kalerkantho

শনিবার ।  ২১ মে ২০২২ । ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৯ শাওয়াল ১৪৪৩  

রাশিয়া ইস্যুতে ন্যাটোর ভূমিকা কি গৌণ হচ্ছে

চুই হংচিয়ান

১৬ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ইউক্রেনে যুদ্ধের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগের কারণে রাশিয়া ও পশ্চিমের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো এবং ইউরোপের নিরাপত্তা ও সহযোগিতা সংস্থা (ওএসসিই) রয়েছে। রুশ-আমেরিকা নিরাপত্তা আলোচনার সর্বশেষ পর্বটি প্রমাণ করে যে রাশিয়ার প্রতি আগ্রাসী কূটনৈতিক কার্যকলাপ পরিচালনার জন্য আমেরিকা প্রস্তুত নয় বা সক্ষম নয়। তবে দুই পক্ষই ইউক্রেন পরিস্থিতি ‘শান্ত’ করার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে কিছুটা ঐকমত্যে পৌঁছেছে বলে মনে হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

এর ফলে গত বুধবার রাশিয়ার সঙ্গে বৈঠকে বসা ন্যাটোকে কিছুটা বিব্রত বোধ করতে দেখা গেছে।

পশ্চিম ও রাশিয়ার মধ্যে ঢাল (বাফার) হিসেবে ইউক্রেন দুই পক্ষের ভূ-রাজনৈতিক খেলার এক নির্ণায়ক উপাদান। দেশটি রাশিয়ার জন্য মূল ভূ-রাজনৈতিক প্রতিরক্ষা, যদি সে পূর্ব দিকে মোড় নেয় এবং পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য রাশিয়াকে দমন করার একটি কৌশলগত অগ্রাধিকার, যদি সে পশ্চিমে মোড় নেয়। তাই ইউক্রেন সংকট ও এর সমাধান রাশিয়া ও পশ্চিমের মধ্যকার দ্বন্দ্বের এক প্রদর্শনী।

বাইডেন প্রশাসন ইউরোপের নিরাপত্তা সুরক্ষা দেওয়ার বার্তা দিয়ে রেখেছে। আবার রাশিয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ‘দ্বিপক্ষীয় কৌশলগত স্থিতিশীলতা সংলাপ’ চালিয়ে আসছে, যাতে দুই দেশের খেলায় একটি ‘নির্বিষ’ ব্যবস্থা তৈরি করা যায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটো ও ইউক্রেনকে পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছে, বিশেষ করে কৃষ্ণসাগর ঘিরে, যাতে রাশিয়ার বিরুদ্ধে কৌশলগত আক্রমণ শক্তিশালী করা যায়।

ওয়াশিংটনের নেতৃত্বে ইউক্রেন সমস্যার সমাধান হচ্ছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে আক্রমণ শুরু করার জন্য ন্যাটোকে ব্যবহার করা। তবে এর মধ্য দিয়ে ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গির বিচ্যুতি ঘটে। এমনটা হলে ইউক্রেন পরিস্থিতি দ্রুত সামরিক সংঘাতের দিকে সরে যাবে। অথচ ইউরোপ কূটনৈতিক আলোচনা ও স্বার্থ বিনিময়ের ওপরই বেশি জোর দেয়।

রুশ-মার্কিন আলোচনার সর্বশেষ পর্বটির পর ন্যাটো ও রাশিয়ার মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তাতে কোনো অগ্রগতি না হলেও দুই পক্ষের প্রত্যাশাই পূরণ হতে পারে। ন্যাটোর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করার হুমকি দিয়ে রাশিয়া অনুকূল দর-কষাকষির সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করতে পারে। আবার রাশিয়াকে আলোচনায় বাধ্য করার কারণে ন্যাটোকে সংলাপের পথেই থাকতে হতে পারে। এর মধ্য দিয়ে ন্যাটো প্রমাণ করতে পারে যে সে ইউরোপ-রাশিয়া সম্পর্ক এবং ইউরোপীয় নিরাপত্তায় এখনো তার ভূমিকা রয়েছে।

