kalerkantho

মঙ্গলবার ।  ১৭ মে ২০২২ । ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৫ শাওয়াল ১৪৪৩  

করোনা সংক্রমণ ও শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ

ড. প্রণব কুমার পাণ্ডে

২১ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



করোনা সংক্রমণ ও শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ

কভিড-১৯ অতিমারির প্রভাবে শিক্ষা খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত দুই বছরে পৃথিবীর প্রায় সব দেশের শিক্ষার্থীরা কভিড-১৯-এর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে উন্নত বিশ্বে শিক্ষা কার্যক্রম অনলাইনে রূপান্তরের মাধ্যমে ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে খুব বেশি অগ্রগতি হয়নি। প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে, বিশেষ করে মেয়েদের মধ্যে শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়ার একটা উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এমনকি অনেক ক্ষেত্রে ছেলেরাও পড়াশোনা বাদ দিয়ে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়েছে। তবে বিভিন্ন গবেষণায় এই সম্পর্কে যে তথ্য পাওয়া গেছে সেটি এখন পর্যন্ত উদ্বেগজনক অবস্থায় পৌঁছেনি। গত দুই বছরে সরকার, বিশেষ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় চেষ্টা করে গেছে কিভাবে এই পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে। তবে তাদের বিভিন্ন প্রচেষ্টা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা যে সমস্যায় পড়েছে সেটি নির্দ্বিধায় বলা যায়। কভিড-১৯-এর দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ন্ত্রণের পরে যখন পরিস্থিতি মোটামুটি স্বাভাবিক হতে শুরু করে তখনই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেওয়া হয়। পাশাপাশি এসএসসি ও এইচএসসি শিক্ষার্থীদের ফাইনাল পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়েছে।

যখন অন্যান্য ক্ষেত্রে শিক্ষা কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গভাবে শুরু হয়েছে, ঠিক সেই সময় নতুন করে করোনা সংক্রমণ শুরু হয়েছে দেশে। ২০২১ সালের নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে দক্ষিণ আফ্রিকায় চিহ্নিত করোনার ওমিক্রন ভেরিয়েন্টের প্রভাবে পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো যখন উদ্বেগজনক অবস্থার মধ্য দিয়ে দিন অতিবাহিত করছে, ঠিক সেই সময় বাংলাদেশে পরিস্থিতি তিন সপ্তাহ মোটামুটি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ছিল। কিন্তু সম্প্রতি বাংলাদেশেও গত দুই সপ্তাহ থেকে রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। এ অবস্থায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় কভিড-১৯ জাতীয় কারিগরি কমিটির সঙ্গে সভা করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে রেখে পরিস্থিতি মোকাবেলায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের টিকা কার্যক্রম ত্বরান্বিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ দুটিই যৌক্তিক সিদ্ধান্ত।

তবু শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা এক ধরনের উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে দিন যাপন করছেন। কারণ শিশুরা যদি করোনায় আক্রান্ত হয়, তাহলে একদিকে যেমন তারা স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে থাকবে, ঠিক তেমনিভাবে তাদের মাধ্যমে পরিবারের অন্যদের সংক্রমিত হওয়ার  আশঙ্কা বাড়বে। তা ছাড়া আমাদের মনে রাখতে হবে বড়রা যেভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে পারে, শিশুদের পক্ষে স্কুলে গিয়ে বন্ধুবান্ধবের সংস্পর্শে আসার পড়ে তেমনভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানা খুবই কঠিন। তা ছাড়া বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যে পরিবেশে পাঠদান করা হয়, সেই পরিবেশে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক সুপারিশকৃত করোনা সুরক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি মেনে চলাটা একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ। ফলে এই মুহূর্তে শিক্ষার্থীদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জড়িত শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ অন্য অনুঘটকদের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন এবং স্বাস্থ্যগত দিকের মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করি।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের মতো উচ্চশিক্ষা স্তরে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এক ধরনের উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। আমরা জানি যে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন মেসে অবস্থান করেন। ক্লাস রুমগুলোতে মাস্ক পরিধান বাধ্যতামূলক করা গেলেও শিক্ষার্থীদের আবাসস্থলে বা হলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে অবস্থান নিশ্চিত করা একটি জটিল কাজ। ফলে কোনো একজন শিক্ষার্থী হলে কভিড আক্রান্ত হলে তা ছড়িয়ে পড়বে সেই হল এবং পার্শ্ববর্তী সব অঞ্চল এবং সেই সংক্রমণ তাঁদের মাধ্যমে সহপাঠীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আমরা এরই মধ্যে লক্ষ করেছি যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় অফলাইন ক্লাস বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা শুরু করেছে। করোনার সংক্রমণ ব্যাপক আকার ধারণ করেনি, নিয়ন্ত্রণ করার এখনই সময়। যদি আমরা এই সংক্রমণ নিয়ে পরীক্ষা করি, তাহলে আমাদের গত বছরের দ্বিতীয় ঢেউয়ের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে—এ বিষয়ে নির্দ্বিধায় বলা যায়।

আমার মনে হয়, এই বিষয়টি অনুধাবন করেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রাথমিক পর্যায় পর্যন্ত অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে নির্দেশনা প্রদান করেছেন। গত দুই বছরের কভিড-১৯ গতি-প্রকৃতি এবং অন্যান্য একই রকম ভাইরাসের গতি-প্রকৃতি বিবেচনায় নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে জন্য অফলাইনের পাশাপাশি অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমকে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত করতে হবে। এটা না করতে পারলে অনেক শিক্ষার্থীর স্কুলজীবন শেষ হয়ে যেতে পারে। আমরা এটাও জানি যে বাস্তবতা হচ্ছে গ্রামীণ দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় ডিভাইস এবং ইন্টারনেটের খরচ বহন করা কঠিন। তা ছাড়া প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক স্তরের অনেক শিক্ষক রয়েছেন যাঁদের এখন পর্যন্ত অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি হয়নি। এটি যেমন একটি বাস্তবতা, অন্য আরেকটি বাস্তবতা হচ্ছে সরকার গত প্রায় দুই বছরে বিভিন্ন ধরনের নীতি বাস্তবায়ন করেছে এই শিক্ষার্থীদের অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের মধ্যে নিয়ে আসার জন্য। শিক্ষকদের ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে এবং তাদের ডিভাইস ক্রয়ের জন্য ঋণ প্রদান করা হয়েছে। আবার শিক্ষার্থীদের জন্য ইন্টারনেটের খরচ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। সার্বিকভাবে বলতে গেলে এ ধরনের সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নের ফলে হয়তো সমস্যা অনেকটাই দূরীভূত হয়েছে।

এখন পর্যন্ত ব্যাপকসংখ্যক শিক্ষার্থী অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের বাইরে রয়েছে। অতএব কিভাবে পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের অনলাইনের আওতায় নিয়ে আসার মাধ্যমে তাদের শিক্ষাজীবন রক্ষা করা যায় সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সবচেয়ে জরুরি। টিকা কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখার এবং শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা এখন উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে দিনযাপন করছে। শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। তাই অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের ওপর বেশি জোর দেওয়া দরকার ।

লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক



সাতদিনের সেরা