kalerkantho

বৃহস্পতিবার ।  ২৬ মে ২০২২ । ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ২৪ শাওয়াল ১৪৪

কাদের ওপর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব

বিমল সরকার

২৩ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কাদের ওপর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আর অন্য যেকোনো ক্ষেত্রেই হোক সংকট আকস্মিকভাবে সৃষ্টি হয় না। প্রথমে কিছু অসুবিধা; অসুবিধাগুলো দূর না করে ক্রমাগত অবহেলা বা উপেক্ষা করতে করতে তা সমস্যায় রূপ নেয়। এভাবেই সমস্যাগুলো একসময় সংকট তৈরি করে। ‘এক দফায়’ পরিণত হয়।

বিজ্ঞাপন

তখন আর সাধারণ বা সামান্য উদ্যোগে সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া যায় না। আলোচনায় এখন সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

শুধু আইন ও সূত্র অনুযায়ী সব সময় সব কিছু চলে না। যার যা-ই অবস্থান হোক, দায়িত্বের পাশাপাশি সময়ে ব্যক্তিগত বিবেচনায় ঝুঁকিও নিতে হয়। কিন্তু বাস্তবে আজকাল বলতে গেলে সবার মাঝেই লক্ষ করা যায় একটা গাছাড়া ভাব। খোলা মন নিয়ে সমস্যা বা সংকট নিরসনে কেউ এগিয়ে আসেন না বা এগিয়ে আসতে চান না। আমরা বুঝতে পারি না বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বড় পরিসরের পবিত্র একটি প্রতিষ্ঠানে একটি ইস্যুতে কিভাবে সপ্তাহ কিংবা মাসব্যাপী অচলাবস্থা বিরাজ করে! আসলেই কি ‘কোথাও কেউ নেই?’ কাদের ওপর দেওয়া আছে একেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব?

একটা ছোট উদাহরণ দেওয়া যাক। দেশের শিক্ষাজগতে এক স্মরণযোগ্য নাম ড. মোহাম্মদ ওসমান গণি। ষাটের দশকে টানা সাত বছর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৩ থেকে ১ ডিসেম্বর ১৯৬৯) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এম ও গণি নামেই তিনি সমধিক পরিচিত। তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ও পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনেম খানের জমানার বেশির ভাগ সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ কার্যনির্বাহী হিসেবে চরম বৈরী হাওয়ার মাঝে থেকেও যে প্রজ্ঞা, সাহস ও ব্যক্তিত্বের স্বাক্ষর রেখে গেছেন তা আজও সমসাময়িক শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সুধীজনের মুখে মুখে বেশ গর্বের সঙ্গে উচ্চারিত হতে শোনা যায়। আমার একজন প্রিয় শিক্ষক এ এইচ এম মনিরুজ্জামান কয়েক দিন আগে তাঁর ছাত্রজীবনে ড. এম ও গণির সঙ্গে স্মৃতিময় একটি ঘটনার বর্ণনা দিলেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রনেতা বা এমন স্তরের কিছু শিক্ষার্থীর ক্লাস না করার প্রবণতাটি বেশ পুরনো। সংখ্যায় কম হলেও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝেও প্রবণতাটি লক্ষ করা যায়। সেটি ১৯৬৮ সালের জুলাই কিংবা আগস্ট মাসের ঘটনা। রাজনীতির মাঠ তত গরম হয়ে না উঠলেও দেশব্যাপী উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আর আবেগ তো খানিকটা ছিলই। শ্রেণিকক্ষে সন্তোষজনক উপস্থিতির হার (পার্সেন্টেজ) না থাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিভাগের কিছুসংখ্যক শিক্ষার্থীর মাস্টার্স শেষপর্ব পরীক্ষার (১৯৬৮) ফরম পূরণ আটকে দেওয়া হয়। এতে শিক্ষার্থীদের অনেকেই বিপাকে পড়ে যান। শিক্ষার্থীদের একদিকে পরীক্ষা দেওয়ার কাম্য প্রস্তুতি নেই, অন্যদিকে উপস্থিতি-সংকট। অনন্যোপায় হয়ে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বাসায় বাসায় গিয়ে নানা অনুনয়-বিনয় করে পার্সেন্টেজ সমস্যার একটি সমাধান করতে সক্ষম হলো। এবার পরীক্ষা পেছানোর আবদার। দল বেঁধে হৈচৈ করতে করতে শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের বাসভবন আঙিনায় প্রবেশ করল। ডাকাডাকি এবং বেপরোয়া কেউ কেউ ভবনের নিচতলার দরজা-জানালায় ঢিল ছোড়ে এবং এতে ফুলের বেশ কয়টি টব ভেঙে যায়। উপাচার্য ড. গণি হৈচৈ আর চিৎকারের মধ্যে কিছু না বুঝেই দোতলা থেকে নেমে এলেন এবং শিক্ষার্থীদের কাছে ডেকে তাদের দাবিদাওয়া কী জানতে চান। তারা বলল পরীক্ষা পেছানোর কথা। এরপর তিনি যেসব কথা শিক্ষার্থীদের শুনিয়েছিলেন তা আজও আমার মনিরুজ্জামান স্যারের (উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে আত্মদানকারী শহীদ আসাদের অনুজ। ইতিহাস বিভাগের ছাত্র আসাদুজ্জামান ও মনিরুজ্জামান দুই সহোদর ১৯৬৮ সালে একই সঙ্গে এমএ ফাইনাল পরীক্ষায় অবতীর্ণ হন) স্মৃতিতে গেঁথে রয়েছে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে সরকার সমর্থক (এনএসএফ) নেতা ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী মুহসীন হলের ভিপি ও জিএস যথাক্রমে ইব্রাহিম খলিল, মুজিবুর রহমানসহ অনেকেই ছিলেন। উপাচার্য প্রথমেই জানতে চান, ‘দাবি আছে, কথা আছে ভালো কথা; কিন্তু তোমরা এভাবে চিৎকার আর ঢিল ছুড়লে কেন? টবগুলো ভেঙেছ কেন, এগুলো কী দোষ করেছিল?’

