kalerkantho

শুক্রবার । ৭ মাঘ ১৪২৮। ২১ জানুয়ারি ২০২২। ১৭ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

ব্যাংক হিসাব থেকে একাধিকবার এক্সাইজ ডিউটি আদায়

নিরঞ্জন রায়

১৩ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ব্যাংক হিসাব থেকে একাধিকবার এক্সাইজ ডিউটি আদায়

যাঁদের ব্যাংকে হিসাব আছে তাঁরা ডিসেম্বর মাসের শেষে যথারীতি দেখতে পান যে তাঁদের হিসাব থেকে কিছু অর্থ কেটে নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে একটি হচ্ছে এক্সাইজ ডিউটি আদায়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বিধান অনুযায়ী প্রতিটি ব্যাংক হিসাবে লেনদেনের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হারে এক্সাইজ ডিউটি কর্তনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কাস্টমস, ভ্যাট এবং এক্সাইজ ডিউটি দপ্তর থেকে ১৪ জুন ২০২০ তারিখে জারি করা পরিপত্র অনুযায়ী এক লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন এক্সাইজ ডিউটির আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। এক লাখ থেকে পাঁচ লাখ পর্যন্ত ১৫০ টাকা, ছয় লাখ থেকে ১০ লাখ পর্যন্ত ৫০০ টাকা, ১০ লাখ থেকে এক কোটি টাকা পর্যন্ত এক হাজার ৫০০ টাকা, এক কোটি থেকে পাঁচ কোটি পর্যন্ত ১২ হাজার টাকা এবং পাঁচ কোটি টাকার ওপরে লেনদেন হয় এমন হিসাব থেকে বছরে ২৫ হাজার টাকা এক্সাইজ ডিউটি কর্তন করার বিধান আছে এবং ব্যাংক সেটা বাধ্যতামূলকভাবে করেও থাকে।

বিজ্ঞাপন

অনেকেই ভাবতে পারেন এই সামান্য পরিমাণ এক্সাইজ ডিউটি কেটে নেওয়ার কারণে এমন কী হতে পারে! কিন্তু সীমিত আয়ের মানুষের কাছে এই সামান্য অর্থেরও গুরুত্ব অনেক বেশি। বিশেষ করে যেখানে ব্যাংকে অর্থ জমা রেখে সুদ বা লাভ পাওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই কমে এসেছে। তার চেয়েও বড় কষ্টের কারণ হয়ে দেখা দেয়, যখন একই হিসাব থেকে একাধিকবার এই এক্সাইজ ডিউটি আদায় করা হয়।

বাংলাদেশে প্রচলিত সেই ১৯৪৪ সালের এক্সাইজ এবং সল্ট আইন অনুযায়ী এক্সাইজ ডিউটি আদায় করা হয়। সেই আইনের অধ্যায় দুইয়ের তিন ধারায় বলা আছে, যেসব উৎপাদিত পণ্য ও সেবার ওপর এক্সাইজ ডিউটি প্রযোজ্য হবে সেসব পণ্য ও সেবার ওপর নির্ধারিত হারে এক্সাইজ ডিউটি প্রদান করতে হবে। ব্যাংকের সেবার ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারের উল্লেখ করে বলা আছে, যেকোনো ধরনের ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে সেবা প্রদান করা হলে তার ওপর এক্সাইজ ডিউটি প্রদান করতে হবে। আর এ কারণেই ব্যাংক হিসাবে বছরে বিভিন্ন লেনদেনের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন হারে এক্সাইজ ডিউটি ব্যাংক গ্রাহকদের হিসাব থেকে আদায় করে থাকে। আমার অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সেই অর্ডার পড়ার সুযোগ হয়নি, ফলে আমি নিশ্চিত করে বলতে পারব না যে আসলে ব্যাংকের কোন কোন সেবা হিসাবের আওতায় পড়বে। তবে স্থায়ী আমানতের যে লেনদেন বৈশিষ্ট্য তাতে ফিক্সড ডিপোজিট (এফডিআর) বা স্থায়ী আমানত কোনো অবস্থাতেই ব্যাংকের হিসাবের পর্যায়ে পড়ার কথা নয়, এর পরও এই এফডিআর থেকে প্রতিবছর বিভিন্ন হারে এক্সাইজ ডিউটি আদায় করা হয়। বিশ্বের অনেক দেশেই এই এক্সাইজ ডিউটি আদায় করার ব্যবস্থা আছে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এবং কানাডাতেও এক্সাইজ ডিউটি আদায় করা হয়ে থাকে। তবে সর্বত্রই দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদিত পণ্যের ওপর এক্সাইজ ডিউটি প্রদান করতে হয় এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তা উৎপাদন পর্যায় বা প্যাকেজিং পর্যায়ে ব্যবসায়ীরা প্রদান করে থাকেন। গ্রাহকরা সরাসরি এক্সাইজ ডিউটি প্রদান করেন না। এক্সাইজ ডিউটির সঙ্গে কাস্টমস ডিউটির একটি মৌলিক পার্থক্য হচ্ছে, কাস্টমস ডিউটি আমদানি করা পণ্যের ওপর প্রদান করতে হয় আর এক্সাইজ ডিউটি দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদিত পণ্যের ওপর প্রদান করতে হয়। আমাদের দেশে পণ্য ছাড়াও সেবাকেও এই এক্সাইজ ডিউটির আওতায় রাখা হয়েছে।

