kalerkantho

বৃহস্পতিবার ।  ২৬ মে ২০২২ । ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ২৪ শাওয়াল ১৪৪

কালান্তরের কড়চা

জনগণের সঙ্গে সংযোগ বাড়াতে হবে

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

১৯ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



জনগণের সঙ্গে সংযোগ বাড়াতে হবে

দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ নতুন করে বাড়তে শুরু করেছে। সংক্রমণ ঠেকাতে স্বাভাবিকভাবেই সরকার উন্মুক্ত স্থানে সভা-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তার পেছনেও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে বলে অভিযোগ তুলেছে বিএনপি। করোনাভাইরাস সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় ১৩ জানুয়ারি থেকে কয়েকটি বিধি-নিষেধ আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

বিজ্ঞাপন

উন্মুক্ত স্থানে কোনো সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং রাজনৈতিক সভা-সমাবেশের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এ সম্পর্কে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম অভিযোগ তুলেছেন, বিএনপির সভা-সমিতি বন্ধ করার জন্যই সরকার বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে। দেশে করোনার দৈনিক সংক্রমণ ৯ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এ সময় সরকার নিশ্চুপ থাকতে পারে না। কিন্তু তার মধ্যেও বিএনপি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আবিষ্কার করেছে। এই বক্তব্য দেওয়ার পরেই বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম সস্ত্রীক করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। প্রার্থনা করি তাঁরা দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুন।

রাজনৈতিক স্বার্থে বর্তমান অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতেও সভা-সমিতি করতে গেলে কী হয় মির্জা ফখরুলের অসুস্থতাই তার প্রমাণ। বিএনপির এই অসন্তুষ্টির কারণ নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রচার চলছিল। সামনে আরেক ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হবে। অন্যদিকে খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানোর দাবিতে বিএনপির কর্মসূচি চলছে এখন। কিন্তু বিএনপির আন্দোলনের জন্য করোনায় মানুষ মরতে দেওয়া সরকারের পক্ষে সমীচীন হতো না।

গত সাধারণ নির্বাচনের সময় পশ্চিমবঙ্গে করোনা সংক্রমণ চলছিল। তখন বিজেপি দাবি করেছিল তাদের সভা-সমিতি চলতে দিতে হবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ভোট লাভের জন্য কলকাতা শহরে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হতে দিয়েছিল। এতে হাজার হাজার লোকের সমাবেশ হয়েছিল। ফল দাঁড়িয়েছিল, করোনায় কয়েক হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করে। পশ্চিমবঙ্গের এই উদাহরণ থেকে বাংলাদেশের সরকার এবার সতর্ক হয়েছে। তারা দেশে করোনা সংক্রমণ বাড়তেই উন্মুক্ত স্থানে সভা-সমিতির অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছে। এতে বিএনপির অসুবিধা হলেও সাধারণ মানুষের জান বাঁচবে। দেশে বিএনপির ভোট সমর্থন যদি বেড়ে থাকে, তাহলে উন্মুক্ত স্থানে জনসমাবেশ নিষিদ্ধ করেও আওয়ামী লীগ বিএনপির বিজয় ঠেকাতে পারবে না। সুতরাং মির্জা ফখরুল কেন আতঙ্কিত হলেন, তা বুঝতে পারা যাচ্ছে না।

দেখেশুনে মনে হয়, খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানোর দাবি ছাড়া বিএনপি জনগণের কাছে কোনো গ্রহণযোগ্য কর্মসূচি দিতে পারেনি। এখন যে বিএনপির জনসভায় দর্শকের সংখ্যা বেড়েছে, তার মূল কারণ অসুস্থ খালেদা জিয়ার প্রতি সহানুভূতি। বিএনপির জনপ্রিয়তা বেড়েছে, তাতে বোঝা যায় না। বিএনপির জনপ্রিয়তা বাড়েনি বলে আওয়ামী লীগের বেড়েছে—এ কথাও বলা যায় না। বিএনপি এখন কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে ২০০১ সালের নির্বাচনপূর্ব পরিস্থিতি দেশে ফিরিয়ে আনতে চায়। এ সময়ও ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ। কিন্তু বিএনপি তলে তলে ষড়যন্ত্র করে। তার কনসাস কিপার হন অনেক সুধী ব্যক্তি। অন্যদিকে বিদেশি কিছু রাষ্ট্রদূতও প্রকাশ্যে বিএনপিকে সমর্থন দেন। সংখ্যালঘুদের ওপর যথেচ্ছ আক্রমণ চালিয়ে তাদের ভোট আদায় করা হয়। এভাবে নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় বসা দেশের মানুষ পছন্দ করেনি। এবারও এভাবে নির্বাচনে কোনো দল জয়ী হলে তা দেশের মানুষ মেনে নেবে না। কিন্তু সেই ভরসায় বসে থাকাও চলবে না।

