kalerkantho

বুধবার । ১২ মাঘ ১৪২৮। ২৬ জানুয়ারি ২০২২। ২২ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

নিরাপদ খাদ্যবেষ্টনী তৈরি করতে হবে

মো. তানজিল হোসেন ও মো. লিজন রানা

৬ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



করোনায় সরকারঘোষিত লকডাউনের পর সাধারণ মানুষ যখন আবার স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চিন্তা করছে, ঠিক তখনই নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে ক্ষেতখামার, কলকারখানায় খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষজন। দ্রব্যমূল্য আওতার বাইরে চলে গেলে শুধু দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষজন নয়, এর প্রভাব পড়ে মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণি পর্যন্ত। সরেজমিনে বাজার পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, চিকন-মোটা চালভেদে চালের দাম বেড়েছে ৩০-৩৪ শতাংশ, পেঁয়াজের দাম বেড়েছে দেশি আমদানিভেদে ৬৬-৬৭ শতাংশ পর্যন্ত, ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়েছে প্রায় ৪৫.৪৫ শতাংশ, সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ৭৬.৮২ শতাংশ, আটার দাম বেড়েছে ৪২.৮৫ শতাংশ, চিনির দাম বেড়েছে ৩৩.৩৪ শতাংশ, ডিমের দাম বেড়েছে ৩৮.৫৬ শতাংশ, গরুর মাংসের দাম বেড়েছে ১৯.২৩ শতাংশ পর্যন্ত ইত্যাদি পণ্য ছাড়াও মাছ, মাংস, সবজি, মসলাসহ প্রায় সব রকম নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দামই আগের দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

শুধু খাদ্যদ্রব্য নয়, অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি, যেমন—জ্বালানি তেল, গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ, পরিবহনসেবা ইত্যাদি পণ্য ও সেবার মূল্যও ঊর্ধ্বমুখী।

শখ-সাধ্য মেটানো এখন স্বপ্নের মতো হয়ে গেছে। ব্যাগ হাতে বাজার করতে এসে মলিন মুখে বাড়ি ফিরছে অনেকেই। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, পাইকারি বাজার থেকে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে, তাই বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে তাঁদের কোনো হাত নেই। দেশে বার্ির্ষক চাহিদা জোগানের তথ্য বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখা যায়, কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশে উৎপাদিত চালের পরিমাণ ছিল তিন কোটি ৫৮ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন। চলতি অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা তিন কোটি ৯৫ লাখ মেট্রিক টন, যা আমাদের নিজস্ব চাহিদার চেয়ে ৩০ থেকে ৫০ লাখ মেট্রিক টন বেশি। তথ্য অনুযায়ী এ বছর উৎপাদিত পেঁয়াজের পরিমাণ ২৫ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন। সংরক্ষণজনিত ক্ষতি ছয় লাখ টন বাদে বাজারজাতকৃত পেঁয়াজের পরিমাণ ১৯ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন। আগস্ট পর্যন্ত আমদানীকৃত পেঁয়াজের পরিমাণ চার লাখ ৩৬ হাজার মেট্রিক টন। দেশে উৎপাদিত এবং আমদানীকৃত পেঁয়াজসহ মোট পেঁয়াজের পরিমাণ ২৪ লাখ মেট্রিক টন প্রায়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের বার্ষিক পেঁয়াজের চাহিদা ২৫ লাখ মেট্রিক টন। ভোজ্য তেলের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ১১ লাখ মেট্রিক টন, যার ৩০ শতাংশ দেশে উৎপাদিত হয় আর বাকি ৭০ শতাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। দেশে গমের চাহিদা প্রায় ৭০ লাখ মেট্রিক টন, যার পাঁচ ভাগের এক ভাগ দেশে উৎপন্ন হয়, বাকিটুকু বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। চিনির মোট চাহিদা ১৪ লাখ মেট্রিক টন, বিসিএফআইসির অধীনে ১৫টি চিনিকলের বার্ষিক উৎপাদন ৬০ হাজার টনের কাছাকাছি, বেসরকারি চিনিকলগুলোর উৎপাদনক্ষমতা চাহিদার চেয়ে দ্বিগুণ বেশি।

