kalerkantho

সোমবার । ৩ মাঘ ১৪২৮। ১৭ জানুয়ারি ২০২২। ১৩ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

মঙ্গলালোকে

শীতল প্রজন্মের প্রতিবাদ

মিরাজুল ইসলাম

৩০ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শীতল প্রজন্মের প্রতিবাদ

অতীত অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি শীতকাল এলে বাংলাদেশে দুটি বিষয় সরব হয়ে ওঠে। তা হলো, রাজনীতি এবং ওয়াজ মাহফিল। বিশেষ করে সারা বছর রাজনৈতিক ইস্যু জিইয়ে থাকলেও শীতকালে ভিন্ন মাত্রা পায়। পাশাপাশি শীতের রাতে কারি-মাওলানারা ব্যস্ত থাকেন দেশের নানা প্রান্তে।

বর্তমান সময়ে রাজনীতি ও ধর্মের উদ্দেশ্য তথা আঙ্গিক বদলে গেছে। পাশাপাশি শীতকালীন লোকাচারে নাগরিক জীবনে যুক্ত হতে দেখেছি শীতের পিঠার উৎসবের পাশাপাশি বাজারে শাক-সবজির মূল্য নিয়ে বাহাস কিংবা বাসে মাইক নিয়ে পাড়া-মহল্লার পিকনিক পার্টি।

আবার আশির দশক থেকে প্রতিবছর শীত মৌসুমে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ঘটা করে ব্যান্ডসংগীতের আয়োজন করা হতো। এক দশক ধরে সেই রেওয়াজটি মৃতপ্রায়।

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে আমাদের দেশে শীতের যেমন প্রকোপ কমে গেছে, তেমনি শীতের আগমনী সময়ের তারতম্য ঘটেছে।

পুরনো ছবি ঘাঁটলে দেখা যাবে অক্টোবর মাসে লোকজনের গলায় মাফলার ঝোলানো শীতের পোশাক। কিন্তু এখন নভেম্বরের শেষ সপ্তাহেও পথে-ঘাটে শীতের ভারী পোশাক চোখে পড়ে না।

শীত ঋতুর বৈচিত্র্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলো পরিবর্তনের সঙ্গে বাংলাদেশে ইস্যুভিত্তিক রাজনীতির ধারায়ও পরিবর্তন এসেছে। অধিক মাত্রায় কার্বন নিঃসরণের জন্য জলবায়ুর উষ্ণতা যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, ঠিক তেমনি রাজনৈতিক দলগুলোর স্বভাব-চরিত্র বদলে গেছে।

এ ঘটনাগুলো ঘটেছে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ধাপে ধাপে। বিশেষ করে কলেজপড়ুয়া নতুন প্রজন্মের কাছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বনাম বিরোধী দল বিএনপির রাজনৈতিক লড়াইটা শুধুই ক্ষমতাকেন্দ্রিক। অন্যান্য রাজনৈতিক দলের অবস্থানেও এসেছে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি।

১০ বছর আগে যে ছেলেটি প্রাইমারি স্কুলে পড়াশোনা করত, আজ সে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থী কিংবা জীবনযুদ্ধে নবাগত সৈনিক। দলভিত্তিক রাজনীতির সংজ্ঞায়ন তার কাছে ভিন্ন। কারণ গত এক দশকে সে রাজনীতির মাঠে যা প্রত্যক্ষ করেছে, তা সত্তর, আশি কিংবা নব্বইয়ের দশকের রাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে ভিন্নতর।

স্বাধীনতা-পরবর্তী ছাত্ররাজনীতি বিশিষ্ট হয়ে আছে নব্বইয়ের এরশাদবিরোধী গণ-আন্দোলনের সূত্রে।

যাদের বয়স এখন বিশ থেকে ত্রিশের কোটায় ডিজিটাল স্মার্টফোনে আসক্ত ও ক্রিকেটভক্ত সেই প্রজন্মের চোখে দুই বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের টানাপড়েন এবং বিভক্তির লড়াইটা আপেক্ষিক। শুধু কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে রাজনৈতিক দলগুলোর লেজুড় সংগঠনের কেতাবি আদর্শের মূল লক্ষ্য কী, তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু এটা সত্য, মধ্যবিত্ত শহুরে জীবনে ছাত্ররাজনীতি এখন স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র কিংবা সমাজে শ্রেণিবৈষম্য দূরীকরণের আদর্শিক প্রেক্ষাপট থেকে উদ্ভূত কোনো চর্চা নয়।

শুধু ছাত্ররাজনীতি সূত্রে নতুন প্রজন্মের মানসিকতা পরিবর্তিত হয়েছে, তা নয়।

যেমন শীতের রাতে গ্রামে-গঞ্জে আর কীর্তন বা পালাগান শোনা যায় না, ঠিক তেমনি শহরের অলিগলিতে রাস্তা বন্ধ করে কিশোর-তরুণরা ব্যান্ডের কনসার্ট শোর আয়োজনও করে না। এমনকি তারা ব্যাডমিন্টন খেলাও ভুলে গেছে। ভিডিও গেম, মোবাইল চ্যাটিং, সোশ্যাল মিডিয়ার জগতে বুঁদ হয়ে আটকে আছে পুরো প্রজন্ম।

