kalerkantho

শুক্রবার । ৭ মাঘ ১৪২৮। ২১ জানুয়ারি ২০২২। ১৭ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

স্মরণ

মানুষের কল্যাণের কথা বলতেন মানিক সাহা

পলাশ আহসান ও নিখিল ভদ্র

১৫ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মানুষের কল্যাণের কথা বলতেন মানিক সাহা

‘মানিক সাহার মৃত্যু, একটি আলোকিত যুগের অবসান’ মানিকদার নৃশংস হত্যার খবর পাওয়ার পর থেকেই মাথার মধ্যে এই উপলব্ধি ঢুকে যায়। প্রথম দিকে খানিকটা সন্দেহ ছিল। মনে হতো ব্যক্তিগত সম্পর্কের শ্রদ্ধাবোধে হয়তো আবেগতাড়িত। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে, ততই বিষয়টা পরিষ্কার হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

এখন খুব পরিষ্কার বুঝতে পারি মানিক সাহা সভ্য সাংবাদিকদের প্রতিনিধি। যাঁদের সংখ্যা খুব কম, নেহাত হাতে গোনা। যাঁরা প্রত্যেকে একে অন্যের প্রতিচ্ছবি।

এখন কবিগুরুর কাছে ফিরতেই হচ্ছে। ভালো যত কম হয় তত ভালো। নইলে ভিড়ের মধ্যে তিনি হয়ে যান মাঝারি। মনে হয়, সেই তত্ত্ব এখন খানিকটা বদলেছে। কারণ মন্দরা বুঝে গেছে, কূটকৌশল করে ভালোদের দমিয়ে রাখা যায়। মাঝারিদের দলে ভিড়িয়ে, কেউ মাথা উঁচু করলে দল বেঁধে ছেঁটে দেওয়া যায় সেই মাথা। তারাই ২০০৪ সালের ১৫ জানুয়ারি মানিক সাহার উঁচু মাথাটা ছেঁটে  দিয়েছিল। খুলনা প্রেস ক্লাবের পাশে, ছোট মির্জাপুর এলাকায় পড়ে ছিল মানিকদার মাথাহীন মরদেহ। মানিক সাহাকে হত্যার মধ্য দিয়ে ‘উঁচু মাথার কোনো সাংবাদিক বাঁচবে না’—এমন একটি বার্তা দিতে চেয়েছিল তারা।

কিন্তু মাথা হারালেও মানিকদা মাঝারি হননি। হতে চাননি বলা ভালো। কোথায় তাঁর মাথা উঁচু ছিল না? দেখা থেকে বলছি, বাংলাদেশের সাংবাদিকতার যে বড় ধারাটি রাজনীতি চর্চা থেকে সাংবাদিকতায় আসতেন মানিকদা ও তাঁর সমসাময়িকরা ছিলেন সেই ধারার শেষ প্রতিনিধি। যাঁরা পেশায় থেকেও রাজনীতি চর্চা করতেন। হাটে-মাঠে-ঘাটে মানুষের কল্যাণের কথা বলতেন, অধিকার সচেতনতার কথা বলতেন। আবার সন্ধ্যায় বার্তাকক্ষে আরেকভাবে সেই মানুষের কথাই বলতেন। মানিক সাহা আর কেউ নন, একজন প্রকৃত সাংবাদিকের আয়না। যিনি সত্য প্রকাশের রাজনীতি বা আদর্শ নিয়ে সাংবাদিকতায় এসেছেন। রাষ্ট্রীয় সম্মান একুশে পদক ও আন্তর্জাতিক সততা পুরস্কার পেয়েছেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। যিনি সাংবাদিকতা ও রাজনীতির পাশাপাশি ছিলেন সাংস্কৃতিক সংগঠক ও মানবাধিকার কর্মী। কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে জীবনের শেষ ১০-১২ বছর সাংবাদিকতাই ছিল তাঁর মূল পরিচয়। সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণে কথা বলার সময় বলতেন, চোখ-কান খোলা রেখে ঠিকঠাক সাংবাদিকতা করতে পারলে মানুষের যথেষ্ট কল্যাণ হয়। তিনি বলতে চাইতেন, রাজনীতিসচেতন হয়ে সাংবাদিকতা করলে সেই সাংবাদিকতা কল্যাণমুখী হয়।  