চাহিদা আর জোগানের এই চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কিছু পণ্য আমাদের বার্ষিক চাহিদার চেয়ে বেশি উৎপাদিত হয় আবার কিছু পণ্যের বেশির ভাগই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। চালের মতো যেসব পণ্য উৎপাদনে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ, দেখা যায় ভরা মৌসুমেও সেসব পণ্যের দাম বেড়ে যায়। পেঁয়াজ উৎপাদনে আমাদের দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ না হলেও আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত পেঁয়াজ উৎপাদনে বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে থাকায় প্রয়োজনে চাহিদা অনুযায়ী অতি সহজে পেঁয়াজ আমদানি করা যায়। ভোজ্য তেলের মতো যেসব পণ্য বেশির ভাগই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় সেসব পণ্যের দাম বিশ্ববাজারে বেড়ে গেলে দেশীয় বাজারে বেড়ে যায়।

প্রায় সময় খবরে আসে অসাধু ব্যবসায়ীরা হাজার হাজার টন চাল অবৈধভাবে মজুদ করে রাখছে, সীমান্ত বন্দরে শত শত ট্রাক পেঁয়াজ আটকা পড়ে আছে, যার কারণে দেশীয় বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়। বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম কমলেও দেশীয় বাজারে দাম কমছে না। এমন অবস্থা প্রায় প্রতিটি পণ্যের ক্ষেত্রে। পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার এই নাজুক পরিস্থিতি বিশ্বের আর কোথাও দেখা যায় না। এদিকে পণ্যমূল্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় মুদ্রাস্ফীতিও বাড়ছে। বিবিএসএর তথ্য অনুযায়ী ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মুদ্রাস্ফীতি ৫.৩২ শতাংশ নিয়ে শেষ হয়েছিল, ২০১৯-২০ অর্থবছরে মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে দাঁড়ায় ৫.৬২ শতাংশ, ২০২০-২১ অর্থবছরে এর পরিমাণ আরো বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণ হিসেবে মধ্যস্বত্বলোভী, অসাধু ব্যবসায়ী, অসাধু কর্মকর্তা, কর্মচারী, বাজার মনিটরিংয়ের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানের অস্বকীয়তা, সরকারের কঠোর পদক্ষেপের অভাব—সর্বোপরি সাধারণ মানুষের অসচেতনতাকে দায়ী করা যায়।

ক্রমবর্ধমান দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, সাধারণ মানুষের দুর্দশা আর মুদ্রাস্ফীতির এ ধারা অব্যাহত থাকলে দেশের অর্থনীতি শিগগিরই ভেঙে পড়বে। তাই এখনই সময় সরকারকে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়ার। এ ক্ষেত্রে সরকারের প্রথম কাজ হচ্ছে বাজার নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান টিসিবি, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে কঠোর জবাবদিহির আওতায় এনে সক্রিয় করে তোলা। নব্বইয়ের দশকের আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে সরেজমিনে গিয়ে বাজার মনিটরিংয়ের জন্য বিশেষ সেল কার্যকর ছিল। প্রয়োজনে আবার সেল গঠন করে মুনাফালোভী অসাধু ব্যবসায়ী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্মূল করতে হবে। অসাধু ব্যবসায়ীরা যাতে পণ্য গুদামজাত করতে না পারে সেটা কঠোরভাবে দমন করতে হবে। আমদানি পণ্যের ওপর শুল্ক যথাসম্ভব কমিয়ে আনতে হবে। বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম বেড়ে গেলে আমদানীকৃত পণ্যের দাম দেশীয় বাজারে না বাড়িয়ে টিসিবি, ওএমএস সিস্টেমের মাধ্যমে ভর্তুকি দিয়ে সাধারণ মানুষের জন্য পণ্য সরবরাহ করে দেশীয় বাজার স্থিতিশীল রাখতে হবে। ন্যায্য মূল্যে ফসল বিক্রয়, উন্নতবীজ, সার, কীটনাশক, আধুনিক যন্ত্রপাতি, প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির সব রকম ব্যবস্থা করতে হবে। পচনশীল পণ্য সরবরাহ করার জন্য প্রয়োজনীয় গুদাম, হিমাগারের ব্যবস্থা করতে হবে। কৃষকদের কাছ থেকে পণ্য সরাসরি বাজারে নিয়ে আসার মতো বাজারব্যবস্থা চালু করতে হবে। পণ্যের বাজারদর যাতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ভেতর থাকে সে রকম নিশ্চয়তা তৈরির লক্ষ্যে নিরাপদ খাদ্যবেষ্টনী তৈরি করতে হবে।

 লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ও এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ অর্গানাইজেশন; শিক্ষার্থী, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

 



সাতদিনের সেরা