সামনাসামনি এবং একেবারে কাছে থেকে ড. গণির মতো ব্যক্তির মুখ থেকে এসব শুনে শিক্ষার্থীরা মাথা নিচু করে একেবারে নীরব, কেউ রা-টি পর্যন্ত করেনি। এরপর এলো পরীক্ষা পেছানোর প্রসঙ্গ। শিক্ষার্থীদের এককথা—‘পরীক্ষা পেছানো চাই’। বেশ নিস্তব্ধ পরিবেশ। ড. গণি জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমাদের পরীক্ষার আর কত দিন বাকি?’ শিক্ষার্থীরা তখনো নীরব। দ্বিতীয়বারের জিজ্ঞাসার পর একজন মৃদুস্বরে জবাব দিল, ‘স্যার, দুই মাস বাকি। ’ এবার তিনি বললেন, ‘আমি জানি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯ হাজার শিক্ষার্থীর সবাই মেধাবী। মেধাবী ছাড়া এখানে কাউকে ভর্তি করা হয়নি। আর লেখাপড়ায় যত ব্যাঘাতই ঘটে থাকুক একজন মেধাবী ছাত্রের জন্য দুই মাস সময় যথেষ্ট। পরীক্ষার তারিখ পেছানো হবে না। অতএব যাও, মন থেকে অন্য সব চিন্তা বাদ দিয়ে যার যার টেবিলে বসে মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করো। ’ উপাচার্য ড. এম ও গণির মুখ থেকে তাঁর স্বভাবসুলভ গুরুগম্ভীর স্বরে এমন কথা শুনে শিক্ষার্থীরা ‘আন্দোলন আর সংগ্রাম’ করা দূরের কথা, কোনো রকমে স্থান ত্যাগ করে হাঁপ ছেড়ে যেন বেঁচে যায়।

এই হলো একজন উপাচার্য তথা আদর্শবান শিক্ষকের দায়িত্ব, ব্যক্তিত্ব, প্রজ্ঞা ও প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব। সেদিন বলতে গেলে ‘হেরে যাওয়া’ শিক্ষার্থীরা ৫৩ বছর পরেও বেশ গর্বভরে ঘটনার স্মৃতিচারণা করে আজও স্বস্তি বোধ করেন।

দীর্ঘদিন পর স্বাধীনতার ৫০ বছরের মাথায় পৌঁছে আজ আমরা কী প্রত্যক্ষ করছি? সাধারণ স্কুল-কলেজ তো বটেই, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একেকটি প্রতিষ্ঠানের দিকে তাকিয়ে দেখলেও অনেক সময় মনে হয় পূর্বসূরিদের কাছ থেকে আমরা যেন কিছুই শিখতে পারিনি। নাকি আমাদের শেখাটা কোনোই কাজে আসছে না? সব কিছু থেকেও কী যেন নেই আমাদের! প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানে উপাচার্য, ডিন, প্রক্টর, রেক্টর; অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ; মন্ত্রী, সচিব, গভর্নিং বডির সভাপতি—এমন সব পদ-পদবিধারী ব্যক্তিরা থাকা সত্ত্বেও কোথাও সময়ের কাজটি সময়ে যেন হচ্ছে না। শুধু কমিটি গঠন আর আইন-কানুনের নথিপত্র ঘাঁটাঘাঁটি। এর বাইরে দায়িত্ব নিয়ে কিছু করতে যেন অনীহা। অথচ ইচ্ছা করলে অনেক কিছুরই সহজ সমাধান দিতে পারেন তাঁরা একেকজন।

 লেখক : অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক



সাতদিনের সেরা