kalerkantho

সোমবার । ৩ মাঘ ১৪২৮। ১৭ জানুয়ারি ২০২২। ১৩ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

চীনের বাজারে বাংলাদেশের সম্ভাবনা

তন্ময় চৌধুরী

৪ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



২৪ নভেম্বর ২০২১ বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে। নির্ধারিত মানদণ্ডে উন্নীত হলে ২০২৬ সালে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে চলে যাবে। উন্নয়নশীল দেশের তকমা বিশ্বদরবারে দেশের ভাবমূর্তিকে বহুগুণ উন্নত করবে।

ব্রিটেনের অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চের সর্বশেষ ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক লীগ টেবিল-২০২১’ শীর্ষক প্রতিবেদনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যে ধারা চলমান রয়েছে তা অব্যাহত থাকলে ২০৩৫ সাল নাগাদ দেশটি বিশ্বের ১৯৩টি দেশের মধ্যে ২৫তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশে পরিণত হবে।

সে লক্ষ্যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখতে দেশের রপ্তানি আয়ের স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধি একান্ত প্রয়োজন। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে রপ্তানি পণ্যে অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা (জিএসপি) ও শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাচ্ছে বাংলাদেশ। ২০২৬ সাল-পরবর্তী সময়ে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এই শুল্ক সুবিধা হারাবে। ফলে অধিক শুল্ক ও ব্যাপক প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হবে দেশের রপ্তানি খাত। এলডিসি উত্তরণ পরবর্তীকালের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারবিহীন বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের স্থিতিশীলতা ও গতিশীলতা বজায় রাখা। প্রতিযোগিতার সক্ষমতা অর্জন করতে না পারলে কমে যাবে রপ্তানি আয়, যার বিরূপ প্রভাব পড়বে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে। ফলে ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সময়কালকে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার ‘প্রস্তুতিকালীন’ হিসেবে বিবেচনা করে সঠিক কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা এখন সময়ের দাবি।

দেশের রপ্তানি খাত মূলত গুটিকয়েক পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। গত অর্থবছরে মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৩ শতাংশ আসে পোশাক খাত থেকে। শুল্ক সুবিধা প্রত্যাহার করা হলে বিশ্ববাজারে ব্যাপক প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হবে এ খাত। পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে উন্নত কর্মপরিবেশ, শ্রমিকদের উন্নত জীবনমান নিশ্চিতকরণের নানা দাবি পূরণে পণ্যের উত্পাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা এই খাতের তুলনামূলক সুবিধা তথা কম্পারেটিভ অ্যাডভান্টেজ এ চাপ সৃষ্টি করবে।

বাংলাদেশের পোশাক খাতের একক বৃহত্তম বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। পোশাক খাতের মোট রপ্তানির প্রায় ৬০ শতাংশের গন্তব্য ইইউয়ের বাজার। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে ইইউয়ের বাজারে প্রায় ৯৭ শতাংশ পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাচ্ছে বাংলাদেশ। কিন্তু এলডিসি উত্তরণের তিন বছর পর অর্থাৎ ২০২৯ সালের পর ইউরোপের বাজারে অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা (জিএসপি) পুরোপুরিভাবে হারাবে বাংলাদেশ। এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান জিএসপি সুবিধা তিন বছরের পরিবর্তে আরো ১২ বছর পর্যন্ত বর্ধিতকরণের অনুরোধ এরই মধ্যে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে করা হয়েছে। প্রস্তাবনাটি এখনো অনুমোদনের জন্য বিবেচনাধীন।

পাশাপাশি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের নতুন শুল্ক প্রস্তাবনা ‘অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা (জিএসপি-প্লাস)’ প্রাপ্তির বিষয়টি নিয়েও বাংলাদেশ উদ্বিগ্ন। জিএসপি-প্লাস শুল্ক প্রস্তাবনা ২০২৪ থেকে ২০৩৪ সালের জন্য প্রযোজ্য হবে। প্রস্তাবনার গুরুত্বপূর্ণ একটি শর্ত হলো—কোনো দেশের একক পণ্য ইইউ বাজারে ৭.৪ শতাংশের বেশি পরিমাণে রপ্তানি হলে জিএসপি-প্লাস সুবিধার যোগ্য হবে না সংশ্লিষ্ট দেশ। এ ক্ষেত্রে ইইউ বাজারে বাংলাদেশের পোশাক পণ্যের রপ্তানি হিসসা প্রায় ২০ শতাংশ। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে এই শর্ত শিথিলের আবেদন জানানো হয়েছে। ইইউয়ের পক্ষ থেকে ইতিবাচক বিবেচনার আশ্বাস দেওয়া হলেও কেবল ইইউ পার্লামেন্টে এই প্রস্তাবটি পাস হলেই নতুন এই সুবিধা পাবে বাংলাদেশ। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের যেকোনো বিপরীতমুখী সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ে ধস নামাতে পারে। বিদ্যমান করোনা মহামারি, নতুন শুল্ক প্রস্তাবনা কিংবা মানবাধিকার ইস্যু যেকোনো সময়ে ইইউয়ের আমদানি সিদ্ধান্তে প্রভাব রাখতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মূল্যায়ন অনুযায়ী, সম্প্রতি ইউরোপে কভিড সংক্রমণের হারের প্রবৃদ্ধির ওপর ভিত্তি করে আগামী বছরের বসন্ত নাগাদ এই অঞ্চলে মৃত্যু ২২ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে, যার বিরূপ প্রভাব ইইউয়ের মোট আমদানি চাহিদার ওপর পড়তে পারে। ফলে কোনো একক বাজারের ওপর নির্ভরশীলতা যেকোনো সময় বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এ অবস্থায় রপ্তানি আয়ের পরিধি বিস্তৃত করতে একক বাজারের ওপর নির্ভরশীলতার ঝুঁকি হ্রাসকরণে পোশাকশিল্পসহ অন্যান্য রপ্তানি পণ্যের বিকল্প বাজার অনুসন্ধান অত্যাবশ্যক।