খুলনা অঞ্চলে মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে অথচ মানিক সাহার ভালো রিপোর্ট নেই, এটা অসম্ভব। সে চিংড়ি চাষ হোক অথবা কৃষকের কাছে বিষাক্ত সার বিক্রিই হোক। ভূমিহীন আন্দোলন হোক বা ধান চাষের জমি দখল করে চিংড়ি চাষ করা হোক। জঙ্গি তৎপরতা কিংবা সর্বহারার নামে সন্ত্রাসবাদ, যাই হোক। শুধু নিজে রিপোর্ট করতেন তা নয়, অন্যরা চাইলেই যেন রিপোর্টটি করতে পারেন তার সব ব্যবস্থাই করতেন। এতে ক্ষতি হতো একটি বিশাল পুঁজিপতি শ্রেণির। তাহলে তিনি কেন বাঁচবেন?

আন্তর্জাতিক তথ্যভাণ্ডার উইকিপিডিয়া বলছে, দেশ স্বাধীনের পর ১৯৯৬ সালে নীলফামারীতে প্রথম একজন পেশাদার সাংবাদিকের হত্যা ঘটনা আলোচিত হয়। তিনি ছিলেন ‘নীল সাগর’ নামে একটি পত্রিকার রিপোর্টার। মারা যান একটি নির্বাচনী বিক্ষোভের খবর সংগ্রহের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে। আজও সেই মৃত্যুর রহস্য উদঘাটিত হয়নি।

খুলনার সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর বালু হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে। সাংবাদিক হত্যার অন্য মামলাগুলোর কোনোটির বিচার শুরু হয়নি। কোনোটির চার্জশিট দেওয়া হয়নি। আবার কোনোটি নথিপত্রের অভাবে হারিয়ে গেছে। সব অমীমাংসিত রহস্যের জট লেগে যায় বিচারের ক্ষেত্রে। কিভাবে যেন সাক্ষীরাও একে একে হারিয়ে যান।

মানিক সাহা হত্যার মধ্যেই রয়েছে বাংলাদেশে বেশির ভাগ সাংবাদিক হত্যার সরল সমীকরণ। কারণ এই হত্যাকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে বেশির ভাগ সাংবাদিক হত্যার অন্তত মিল পাওয়া যায়। যেমন ধরুন, মৃত্যুর ১০ মিনিট আগে কারা যেন মানিক সাহার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল? তাদের সঙ্গে কেন উত্তপ্ত কথা-কাটাকাটি হয়েছিল? আজও জানা যায়নি কে বা কারা সেই অপরিচিত লোক, কারা মানিক সাহার সঙ্গে প্রেস ক্লাবের মতো জনবহুল জায়গায় আসতে পেরেছিল। তারা কোথায় উধাও হয়ে গেল। আজও পুরো বিষয়টি অন্ধকারে।

মানিক সাহা হত্যায় জড়িত মোট ১৪ জন অপরাধী চিহ্নিত হলেন। যাঁদের তিনজন মারা গেলেন ক্রসফায়ারে। ৯ জন যাবজ্জীবন পেলেন। তাঁদের পাঁচজন আটক হলেন। অথচ তাঁদের কাছ থেকে কোনো তথ্য বের হলো না। কে বা কারা তাঁদের মানিক সাহাকে হত্যা করতে বলল জানা গেল না। তাহলে কি ভাবতে হবে, একদল ভাড়াটে খুনি কোনো ধরনের পরিকল্পনা ছাড়াই মানিক সাহাকে হত্যা করলেন?

বাংলাদেশের সাংবাদিক কোনো অর্থেই নিরাপদ নন। নিরাপদ হওয়ার কথাও নয়। কারণ কাজের ধরনে সব সময় তাঁকে একাধিক শক্তিশালী চক্রের বিরাগভাজন হয়ে থাকতে হয়। এটা জেনেই একজন তরুণ সাংবাদিকতায় আসেন। তাঁরা জানেন, মানিকদার মতো একজন সাংবাদিক মারা গেলে একটি বিশেষ মহল তো বলবে, যাক আপদ গেছে। কিন্তু একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী তো মুষড়ে পড়ে, আশ্রয়হীন হয়ে যায়। তাদের কথা চিন্তা করে হলেও সাংবাদিক হত্যার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করা দরকার। দোষীদের শাস্তি দেওয়া দরকার।

নির্ভীক সাংবাদিক মানিক সাহার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

 লেখকদ্বয় : সাংবাদিক

 



সাতদিনের সেরা