kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৩ মাঘ ১৪২৮। ২৭ জানুয়ারি ২০২২। ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

স্মরণ

রোকেয়া ও নারীর জেগে ওঠা

স্বাতী চৌধুরী

৯ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



রোকেয়া ও নারীর জেগে ওঠা

সেই কতকাল আগে নারীর ওপর পুরুষ বা পুরুষতন্ত্রের প্রভুত্ব পর্যবেক্ষণ করে রোকেয়া লিখেছিলেন, ‘অনেকে মনে করেন পুরুষের উপার্জিত ধন ভোগ করে বলিয়া নারী তাহার প্রভুত্ব সহ্য করে। সে জন্য তাহাকে মস্তক নত করিতে হয়। কিন্তু এখন স্ত্রীজাতির মন পর্যন্ত দাস হওয়ায় দেখা যায়, যে স্থলে দরিদ্র স্ত্রীলোকেরা সূচিকর্ম বা দাসীবৃত্তি করিয়া পতিপুত্র পালন করে, সেখানেও ঐ অকর্মণ্য পুরুষরাই স্বামী থাকে। আবার যিনি স্বয়ং উপার্জন না করিয়া প্রভূত সম্পত্তির অধিকারিণীকে বিবাহ করেন, তিনিও স্ত্রীর উপর প্রভুত্ব করেন এবং স্ত্রী তাহার প্রভুত্বে আপত্তি করেন না।

বিজ্ঞাপন

ইহার কারণ এই যে বহুকাল হইতে নারী হৃদয়ের উচ্চবৃত্তিগুলি অঙ্কুরে বিনষ্ট হওয়ায় নারীর অন্তর বাহির, মস্তিষ্ক সবই দাসী হইয়া পড়িয়াছে। এখন আর আমাদের হৃদয়ে স্বাধীনতা, ওজস্বিতা বলে কিছু নাই এবং তাহা লাভ করিবার প্রবৃত্তি পর্যন্ত লক্ষিত হয় না। ’

তাই তিনি ডাক দিয়েছিলেন, ‘অতএব, জাগো, জাগো গো ভগিনী’। প্রশ্ন জাগে রোকেয়াকে জেগে ওঠার জন্য কেউ কি ডেকেছিল? আসলে কেউ কেউ নিজেই জেগে ওঠেন। ডাকতে হয় না। রোকেয়াও নিজেই জেগে উঠেছিলেন। তাঁর আগেও এ রকম জনাকয়েক জেগে উঠেছিলেন। এই বাংলায়ই। নওয়াব ফয়জুন নেছা। তেজস্বী নারী। ব্রিটিশদের কাছ থেকে প্রাপ্ত বেগম উপাধি প্রত্যাখ্যান করে নওয়াব উপাধি আদায় করেছিলেন। নারীশিক্ষার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলেছেন। তাই রোকেয়াকেই নারী জাগরণের অগ্রদূত বলা হয়। কারণ তিনি জেগে ওঠার জন্য যে মন্দ্রস্বরে ডেকেছিলেন সেভাবে কেউ ডাকেনি। কথা হচ্ছে তাঁর ডাকে কি জেগেছিল নারীর দল? কেউ কেউ তো জেগেছিল। কারণ অনেকেই ডাকলে জেগে ওঠেন। আবার জেগে জেগে যারা ঘুমায়, তাদের শত ডাকলেও জাগে না। সেই কতকাল আগে ১১৬ বছর হয়ে গেল ‘স্ত্রী জাতির অবনতি’ প্রবন্ধে তিনি ঘুমন্ত নারীর দলকে ডেকেছিলেন। তারপর কত কোটি কোটি নারী জেগে উঠেছে। রোকেয়ার উত্তরসূরি আরো কতজন ডেকেছেন; কিন্তু এখনো কোটি কোটি নারীর কালঘুম ভাঙেনি বা জেগে জেগে ঘুমিয়ে থাকাদের সংখ্যা আরো বেড়েছে।

কিন্তু যাঁরা জেগেছেন, সেই কোটি কোটি নারী, যাঁদের পদভারে ভোরের আকাশ-বাতাস, উঠোন-ঘর থেকে নগরীর রাজপথ জেগে ওঠে; কলকারখানার চাকা ঘোরে, ফসলের মাঠে সবুজের ঢেউ খেলে যায়; যাঁদের হাতের ছোঁয়ায় সোনা হয়ে ওঠে মাটি—তাঁদের জীবনের উন্নতি হয়েছে কতটুকু? নিজের জন্য অধিকার আদায় করেছেন কতটুকু? নারীর ওপর পুরুষের প্রভুত্ব খাটানোর কি অবসান ঘটেছে?

আজও আমাদের কৃষক নারী উৎপাদিত ফসলের মালিকানা পায় না। গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি পালন করে যে টাকা আসে, তাতে তার অধিকার থাকে না। সারা দিন ঘর-গেরস্তালির কাজের মূল্যায়ন পায় না। যে সন্তানকে গর্ভে ধারণ করে, লালন-পালন করে, সে সন্তানের অভিভাবকত্ব পায় না। বেশির ভাগ গার্মেন্টসহ কলকারখানার শ্রমিক নারী থেকে অফিস-আদালতের কর্মচারী ও শিক্ষক নারীদের বেতনের ওপর তাঁদের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। নিজের বেতনের টাকা স্বামীর হাতে তুলে দিয়ে নিজের হাতখরচ চেয়ে নিতে হয়। কেন? কারণ রোকেয়া যে বলেছিলেন, ‘নারী হৃদয়ের উচ্চবৃত্তিগুলি অঙ্কুরে বিনষ্ট হওয়ায় নারীর অন্তর বাহির, মস্তিষ্ক সবই দাসী হইয়া পড়িয়াছে। ’ নারীর মনের সেই দাসত্ব ঘোচানোর যে শিক্ষা দরকার সে শিক্ষায় নারীরা আজও শিক্ষিত হয়ে ওঠেনি। যদিও আমাদের নারীশিক্ষার হার অনেক বেড়ে গেছে। কিন্তু রোকেয়া যে তাঁর সারাটা জীবন নারীশিক্ষার কাজে ব্যয় করে গেলেন সে কি শুধু ওই প্রাতিষ্ঠানিক সার্টিফিকেটসর্বস্ব শিক্ষার জন্য?