দেশে শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা আছে, কিন্তু আওয়ামী লীগের নেই। এই জনপ্রিয়তা ফিরিয়ে আনার জন্য আগামী দুই বছর আওয়ামী লীগকে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। দেশের নারীসমাজ ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নির্যাতিত হচ্ছে—এ ব্যাপারে তাদের নজর দিতে হবে এবং সংখ্যালঘু ভোট আওয়ামী লীগের জন্য নিশ্চিত করতে হবে। যেকোনো কারণেই হোক, সাধারণ মানুষের মনে এখন অনেক ক্ষোভ। ঘরে বসে না থেকে এই ক্ষোভ দূর করার জন্য মন্ত্রী ও এমপিদের জনসংযোগে বের হতে হবে। আওয়ামী লীগের নির্বাচন জয়ে মূলশক্তি ছিল বাংলাদেশের সাংস্কৃতিকজগৎ। সেই জগিট এখন মৃতপ্রায়। কিছুদিন আগে ঢাকার এক খ্যাতনামা চিত্র পরিচালককে জিজ্ঞেস করেছিলাম, দেশে তাঁদের অবস্থা কী? তিনি বললেন, সরকার আমাদের কোনো পাত্তা দেয় না। এত টাকা ব্যয়ে বঙ্গবন্ধুর ছবি নির্মিত হচ্ছে, তা সবই মুম্বাইয়ে। আমাদের কোনো পরামর্শ নেওয়া হয়নি। জাতির পিতার ভাস্কর্য জেলায় জেলায় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কোনো এক অদৃশ্য চাপে সেই কাজ সম্ভবত বন্ধ। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ যেভাবে ভারতের প্রকাশ্য সমর্থন এবং আমেরিকার নীরব সমর্থন লাভ করে নির্বাচনে জয়ী হয়েছিল, এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো। চীনকে রোখার জন্য আমেরিকা ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে কোয়াড নামে যে জোট তৈরি করেছে, বাংলাদেশ তাতে যোগ না দেওয়ায় ভারত ও আমেরিকা দুই দেশই তার ওপর সন্তুষ্ট নয়। নির্বাচন জয়ে একমাত্র চীনের সমর্থন কাজ করবে না। সুতরাং সরকারকে একটু বিপাকে পড়তে হয়েছে। এই গুরুতর পরিস্থিতির সময়ে দুই শক্তির মধ্যে বন্ধুত্ব রক্ষায় আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কতটা কূটনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দেবে, তা আমি জানি না।

পাকিস্তান আমলে প্রধানমন্ত্রীর পদে বসে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মার্কিন সামরিক চুক্তিতে সমর্থন করায় তখনকার আওয়ামী লীগের সভাপতি মঞ্চে লাথি মেরে বলেছিলেন, আমি এই চুক্তিকে লাথি মারি। ১৯৫৭ সালে আওয়ামী লীগের কাগমারী সম্মেলনে আওয়ামী লীগ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। বামপন্থীরা মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাপ নামে নতুন সংগঠন তৈরি করে। বর্তমানে অবশ্য আওয়ামী লীগের সে অবস্থা নয়। আওয়ামী লীগে এমন কোনো বাম শক্তি নেই, যারা কোয়াডে বাংলাদেশের যোগদান বন্ধ করার জন্য বিদ্রোহী হতে পারে। এখন বিষয়টি আওয়ামী লীগ সংগঠনের চেয়ে সরকারকে বেশি মোকাবেলা করতে হবে। এই অবস্থায় আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কৌশল ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার ওপর সমস্যার সমাধান নির্ভর করে। আগামী নির্বাচনে কোয়াড নিয়ে কোনো বিতর্ক উঠবে কি না, আমি জানি না। কিন্তু বাংলাদেশের ওপর আমেরিকা ও ভারতের নীরব চাপ অব্যাহত থাকবে। ভালো হতো যদি চীন ও আমেরিকার সঙ্গে বন্ধুত্ব ও অর্থনৈতিক সহায়তা অব্যাহত রাখা যেত।

প্রেসিডেন্ট দাউদের আমলে আফগানিস্তান আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে সমভাবে সহযোগিতা রক্ষা করে চলেছিল এবং তাতে আফগানিস্তানের দ্রুত উন্নতি হচ্ছিল। কিন্তু তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানের এই নিরপেক্ষতা অগ্রাহ্য করে দেশটিতে সেনা পাঠায় এবং রাষ্ট্রপতি দাউদকে সপরিবারে হত্যা করে। সেখানে কমিউনিস্ট শাসন বসায়। আমেরিকা তখন থেকে সেই কমিউনিস্ট সরকারকে উত্খাতের জন্য তালেবানসহ ইসলামী জঙ্গিগোষ্ঠী তৈরি করে। আফগানিস্তানের তৎকালীন পরিস্থিতি থেকে বাংলাদেশের শিক্ষা নেওয়া উচিত। কোয়াডে যোগদান না করে দুই মহাশক্তির মধ্যে নিরপেক্ষ নীতি গ্রহণ করলে শেষ রক্ষা হবে মনে হয় না। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারকে তাই এই মুহূর্তে সতর্কভাবে নীতি গ্রহণ করতে হবে। সমস্যা হচ্ছে, বাংলাদেশে এখন নানা ধরনের চক্রান্ত চলছে। আওয়ামী লীগ একা তা মোকাবেলা করতে পারবে কি? আগের মহাজোটটি কার্যত নিষ্ক্রিয়। দেশের নব্য ধনী ও আমলারা আওয়ামী লীগ সরকারকে কতটা সমর্থন করে, তা বোঝা মুশকিল। বিপদের সময় তারাই ভোল পাল্টায় তাড়াতাড়ি। আওয়ামী লীগ সরকারকে তাই জনগণের সঙ্গে সংযোগ বাড়াতে হবে এবং দেশের মানুষের আস্থা ফিরিয়ে এনে শক্তিশালী অবস্থানে যেতে হবে। একমাত্র জনগণের সঙ্গে সংযোগ বৃদ্ধি দ্বারাই আওয়ামী লীগ আগামী নির্বাচনে জয়ী হতে পারবে এবং জনগণের আস্থা নিয়ে বর্তমান সমস্যার মোকাবেলা করতে পারবে। সেই সঙ্গে শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তাও আওয়ামী লীগের জন্য সেরা শক্তি। দরকার আওয়ামী লীগের সংগঠিত হওয়া। সামনে দুই বছর আছে। এ সময়ও আওয়ামী লীগ সংগঠিত হতে না পারলে বিপদের আশঙ্কা আছে।

 

লন্ডন, রবিবার, ১৬ জানুয়ারি ২০২২

 



সাতদিনের সেরা