kalerkantho

বৃহস্পতিবার ।  ২৬ মে ২০২২ । ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ২৪ শাওয়াল ১৪৪

নারায়ণগঞ্জ প্রমাণ করল সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

১৯ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নারায়ণগঞ্জ প্রমাণ করল সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচন নিয়ে সবার মধ্যে প্রবল আগ্রহ ছিল। সাধারণ ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনা করে আওয়ামী লীগ দলীয়ভাবে ডা. সেলিনা হায়াত আইভীকে আবার প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়। বিএনপি দলীয়ভাবে কাউকে মনোনয়ন না দিলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির আহ্বায়ক এবং চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকারের বিরোধিতা করেনি।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার এটিকে তাঁর দেখা সর্বোত্তম নির্বাচন বলে আখ্যায়িত করেছেন।

বিজ্ঞাপন

সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘বিগত পাঁচ বছরে যতগুলো সিটি করপোরেশন নির্বাচন হয়েছে, আমার বিবেচনায় আমাদের প্রথম কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচন, সর্বশেষে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন সর্বোত্তম। ’

ব্যক্তিগতভাবে ডা. আইভী দুইবার পৌর মেয়র এবং গত দুই মেয়াদে নাসিক মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ ২০ বছর দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে তিনি নারায়ণগঞ্জের মানুষের কাছে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে বিবেচিত হওয়ার মতো কাজ করেছেন। সে কারণে আওয়ামী লীগের কোনো একটি অংশ তাঁর বিরোধিতা করলেও সাধারণ ভোটারদের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা ও সমর্থন তাঁর বিজয়ের পাল্লা ভারী করতে অতীতের মতো এবারও সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। সে কারণে আইভী দলীয় পরিচয়ের চেয়েও নারায়ণগঞ্জের মানুষের কাছে মেয়র পদে দক্ষ, অভিজ্ঞ এবং সবার প্রবেশাধিকার রয়েছে এমন একটি ভাবমূর্তি তৈরি করে রেখেছেন। নির্বাচনী প্রচারে তিনি তাঁর বক্তব্যে যেমন প্রতিপক্ষকে কখনো আক্রমণ না করে ভোটারদের ওপর আস্থার কথা প্রকাশ করেছেন, তেমনি দলের নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মীদেরও প্রচারের মাঠে কাজে লাগিয়েছেন। অন্যদিকে স্বতন্ত্র বলে পরিচিত বিএনপি নেতা তৈমূর আলম নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে পরিচিত মুখ হওয়া সত্ত্বেও ভোটাররা পরীক্ষিত মেয়র আইভীর ওপরই বেশি আস্থা স্থাপন করেছেন। তৈমূর আলম একসময় আইভীর বাবার রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন, পরে তিনি বিএনপি, জাতীয় পার্টি হয়ে আবার বর্তমানে বিএনপির নেতা হিসেবে পরিচিত হলেও দল তাঁকে ২০১১ সালে নির্বাচনের সাত ঘণ্টা আগে নির্বাচন বর্জনের শিখণ্ডী হিসেবে ব্যবহার করেছিল। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে তাঁকে মনোনয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েও শেষ পর্যন্ত দেয়নি। বর্তমান নাসিক নির্বাচনেও তাঁর প্রার্থিতা নিয়ে দ্বৈত আচরণ করেছে। তাঁকে একদিকে দুই পদ থেকেই প্রত্যাহার করেছে, অন্যদিকে নির্বাচনে নেতাকর্মীরা একাট্টা হয়ে তাঁর জন্য কাজ করেছেন। দলের কাছে তাঁর অবস্থান ও ভাবমূর্তির সংকট সহজেই প্রতিফলিত হয়েছে। ভোটাররাও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন।