রোকেয়ার ‘সুগৃহিণী’ প্রবন্ধের বক্তব্য নিয়ে ইদানীং কিছু অতি নারীবাদীকে সমালোচনা করতে দেখেছি। কিন্তু আমি বলব, এই ‘সুগৃহিণী’ প্রবন্ধের অন্তর্নিহিত বক্তব্য অত্যন্ত ব্যাপক। প্রত্যেক নারী, সে যা-ই হোক, শেষ পর্যন্ত গৃহিণীই তো? যেমন একজন পুরুষও গৃহস্থ। সে তার গৃহকে আশ্রয় করে থাকে বলে। কিন্তু রোকেয়া ওই প্রবন্ধে যা বলেছেন, তার গূঢ় অর্থ নারীকে পরিপূর্ণ শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার ওপর নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, একজন নারী সুগৃহিণী তখনই হবে, যখন তার প্রকৃত শিক্ষা থাকবে। কারণ শিক্ষা ছাড়া ঘর পরিপাটি রাখা, পুষ্টিকর খাবার তৈরি, অসুস্থ মানুষটির সঠিক ওষুধ-পথ্য প্রদান এবং তার নিজেকে সুস্থ রাখার জন্য বিনোদন—তা ছবি আঁকা বা সংগীতচর্চা, সর্বোপরি একজন সংবেদনশীল মানুষ হওয়া শিক্ষা ছাড়া সম্ভব নয়; এমনকি সুগৃহিণী হওয়ার জন্য একজন নারীকে অন্দরমহলের বাইরে পাঁচজনের সঙ্গে মেলামেশা করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন। কারণ তাতে জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি মনকেও প্রসারিত করা যায়। তা সেই সময়ে, যেখানে শিক্ষিত লোকজনই নারীর শিক্ষা গ্রহণটাকেই প্রয়োজন মনে করত না, সেখানে রোকেয়া একজন নারীর এই পরিপূর্ণ শিক্ষার আয়োজনের কথা বলেছিলেন। কারণ তিনি জানতেন সমাজ নারীর সুগৃহিণী হওয়ার প্রয়োজনীয়তাটাকে আমলে নিয়ে অন্তত নারীশিক্ষার প্রয়োজনটা মেনে নিক। আর একজন নারী পরিপূর্ণভাবে শিক্ষিত হলে তার মনের দাসত্ব ঘুচিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে যে সে কি শুধু গৃহব্যবস্থাপনাই করবে, নাকি বাইরের কর্মযজ্ঞে প্রবেশ করবে।

আজ আমাদের নারীশিক্ষার হার বেড়েছে; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ শিক্ষা গ্রহণের পরও সবার মনের দাসত্ব ঘোচেনি। যে অবরোধ প্রথার বিরুদ্ধে রোকেয়া সংগ্রাম করে গেলেন, আজ এত বছর পরও আমাদের শিক্ষিত নারীরা নিজেদের প্যাকেটবন্দি করে রাখেন। প্রশাসনের উচ্চ পদে কর্মরত ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নারীদের গেটআপ দেখলে মনে হয় তাঁরাও নিজেকে মানুষ নয়, শুধু শরীর ভাবেন। শরীরের ভেতরে যে মন নামের সত্তা সেটাকে মুক্ত করতে পারেননি তাঁরা। তাইতো দেখি বর্তমান শিক্ষা সব নারীর মনের জড়তা দাসত্ব ঘোচাতে পারেনি। আসলে শিক্ষার তো দোষ নেই, দোষ হচ্ছে ব্যবস্থার। তাই জেগে ওঠার ডাক সবাই শুনতে পায় না বা শুনলেও জেগে ওঠে না।

কিন্তু জেগে না উঠলে যে অমারাত্রির অন্ধকার ঘুচিয়ে সকাল হয় না। এই যে চারদিকে অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। একজন মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়েছে, তাঁর বিরুদ্ধে একটি সংগঠিত নারীপক্ষের আওয়াজ উঠেছে। সভ্য ও মানবিকবোধসম্পন্ন পুরুষরাও শামিল হয়েছেন বলে।

যে শিক্ষা পুরুষতন্ত্রের আনুগত্য ও দাসত্ব ঘোচাতে পারে না, যে শিক্ষা জেগে জেগে ঘুমিয়ে থাকতে বলে—আমরা কি চাই সেই শিক্ষা? যে শিক্ষার জোরে রোকেয়া নারীদের জেগে ওঠার আহ্বান জানিয়েছিলেন, সেই জেগে ওঠার ডাক শাশ্বত চিরন্তন। এ ডাক সব কূপমণ্ডূকতার বিরুদ্ধে জেগে ওঠার ডাক। এ ডাক সব দুর্বৃত্তপনার বিরুদ্ধে জেগে ওঠার ডাক। এ ডাক সব ধরনের অশুভকে বিনাশ করে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষের মানুষ হয়ে ওঠার ডাক। অতএব জাগো, জাগো গো ভগিনী।

 লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাধারণ সম্পাদক বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া

 

 



সাতদিনের সেরা