kalerkantho

মঙ্গলবার ।  ১৭ মে ২০২২ । ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৫ শাওয়াল ১৪৪৩  

তিন দশক পেরিয়ে : থাইল্যান্ডের মহামান্য রাজার বাংলাদেশ সফর নিয়ে কিছু কথা

ম্যাকাওয়াদি সুমিতমোর

২০ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



তিন দশক পেরিয়ে : থাইল্যান্ডের মহামান্য রাজার বাংলাদেশ সফর নিয়ে কিছু কথা

১৯৯২ সালে, আজ থেকে তিন দশক আগে থাইল্যান্ডের মহামান্য রাজা মাহা ভাজিরালংকর্ন প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। অবশ্য মহামান্য তখন ছিলেন থাইল্যান্ডের যুবরাজ। এর আগে ১৯৬২ সালে মহান রাজা ভূমিবল আদুলিয়াদে ও রানি সিরিকিত ঢাকা ও চট্টগ্রাম সফর করেন। এরপর যুবরাজের সফরই ছিল বাংলাদেশে আসা থাই রাজপরিবারের কোনো সদস্যের প্রথম আনুষ্ঠানিক সফর।

বিজ্ঞাপন

২০১৬ সালে যুবরাজ থাই সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন এবং এ ধরনের রাজকীয় সফর দুই দেশের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ বন্ধনের সাক্ষী।

১৯৭২ সালে কূটনীতিক সম্পর্ক স্থাপনের পর ১৯৭৯ সালে প্রথম এবং পরে ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশি দুজন মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে থাইল্যান্ড স্বাগত জানায়। একইভাবে ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশে সফরকারী প্রথম থাই প্রধানমন্ত্রী ছিলেন জেনারেল প্রেম তিনসুলানন্দা।

তত্কালীন যুবরাজের সফরটি ১৯৯১ সালে প্রাথমিকভাবে নির্ধারিত থাকলেও পারস্পরিক সুবিধাজনক সময় চূড়ান্ত করতে না পারায় সফরটি পরবর্তী বছরে আয়োজন করা হয়েছিল। প্রথমত, বাংলাদেশ সরকার অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে সফরটি আয়োজনের পরিকল্পনা করে প্রস্তাব পাঠায়। কারণ বাংলাদেশে ওই সময়ে শীতের আমেজ বিরাজ করে। অবশেষে ১৯৯২ সালে ১৬ থেকে ২১ জানুয়ারি এই রাজকীয় সফরের জন্য চূড়ান্ত করা হয়েছিল।

সফরকালে পরিদর্শনের জায়গাগুলো দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়েছিল। প্রথম ভাগ—বাংলাদেশের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে ধারণ করে এবং দ্বিতীয় ভাগ—মহামান্যের ব্যক্তিগত আগ্রহের কথা বিবেচনায় রেখে সাজানো হয়েছিল।

থাইল্যান্ড যেহেতু একটি ‘দ্য ফ্যাক্টো’ বা প্রকৃত রূপে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের দেশ এবং দেশটির মূল জনগোষ্ঠী বৌদ্ধ ধর্ম পালন করে, তাই মান্যবর রাজাকে বাংলাদেশের বিশিষ্ট বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার ও ইতিহাসসংবলিত কিছু স্থান পরিদর্শনের আয়োজন করা হয়েছিল। পরিদর্শনের উপযুক্ত এমন জায়গা হিসেবে তালিকায় ছিল পাহাড়পুর মঠ, যা বাংলাদেশের বৃহত্তম ও প্রাচীন বৌদ্ধবিহার এবং ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃত স্থান। বাংলাদেশের প্রধান প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান মহাস্থানগড়ও তালিকায় ছিল। তা ছাড়া মহামান্য ঢাকার সর্বপ্রথম বৌদ্ধ মন্দির ধর্মরাজিকা বৌদ্ধবিহার পরিদর্শন করেন।

তত্কালীন সফরের ঠিক ১৮ বছর পর ২০১০ সালে মহান রাজা আদুলিয়াদে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা  করেন এবং থাইল্যান্ডের সংমেটা ভ্যানারামা বিহারের অটুট সমর্থনে ধর্মরাজিকা বৌদ্ধবিহারে একটি ৩৮ ফুট লম্বা বুদ্ধমূর্তি স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। বর্তমানে মন্দিরের পুকুরপারে অত্যন্ত সাবলীল ও সুন্দরভাবে দাঁড়িয়ে আছে ৩৮ ফুট লম্বা সেই বুদ্ধমূর্তি, যা সব দর্শনার্থীকে আশীর্বাদ করে যাচ্ছে এবং হয়ে উঠেছে মন্দিরের একটি ল্যান্ডমার্ক।