তবে সীমিত ‘রাজনৈতিক ফল’ অর্জন করার পর ন্যাটোকে একটি বিব্রতকর বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। এতে এই প্রশ্ন উঠে যে আলোচনায় ইউক্রেন পরিস্থিতি শান্ত করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া ঐকমত্যের যে ইঙ্গিত দিয়েছে, তাতে আমেরিকায় ন্যাটোর মূল্য কি গৌণ হবে? পরবর্তী আলোচনায় রাশিয়া যদি ন্যাটোর ইউক্রেনের সঙ্গে সহযোগিতা স্থগিত ও পূর্বমুখী সম্প্রসারণ বন্ধ করার বিষয়ে চাপ দেয়, তাহলে ন্যাটো কিভাবে ইউক্রেনের প্রতি তার ‘প্রতিশ্রুতির’র গুরুত্ব এবং আমেরিকার কাছে তার ‘মূল্য’ প্রমাণ করবে?

যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো ইউক্রেনকে অংশীদার হিসেবে দেখে; কিন্তু তাকে ন্যাটোর সদস্য পদ দেয়নি। এভাবে রাশিয়ার সঙ্গে তাদের খেলায় তারা ইউক্রেন ইস্যুতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে চায়। তারা ইউক্রেনকে সামরিক সহযোগিতা দিয়ে শুধু আঞ্চলিক পরিস্থিতিকে আলোড়িতই করেনি, বরং রাশিয়ার সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংঘাত এড়াতে তারা ন্যাটো সদস্যের বাইরে থাকা ইউক্রেনকে ব্যবহারও করতে চায়। তবে এই কৌশলটি রাশিয়ার জানা। তাই মস্কো কৌশলগত ক্ষতি এড়াতে সামরিক সংঘাত বৃদ্ধি পাওয়ার মধ্যেই ন্যাটোকে তার ইউক্রেনের সঙ্গে সম্পর্ক স্পষ্ট করতে বাধ্য করছে। যদি ন্যাটো এই যাত্রায় রাশিয়ার কৌশলগত ও কূটনৈতিক পাল্টা আক্রমণ বন্ধ করতে না পারে, তাহলে পূর্ব ও পশ্চিম উভয় ফ্রন্টে রাশিয়াকে কোণঠাসা করায় যেসব ‘সাফল্য’ অর্জন করা হয়েছে, তা শেষ হয়ে যাবে।

এই পরিস্থিতিতে ইউক্রেন সংকট ও রুশ-মার্কিন মিথস্ক্রিয়া ইউরোপকে অসুখী ও উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। তাই নিজেদের ভাগ্য নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার জন্য ইউরোপের উচিত কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে প্রকৃত অর্থে বাস্তবে প্রতিফলিত করা। তাকে ‘ইউরোপীয় সমস্যার ইউরোপীয় সমাধানের অগ্রাধিকার’ দেওয়ার জন্য মন স্থির করতে হবে। অন্যদের ওপর নির্ভর করার মূল্য হলো অন্যদের প্রভাবের প্রতি দুর্বলতা।

ইউক্রেন সমস্যা সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর নরম্যান্ডি ফরম্যাটে (ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া ও ইউক্রেন নিয়ে গঠিত কন্টাক্ট গ্রুপ) আস্থা পুনর্গঠন করা ইউরোপের জন্য অপরিহার্য। যখন রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের কথা আসে, তখন ফ্রান্স ও জার্মানির পরামর্শ অনুযায়ী আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমাতে উৎসাহিত করা এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে স্থিতিশীল অবস্থায় উন্নীত করা প্রয়োজন। যে বিষয়গুলো তার নিজস্ব নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করে, ন্যাটোর উচিত যুক্তরাষ্ট্রের দাবার ঘুঁটি হিসেবে বলি হওয়ার পরিবর্তে আমেরিকা-ইউরোপ দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থা ও ন্যাটো কাঠামোর মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে টেনে ধরা।

 

লেখক : চায়না ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ইউরোপিয়ান স্টাডিজ বিভাগের পরিচালক

সূত্র : গ্লোবাল টাইমসে প্রকাশিত নিবন্ধের ভাষান্তর



সাতদিনের সেরা