kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৩ মাঘ ১৪২৮। ২৭ জানুয়ারি ২০২২। ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

গণতন্ত্র সম্মেলন থেকে বাংলাদেশ বাদ পড়ল কেন

ড. প্রণব কুমার পাণ্ডে

৮ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



গণতন্ত্র সম্মেলন থেকে বাংলাদেশ বাদ পড়ল কেন

আগামী ৯ ও ১০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের নির্বাচনী ওয়াদা অনুযায়ী সামিট ফর ডেমোক্রেসি অর্থাৎ গণতন্ত্র সম্মেলন। নির্বাচনের আগেই জো বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের কাছে ওয়াদা করেছিলেন যে তিনি নির্বাচিত হলে গণতন্ত্রের ওপর এই ধরনের সম্মেলন আয়োজনের মাধ্যমে পৃথিবীতে গণতন্ত্রকে সুসংহত করা, দুর্নীতি দূরীকরণ এবং মানুষের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবেন। তাঁর এই আয়োজন নিঃসন্দেহে বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সুসংগঠিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে এই সম্মেলনে আমন্ত্রিত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের বাদ পড়াকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আমন্ত্রিত দেশের তালিকা তৈরি করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন ফ্রিডম হাউসের ২০২১ ফ্রিডম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড রিপোর্টের মানদণ্ড অনুসরণ করার কথা বললেও কোন মানদণ্ডে বাংলাদেশকে বাদ দেওয়া হয়েছে সে বিষয়টি স্পষ্ট করেনি। তা ছাড়া অনেক দেশের ক্ষেত্রেই এই রিপোর্টের স্কোরকে আমলে নেওয়া হয়নি। ফলে বাংলাদেশের বাদ পড়াকে অনেকেই আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির ফসল হিসেবে বিবেচনা করছেন।

এটা হয়তো সত্যি যে বাংলাদেশ হয়তো গণতন্ত্রের সূচকে কিছুটা হলেও পিছিয়ে রয়েছে। তবে আমাদের ভাবতে হবে এর জন্য কি শুধু সরকার একা দায়ী, না রাজনৈতিক দলগুলোও দায়ী? এর পরও যদি ধরে নিই যে গণতন্ত্রের সূচক বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশকে বাদ দেওয়া হয়েছে, তবে বাংলাদেশের চেয়েও খারাপ অবস্থানে থাকা পাকিস্তান এবং ইরাক কোন মানদণ্ডে এই সম্মেলনে আমন্ত্রিত হয়েছে—সে বিষয়টি ব্যাপকভাবে বিশ্লেষণের দাবি রাখে। আমরা জানি যে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের একটি শক্তিশালী দ্বিপক্ষীয় বন্ধু রাষ্ট্র, বিশেষ করে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গত কয়েক বছরে অনেক শক্ত ভিত্তির ওপরে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশের সম্পর্ক শক্তিশালী হয়েছে। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক শক্তিশালী হলেও কেন গণতন্ত্র সম্মেলনে আমন্ত্রিত দেশের তালিকায় বাংলাদেশ বাদ পড়ল?

দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত, পাকিস্তান, নেপাল এবং মালদ্বীপ এই সম্মেলনে আমন্ত্রিত হয়েছে। অথচ নেপালে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এখন শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তারা এখনো অচলাবস্থার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে। বাংলাদেশকে যদি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সূচকে পিছিয়ে থাকার কারণে বাদ দেওয়া হয়, তবে নেপালকে কোন যুক্তিতে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হলো সেটিও ভাবার বিষয়। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার যে যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে তার কৌশলগত বন্ধু রাষ্ট্রগুলোকে গণতন্ত্র সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। আমরা জানি যে এই অঞ্চলে রাশিয়া এবং চীনে কর্তৃত্ববাদী দল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বহুদিনের অস্বস্তির কারণ। সেই পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনা করলেও পাকিস্তান এবং চীনের মধ্যে বেশ গভীর সম্পর্ক ছিল, যদিও বেশ কয়েক বছর ধরে সেই সম্পর্কে কিছুটা চিড় ধরেছে এবং এরই ধারাবাহিকতায় হয়তো যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করেছে।

বর্তমানে ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক একটি শক্ত ভিত্তির ওপরে দাঁড়িয়ে আছে। সেই দিক থেকে বিচার করলেও পাকিস্তানের মতো গণতন্ত্র সূচকে পিছিয়ে পড়া রাষ্ট্রকে গণতন্ত্র সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানোর মধ্য দিয়ে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সুযোগ রয়েছে, যেখানে ভারতের বন্ধু রাষ্ট্র বাংলাদেশকে সেই তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এমনকি ইরাকের মতো দেশ যেটি এখনো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বারবার হোঁচট খাচ্ছে এবং ইসরায়েল যেখানে গণতন্ত্রকে গলাটিপে হত্যা করা হয়েছে, সেই দুটি রাষ্ট্র আমন্ত্রিত দেশের তালিকায় রয়েছে। আবার ফ্রিডম হাউসের রিপোর্টে অনেক ভালো স্কোর করা রাষ্ট্রকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। ফলে একটি বিষয় পরিষ্কার যে এই তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে গণতন্ত্রসংক্রান্ত সূচকের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত রাজনীতির বিষয়টি বেশি প্রাধান্য পেয়েছে।