যা হোক এক্সাইজ ডিউটি সরকারের রাজস্ব আদায়ের একটি উৎস এবং জনগণও এই এক্সাইজ ডিউটি দিতে রাজি আছে, যদিও জনগণের মধ্যে করের অর্থ ব্যয়ের বিষয় নিয়ে নানা আলোচনা আছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, একই বিষয়ে একাধিকবার এক্সাইজ ডিউটি কোনোভাবেই যুক্তিসংগত হতে পারে না। ব্যাংক থেকে গ্রাহকরা অনেক রকম সেবা নিয়ে থাকেন এবং সব ধরনের সেবাই একটি হিসাব থেকে নেওয়া হলেও প্রতিটি সেবাকে একেকটি পৃথক হিসাব বিবেচনা করে ভিন্ন ভিন্নভাবে এক্সাইজ ডিউটি আদায় করা হয়, যা মোটেই যুক্তিসংগত নয়। একজন গ্রাহক যদি একটি ব্যাংক থেকে ১৫ লাখ টাকার এফডিআর ভেঙে অন্য ব্যাংকে নিয়ে একই পরিমাণ অর্থের নতুন একটি এফডিআর ক্রয় করে সেই এফডিআরের বিপরীতে ১২ লাখ টাকা ঋণ গ্রহণ করে তাহলে তাঁকে সর্বমোট সাত হাজার ৫০০ টাকা এক্সাইজ ডিউটি দিতে হবে। প্রথম ব্যাংকে দিতে হবে তিন হাজার টাকা, অর্থাৎ এফডিআরের জন্য এক হাজার ৫০০ টাকা এবং যে হিসাবের মাধ্যমে টাকা স্থানান্তর করা হবে সেই হিসাবে আরো এক হাজার ৫০০ টাকা। অনুরূপভাবে দ্বিতীয় ব্যাংকেও দিতে হবে চার হাজার ৫০০ টাকা এক্সাইজ ডিউটি, অর্থাৎ যে হিসাবে টাকা স্থানান্তর করে আনা হবে সেই হিসাবে এক হাজার ৫০০ টাকা, এফডিআরের জন্য এক হাজার ৫০০ টাকা এবং ঋণ হিসাবের জন্য আরো এক হাজার ৫০০ টাকা। লেনদেনের পরিমাণ ১৫ লাখ টাকা থাকলেও এক্সাইজ ডিউটি দিতে হচ্ছে পাঁচবার এবং সর্বমোট সাত হাজার ৫০০ টাকা। একাধিকবার এভাবে এক্সাইজ ডিউটি আদায়ের ক্ষেত্রে এনবিআরের অবশ্য তেমন কোনো নির্দেশনা নেই। এক্সাইজ এবং সল্ট আইনে এক্সাইজ ডিউটি দেওয়ার কথা বলা আছে। প্রতিটি সেবার জন্য পৃথক হিসাব খুলতে হবে তেমন কথা সেই আইনে বলা নেই। এই ব্যবস্থা মূলত বাণিজ্যিক ব্যাংকের একান্তই নিজস্ব সিদ্ধান্ত এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মাত্র। আর আগে গ্রাহকদের চলতি হিসাবে ঋণসীমা বা ওভারড্রাফট দেওয়া হতো, ফলে গ্রাহকদের তখন ডাবল এক্সাইজ ডিউটি দেওয়ার প্রয়োজন পড়েনি। কী মনে করে বাংলাদেশ ব্যাংক এক নির্দেশনা দিয়ে চলতি হিসাবে ঋণসীমা বা ওভারড্রাফট প্রদান বন্ধ করে দেয়। তাদের নির্দেশনা মোতাবেক ঋণদানের জন্য পৃথক হিসাব খুলতে হবে। এতে বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রাহকদের দুই ধরনের ক্ষতির কারণ ঘটিয়েছে। প্রথমত, গ্রাহকদের দুবার এক্সাইজ ডিউটি দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, গ্রাহকদের ঋণের ওপর অধিক সুদ দিতে হয়, কারণ গ্রাহকের যেকোনো অর্থ প্রথমে চলতি হিসাবে জমা হয় এবং পরবর্তী সময়ে পৃথক নির্দেশনা দিয়ে সেই অর্থ ঋণ হিসাবে স্থানান্তর না করা পর্যন্ত ঋণ হিসাবে সমপরিমাণ অর্থের ওপর সুদও দিতে হয়। আর চলতি হিসাব থেকে ঋণ হিসাবে প্রতিনিয়ত অর্থ স্থানান্তরের নির্দেশনা প্রদান করা সব সময় সম্ভব হয় না এবং এটা বাস্তবসম্মতও নয়।