এ ক্ষেত্রে সম্ভাবনাময় বিকল্প চীন ও ভারতের পোশাক বাজার। ২০২৫ সাল নাগাদ চীন ও ভারতের পোশাক পণ্যের চাহিদা প্রায় ৭৫০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে, যা বাংলাদেশের জন্য ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে শুধু চীনেই রয়েছে প্রায় ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের স্থানীয় বাজার। বিশ্বে আমদানিতে শীর্ষ দেশ চীন। বিগত ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে প্রায় ২.৪৮ ট্রিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে চীন। পাশাপাশি দেশটি আমাদের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার, কিন্তু চীন বাংলাদেশ ১২.০৯ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে, চীন থেকে বাংলাদেশের আমদানি ছিল ১১.৪৯ বিলিয়ন ডলার, বিপরীতে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল মাত্র ৬০ মিলিয়ন ডলার; অর্থাৎ চীনের বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারি মাত্র ০.০৫ শতাংশ, যা বাজার সুবিধার তুলনায় খুবই নগণ্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের বাজারের কেবল ১ শতাংশ বাংলাদেশ অর্জন করতে পারলে প্রায় ২০ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হবে। উন্নয়নশীল অর্থনীতির প্রাথমিক পর্যায়ে এই অর্জন খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষভাবে উল্লেখ্য, ২০২০ সাল থেকে চীনের বাজারে ৯৭ শতাংশ পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাচ্ছে বাংলাদেশ। চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, জীবন্ত মাছ, কাঁকড়া-কুঁচে, মসলা, সবজি, তামাক, রাসায়নিক পণ্যসহ প্রায় ৪০০ ধরনের পণ্য। চীনে পোশাক রপ্তানি বাজারের মাত্র ৭ শতাংশ এখন বাংলাদেশের দখলে, যেখানে ভিয়েতনামের রয়েছে প্রায় ১৯ শতাংশের বেশি। যেহেতু বাংলাদেশের তুলনামূলক সুবিধা ‘তৈরি পোশাক’ খাতে রয়েছে। ফলে চীনের বাজার বিশ্লেষণ করে এই বাজারে পোশাক রপ্তানির হিসসা বাড়ানোর প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি দেশে চামড়া, পাট ও পাটজাত পণ্য ও অন্যান্য শুল্কমুক্ত পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধিতেও বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।

স্বল্পোন্নত দেশের তকমা মুছে গেলে চীনের বাজারেও শুল্কমুক্ত সুবিধা হারাবে বাংলাদেশ। ফলে অন্তর্বর্তীকালীন চীনের বাজারে দেশি পণ্যের বাজার পরিচিতি ও তুলনামূলক শক্ত অবস্থান তৈরি প্রয়োজন। পাশাপাশি শুল্কমুক্ত সুবিধার মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশ এরই মধ্যে চীন সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ-চীন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ আয়োজিত এক ওয়েবিনারে চীন সরকার বাংলাদেশি পণ্যে আরো পাঁচ বছর শুল্কমুক্ত সুবিধা দিতে পারে বলে আভাস দিয়েছেন চীনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত।

চীন আমাদের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার হলেও দেশটির সঙ্গে আমাদের কোনো মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নেই। চীনের সঙ্গে এফটিএ স্থানীয় শিল্পকে বিপর্যয়ের মুখে ফেলবে; পাশাপাশি চীন থেকে রপ্তানি শুল্ক হারাবে দেশ—এমন যুক্তি দিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই বিষয়টি নিরুৎসাহ করা হয়, কিন্তু বিশ্ববাজারে অনেক স্বল্পোন্নত দেশই চীনের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যার মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তান ও মালদ্বীপ উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ (আরসিইপি) নামক অর্থনৈতিক জোট বাস্তবায়ন হলে চীনের বাজারে মুক্ত বাণিজ্যের সুবিধা পাবে পোশাক খাতে বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনাম। এতে সম্ভাবনাময় চীনের পোশাক রপ্তানি বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরির সুযোগ হারাতে পারে বাংলাদেশ। ফলে চীনের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির লাভ-ক্ষতি পর্যালোচনার এখনই সময়।

উল্লেখ্য, গত বছর বাংলাদেশ থেকে চীনের পণ্য আমদানি প্রায় ২৮ শতাংশ বেড়েছে। পণ্য বৈচিত্র্য আনয়ন, নতুন পণ্যের বাজার সৃষ্টি, বিদ্যমান পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ প্রবৃদ্ধির এই ধারাকে আরো বেগবান করবে। চীনের বাজারে বাংলাদেশের শক্তিশালী অবস্থান উন্নয়নশীল অর্থনীতির পথকে করবে সুদৃঢ়।

 

 লেখক : গবেষক

 [email protected]



সাতদিনের সেরা