই।

গ্রিন বিজনেস উন্নয়নের জন্য শিল্প-কারখানায় দূষণ নিয়ন্ত্রণে ক্লিন ও গ্রিন টেকনোলজির ব্যবহার উৎসাহিত করার লক্ষ্যে সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে ২০০ কোটি টাকার একটি ফান্ড গঠন করে। এই অর্থায়নের মাধ্যমে পরিচালিত সবুজ প্রকল্পগুলোতে অর্ধশতাধিক সবুজ পণ্যের বিনিয়োগের উদ্যোগ কার্যকর হয়েছে, যা খুবই ইতিবাচক। পরিবেশবান্ধব সবুজ প্রযুক্তির উন্নয়ন ও প্রচলন, গবেষণা বৃদ্ধিকরণ এবং পরিবেশেবান্ধব শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণে উৎসাহিত করার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক একটি বিশেষ ফান্ড গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার ব্যবহারের মাধ্যমে উদ্যোক্তারা পরিবেশবান্ধব কারখানা স্থাপন ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে উৎসাহিত হবেন। পরিবেশদূষণের ঝুঁকি বৃদ্ধির আশঙ্কা থেকে রক্ষার জন্য সবুজ অর্থনীতিতে প্রবেশ করা ছাড়া বাংলাদেশের আর কোনো উপায় নেই।

বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সমন্বয় রেখে জাতিসংঘের টেকসই অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০ অর্জনে পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারের সুনির্দিষ্ট কিছু পলিসি গ্রহণ করা একান্ত প্রয়োজন। যার একটি সবুজ কর আরোপ উল্লেখযোগ্য হতে পারে। সবুজ কর আরোপের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের কঠোর প্রয়োগ জরুরি, যা পরিবেশ রক্ষায় অনেক অবদান রাখবে বলে বিশ্বাস করি। আমাদের দেশে সবুজ কর আরোপ নতুন হলেও বিশ্বের অনেক দেশে সবুজ কর প্রয়োগ অনেক বছর আগে থেকে চালু রয়েছে। সবুজ কর শুধু সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াবে তা-ই নয়, এর কারণে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকরা পরিবেশ দূষণ করে এ রকম কাজ না করতে বাধ্য হবেন। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে সবুজ কর প্রথা চালু আছে। ভারত সবুজ করের মাধ্যমে অনেক রাজস্ব আয় আদায় করছে, যা ২০১৪ সালের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১২ শতাংশের সমান। যদিও কেউ কেউ মনে করেন, সবুজ কর চালু হলে পণ্যর দাম বৃদ্ধি পাবে, যার প্রভাব পড়বে সাধারণ ক্রেতার ওপর। তাই এ জন্য বেশি তদারকি করতে হবে। তাই যেসব প্রতিষ্ঠান গ্রিন প্রযুক্তি ব্যবহার করবে ও পরিবেশবান্ধব কার্যক্রম করবে তাদের সবুজ কর আরোপের বিষয়ে ছাড় দিতে হবে। তাহলে ব্যবসায়ীরা পরিবেশ রক্ষায় এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বেশি আগ্রহী হবেন।

 

লেখক : সাবেক সভাপতি, শিক্ষক সমিতি

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় (জাককানইবি), ত্রিশাল, ময়মনসিংহ



সাতদিনের সেরা