একজন গ্রাহকের একটি মূল বা প্রধান ব্যাংক হিসাব রেখে তার সঙ্গে বিভিন্ন সংখ্যার বর্ধিত অংশ যোগ করে খুব সহজেই এই সমস্যার সমাধান করা যায়। যেমন—কোনো গ্রাহক ব্যাংকে হিসাব খুললে তাঁকে প্রথমেই একটি প্রধান হিসাব নম্বর ৯০০৮৬-৪৪৫৬০০৩৫৬-০০০ প্রদান করা যেতে পারে। এরপর সেই গ্রাহক যত ধরনের সেবা নেবেন তার জন্য শেষের তিনটি ভিন্ন সংখ্যা বসিয়ে এই সেবা প্রদান করা যেতে পারে। যেমন—সেই গ্রাহক যদি ব্যাংক থেকে এফডিআর নেন, তখন তাঁকে ৯০০৮৬-৪৪৫৬০০৩৫৬-১০০ হিসাব দেওয়া হবে। একইভাবে সেই গ্রাহক যদি ওভারড্রাফট নিতে চান তখন তাঁকে ৯০০৮৬-৪৪৫৬০০৩৫৬-২০০, টাইম লোন নিতে চাইলে তখন তাঁকে ৯০০৮৬-৪৪৫৬০০৩৫৬-৩০০, টার্ম লোন নিতে চাইলে তখন তাঁকে ৯০০৮৬-৪৪৫৬০০৩৫৬-৪০০ দেওয়া যেতে পারে। আর এক্সাইজ ডিউটি ধার্য হবে গ্রাহকের মূল হিসাবের ওপর, ফলে গ্রাহককে তখন আর একাধিকবার এক্সাইজ ডিউটি দিতে হবে না। এই ধরনের হিসাব রাখার ক্ষেত্রে আরো একটি বড় সুবিধা হচ্ছে যে গ্রাহকের মূল বা প্রধান হিসাব জানলেই তাঁর ব্যাংকে কোথায় কী আছে সব জানা সম্ভব। এ জন্য একাধিক হিসাব নম্বর মনে রাখার কোনো প্রয়োজন নেই।

আমাদের দেশে করদাতার সংখ্যা খুবই নগণ্য এবং সরকারের রাজস্ব আদায়ের উৎসও বেশ সীমিত, এ ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই। আবার দ্বৈত কর প্রদান এবং বেশি কর প্রদান করে ফেরত না পাওয়ার অভিযোগও নেহাত কম নয়। শুধু সিস্টেমের সীমাবদ্ধতার কারণে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সঠিক নির্দেশনার অভাবে গ্রাহকদের ব্যাংক হিসাব থেকে একাধিকবার এক্সাইজ ডিউটি আদায় করার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। একই হিসাব থেকে এ ধরনের একাধিকবার এক্সাইজ ডিউটি আদায় কোনোভাবেই যুক্তিসংগত নয় এবং এই ব্যবস্থা বন্ধ হওয়া উচিত। আমরা আশা করব বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টি বিবেচনা করবে এবং এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করবে।                      

লেখক : ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা

[email protected]

 



সাতদিনের সেরা