প্রকৃতপক্ষে বৌদ্ধ ধর্ম একটি সাংস্কৃতিক বন্ধন, যা বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডকে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করেছে। কয়েকটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম, যেখানে থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রাজার দরবার থেকে অর্পিত বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের উদ্দেশ্যে বার্ষিক ল্যান্ট শেষে কঠিন চীবর উপহার করেন। বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সঙ্গে সাংস্কৃতিক সংযোগ জোরদার করার উদ্দেশ্যে এই অনুশীলনের সূচনা করেছিলেন থাইল্যান্ডের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং আসিয়ানের মহাসচিব ড. সুরিন পিটসুওয়াং। ড. সুরিন একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান। তিনি সারা বিশ্বের সীমান্তে থাই পররাষ্ট্রনীতিকে পৌঁছে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন।

বিভিন্ন ধর্মীয় স্থানের পাশাপাশি অনেক ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক স্থান পরিদর্শন করেছিলেন মান্যবর। যার মধ্যে ছিল সাভারে অবস্থিত জাতীয় স্মৃতিসৌধ, যেখানে মহামান্য একটি গাছ রোপণ করেন। একই সঙ্গে তিনি সুন্দরবনও পরিদর্শন করেছিলেন। মান্যবরের যাত্রা নির্দেশিকা থেকে জানা যায়, ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ—সুন্দরবন পরিদর্শন করেছিলেন ‘সন্ধানী’ জাহাজে এবং সেখানে মহামান্যকে মধ্যাহ্নভোজ পরিবেশন করা হয়েছিল।

যেহেতু মহামান্য রাজা সামরিক কর্মকর্তা ও পাইলট, তাই তাঁর সফরে কিছু সামরিক প্রতিষ্ঠানও পরিদর্শনের আয়োজন ছিল। মান্যবর অস্ট্রেলিয়ার ডানট্রুনের রয়েল মিলিটারি কলেজ এবং পরে থাইল্যান্ডের কমান্ড অ্যান্ড জেনারেল স্টাফ কলেজে পড়ালেখা করেন।

বাংলাদেশ সফরে মহামান্য রাজা বাংলাদেশের সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী প্রধানের সঙ্গে সাক্ষাতে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি মহামান্য যশোরে বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান ঘাঁটিতে বাংলাদেশের বিমানবাহিনীর বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট ও সংক্ষিপ্ত ব্রিফিংয়ে অংশগ্রহণ করেন। পরে সেখানে পাইলট প্রশিক্ষণকেন্দ্র পরিদর্শন করেন। সেদিন চট্টগ্রামে এসে মহামান্য ফোলটিলা ঘাঁটি থেকে বাংলাদেশ নৌবাহিনী জাহাজ আলী হায়দারে তাঁর রাজকীয় সফর শেষ করে থাইল্যান্ডের উদ্দেশে যাত্রা করেন।

এ ধরনের পরিদর্শন বিনিময়ে বন্ধুত্ব আরো ঘনিষ্ঠ হতে পারে এবং উভয় জাতির মধ্যে আন্তরিকতা বৃদ্ধি পাবে। যখনই উভয় পক্ষের সৌহার্দ্য বাড়বে, তখনই বিনিয়োগ ও সহযোগিতার নতুন নতুন জায়গা তৈরি হবে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ড সম্পর্কের মাইলফলক বিভিন্ন স্তরে অর্জিত হয়েছে এবং বহুমাত্রিক সহযোগিতার পথ তৈরি হয়েছে।

থাইল্যান্ডের মহামান্য রাজার যুবরাজ হিসেবে তিন দশক আগে বাংলাদেশ সফর একটি শুভ সূচনা থেকে এখন একটি বিদ্যমান বন্ধুত্বে রূপান্তরিত হয়েছে। এ ধরনের সাফল্যকে স্মরণ করার সর্বোত্তম উপায় হিসেবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বন্ধুত্ব ও আন্তরিকতা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে নিদর্শন করাই আমাদের দায়িত্ব।

 

লেখক : বাংলাদেশে নিযুক্ত থাইল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত



সাতদিনের সেরা