নির্বাচনী প্রচারের শুরু থেকেই নারায়ণগঞ্জে বাগযুদ্ধ হয়েছে, কিন্তু প্রতিপক্ষের মধ্যে কোনো হানাহানি, এমনকি উত্তেজনা ছড়াতেও দেখা যায়নি। কোথাও কোনো দুর্ঘটনার খবর গণমাধ্যম বা সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত হতে দেখা যায়নি। মেয়র পদে সাতজন প্রার্থী থাকলেও শুরু থেকেই প্রচার ও বাগযুদ্ধ নৌকা ও হাতি মার্কার মধ্যে জমে উঠেছিল। তাঁর স্বতন্ত্র প্রার্থিতার আড়ালে বিএনপি এবং অন্যান্য দলের সমর্থনের বিষয়টি তুলে ধরতে ভুল করেননি। ডা. আইভী নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে নির্বাচনী প্রচারে সর্বত্র ভোটারদের কাছে গেছেন। অন্যদিকে তৈমূর আলম বিপুল নেতাকর্মীসহ প্রচার করেছেন, ভোটারদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছেন যে তিনি ভোটের ময়দানে শেষ পর্যন্ত থাকবেন।

হিসাব-নিকাশে কেন এমন হলো, সেটি তিনি পরে মূল্যায়ন করবেন। কিন্তু বিএনপিতে তাঁর আগের পদ ফিরে পাবেন কি? নির্বাচনের দিন সব দলের এজেন্ট সব কেন্দ্রেই ছিল। বিএনপির এজেন্ট কোথাও ছিল না—এমন অভিযোগ পাওয়া যায়নি। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিএনপির অনেক এজেন্ট কেন্দ্রের নির্বাচনী পরিবেশ সম্পর্কে কোনো অভিযোগ দেননি। ইভিএমে ভোট প্রদানে কোথাও কোথাও কিছুটা বিলম্ব হলেও কোনো কারসাজির অভিযোগ ইভিএম সম্পর্কেও কেউ করেননি। ভোটাররা নিরাপদে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে বাড়ি ফিরেছেন, সেই খবরও গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। সে কারণেই নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারের সঙ্গে একমত হয়ে বলা যায় যে নাসিক নির্বাচনটি মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ করেছে।

আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো চাইলে অবাধ, শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে। এ ধরনের নির্বাচন অনুষ্ঠানে সব অংশীজনের দায়িত্বশীল আচরণ করতেই হবে। শুধু এক পক্ষ চাইলেই সমগ্র নির্বাচনটি অর্থবহ হয়ে ওঠে না। প্রার্থীদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি যেমন জনবান্ধবমুখী হতে হবে, দলগুলোর নেতাকর্মীদেরও রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং আচরণ হতে হবে গণতন্ত্রের ধারণাসম্মত। নির্বাচন কমিশন আম্পায়ারের ভূমিকাটি পালন করবে আচরণবিধি অনুযায়ী। প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী মাঠে থাকবে শান্তি-শৃঙ্খলা যাতে কোনোভাবে ব্যাহত না হয় সেটি দেখার জন্য।

জনগণ প্রার্থীদের যোগ্যতা ও প্রয়োজনীয়তা দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠেও দেখার সুযোগ পায়; যখন দলগুলো কোনো বিতর্কিত ব্যক্তিকে নয়, বরং ডা. আইভীদের মতো জনবান্ধব নেতাদের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়। নাসিক নির্বাচন মনে হয় সব শর্তই পূরণ করেছে। সে কারণে নির্বাচনটি এযাবৎকালের শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা লাভ করেছে। বাংলাদেশে এমন নির্বাচন উপহার দেওয়া মোটেও অসম্ভব নয়। এটি এখন রাজনৈতিক মহলকে গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে।

মানুষ সহজ-সরল নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মীকেই বেশি ভালোবাসে, গ্রহণ করে—সেটি নাসিক নির্বাচনেই আবারও প্রমাণিত হয়েছে। এই শিক্ষাটি অন্যরাও গ্রহণ করলে দেশের রাজনীতির বাতাবরণ শ্যামল ছায়া ও সুবাতাসে ভরে উঠতে পারে।

 

লেখক : সাবেক অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

 

 



সাতদিনের সেরা