যেসব দেশই সম্মেলনে আমন্ত্রিত হয়েছে সেই তালিকার দিকে লক্ষ করলে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে যাবে যে যুক্তরাষ্ট্র দুটি প্রধান দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভিত্তি করে এই তালিকা প্রণয়ন করেছে। তার প্রথমটি হচ্ছে, যেসব দেশে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক চর্চা রয়েছে সেই দেশগুলোকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ঠিক একইভাবে কিছু দেশে গণতন্ত্র সুসংহত না হলেও তারা যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অংশীদার হওয়ার কারণে তাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তবে বাংলাদেশের জন্য একটি স্বস্তির জায়গা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত কৌশলগত অংশীদার বন্ধু রাষ্ট্র মিসর এবং তুরস্ক এই তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। এমনকি তাদের বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন থেকে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো যুক্তি উপস্থাপন করা হয়নি।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কেন বাংলাদেশ এই তালিকা থেকে বাদ পড়ল? যুক্তরাষ্ট্রের বাইডেন প্রশাসন যে যুক্তি উপস্থাপন করুক না কেন, যদিও এ বিষয়ে তারা কোনো সুনির্দিষ্ট যুক্তি উপস্থাপন করেনি—এ কথা ঠিক, বাংলাদেশবিরোধী একটি শক্তি যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের কাছে বাংলাদেশকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করেছে বিধায় বাংলাদেশকে এই তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ এরই মধ্যে এশিয়ান টাইগার হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে এবং উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছে। যে প্রক্রিয়ায় উন্নয়ন সাধিত হচ্ছে সেটি যদি চলতে থাকে, তাহলে ২০৪১ সালে বাংলাদেশ উন্নত দেশের তালিকায় পৌঁছে যাবে। অনেক বড় পরাশক্তির গাত্রদাহ তৈরি করেছে বাংলাদেশের এই অভূতপূর্ব উন্নয়ন। যারা বাংলাদেশের উন্নয়নকে ব্যাহত করতে চায়, তারা বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক চর্চা নেই এই বিষয়টি প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে বাংলাদেশ সম্পর্কে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি করার চেষ্টা করেছে। এ ক্ষেত্রে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি শক্তিশালী ভূমিকা সবাই প্রত্যাশা করে। যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র আমাদের কৌশলগত বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র, তাই তাদের কাছে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া যেতে পারে এবং তাদের ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। বিষয়টিকে শুধু একটি সম্মেলনে অংশগ্রহণ করা বা না করার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করা সঠিক হবে না। কারণ এর সঙ্গে বিভিন্ন জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি জড়িত। কোন শক্তি বাংলাদেশকে বিশ্ব মানচিত্রে কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায় তাদের খুঁজে বের করা অত্যন্ত জরুরি।

অনেক বিশ্লেষক এই সম্মেলনের আমন্ত্রিত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের বাদ পড়াকে সাম্প্রতিককালের বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের উন্নতিকে দায়ী করছেন। তবে এই যুক্তিকে একেবারেই উড়িয়ে দেওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। আমরা জানি যে এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শত্রু হচ্ছে চীন। যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক উন্নয়ন করেছে চীনের ওপরে চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসেবে। সে ক্ষেত্রে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক সব সময় অত্যন্ত শক্ত ভিত্তির ওপরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। স্বাধীনতাপূর্ব এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী ৫০ বছরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক অত্যন্ত শক্তিশালী হয়েছে। বিশেষ করে গত ১২ বছরে দুই দেশের সম্পর্ক অন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। তবে সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে চীনের অর্থায়ন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অস্বস্তির কারণ হতে পারে। আর এ কারণেই হয়তো আমন্ত্রিতদের তালিকা থেকে বাংলাদেশ বাদ পড়তে পারে। যদিও এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট উপসংহারে পৌঁছানোর সময় এখনো আসেনি। ভবিষ্যৎই বলে দেবে কেন এবং কোন কারণে আসলে এ তালিকা থেকে বাংলাদেশকে বাদ দেওয়া হয়েছিল?

তবে কোনো সুনির্দিষ্ট যুক্তি উপস্থাপন না করে বা কারণ না দেখিয়ে গণতন্ত্র সম্মেলন থেকে বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে বাইডেন প্রশাসন খুব যুক্তিযুক্ত কাজ করেছে বলে আমরা মনে  করি না। বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত বিচক্ষণ এবং তাঁঁর বিচক্ষণতার জন্যই বাংলাদেশ আজকের বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের এই সম্মেলন থেকে বাদ পড়াকে খুব ছোট একটি বিষয় হিসেবে না দেখে ব্যাপকভিত্তিক কারণ অনুসন্ধানের মাধ্যমে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির কমপন্থা পুনর্বিবেচনা করার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি। বাংলাদেশের বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরো শক্তিশালী করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের এই ধরনের একটি অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্তের প্রকৃত জবাব জাতি প্রত্যাশা করে।

 

 লেখক : অধ্যাপক, লোকপ্রশাসন বিভাগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়



সাতদিনের সেরা