সম্প্রতি ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাসভাড়া বৃদ্ধি করলে ঢাকা শহরের স্কুল ও কলেজের ছাত্ররা বিচ্ছিন্ন আন্দোলন শুরু করে। বাসভাড়া অর্ধেকের দাবি জানিয়ে কতিপয় ছাত্র শীতের শুরুতে কিছুটা উত্তাপ ছড়াতে চেষ্টা করেছে, যদিও এই আন্দোলনের মাত্রা নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের মতো তীব্র হয়নি। কিন্তু এই আন্দোলনে ঢাকার কিছু অংশে জনগণের ভোগান্তি হয়েছে। বাস মালিকরা কমবেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন।

উল্লেখ করার মতো বিষয় হচ্ছে, বাসভাড়া কমানোর সাম্প্রতিক আন্দোলনে জড়িত প্রত্যেক ছাত্রকে মোটাদাগে প্রচলিত আইন ভঙ্গ করতে দেখা গেছে। তারা ব্যস্ত সড়কে চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে, এখতিয়ারবহির্ভূতভাবে গাড়ির কাগজপত্র পরীক্ষা করেছে। সরকার কিংবা প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে এমন কোনো আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। কিংবা করলেও হস্তক্ষেপের মাত্রা ছিল শিথিল। এমনকি সরকারের দায়িত্বশীল কয়েকজন মন্ত্রীকে মিডিয়ায় ছাত্রদের আন্দোলনের সপক্ষে মন্তব্য করতে দেখা গেছে।

ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি সরকারি নীতিনির্ধারণী বিষয়। এর সঙ্গে জড়িত সাধারণ জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয়ভারের বিষয়টি। কিন্তু সাধারণ জনগণ মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে রাস্তায় নামেনি। এমনকি বিরোধী দলগুলো কাগুজে প্রতিবাদ ছাড়া সরকারকে চাপ প্রয়োগে ছিল বরাবরের মতো ব্যর্থ। বিশেষ করে বিএনপি যখন ব্যস্ত তাদের দলীয় প্রধানের ইস্যুতে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে। 

একই সঙ্গে ছাত্রদের বাসভাড়া নির্ধারণের বিষয়ে ত্বরিত সিদ্ধান্ত না দেওয়াটা ছিল সরকারি নীতিনির্ধারকদের ব্যর্থতা। অরাজনৈতিক ইস্যুতে এভাবে ছাত্রদের রাস্তায় নামতে আমরা এর আগেও দেখেছি। বলা ভালো, তাদের নামতে একপ্রকার বাধ্য করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে এসব অরাজনৈতিক ইস্যুতে ছাত্রদের আচরণ ‘অছাত্রসুলভ’ হলেও রাষ্ট্রের সংযম ছিল প্রশংসনীয়।

কিন্তু সেই ছাত্ররাই যখন আবার কোনো রাজনৈতিক ইস্যুতে পথে নামে, তখন তারা রাষ্ট্র এবং প্রতিপক্ষের মামলা-হামলার শিকার হয়। তা যে আদর্শিক চেতনা থেকেই উজ্জীবিত কিংবা অনুপ্রাণিত হোক না কেন।

এই দুই পরিস্থিতির পার্থক্যটা ডিজিটাল যুগের ছাত্ররা এখন বুঝে গেছে।

তাদের চিন্তায় তাই রাজনৈতিক সচেতনতার চেয়ে প্রাধান্য পায় নিজস্ব গণ্ডিতে নিরাপদ থাকার প্রবৃত্তি। মতপার্থক্যের রাজনীতি শুধু উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে দলছুট কিংবা দলভুক্ত রাজনৈতিক মনস্ক প্রজন্মের মাঝে সোচ্চার। তারাও ক্রমে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে এজেন্ডা বাস্তবায়নের সংঘাতের বিপক্ষে দিন শেষে নিরাপত্তাবলয়ে নিরাপদ ছায়ায় অবস্থান করতে। মূলধারার ছাত্ররাজনীতি এখন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া অসম্পূর্ণ। 

তবে এই ধারা রাতারাতি গড়ে ওঠেনি।

দেশের স্বার্থের পক্ষে নিজস্ব আদর্শিক অবস্থান ছাপিয়ে অর্থনীতির মানদণ্ডে ছাত্ররাজনীতির চর্চা কোনো এক শীতের সকালে যারা শুরু করেছিল, তাদের এখন বসন্তকাল।

হিমশীতল রুক্ষতা তাদের উত্তরসূরি প্রজন্মকে তাই তেমন স্পর্শ করতে পারে না। রাজনীতির আড়ালে তাদের আপাত রাজনীতিবিমুখতা একাধারে মোবাইল ফোনের আলোয় আলোকিত এবং সীমাবদ্ধ জ্ঞানের কূপমণ্ডূকতার অন্ধকারে ঘেরা। যুগ বদলের সঙ্গে এমন এক মিশ্র প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে অলক্ষ্যে। এই প্রজন্ম আশীর্বাদ, নাকি অভিশাপ তা সময় বলে দেবে।

আপাতত বাসভাড়া কমানোর ছাত্র আন্দোলন আমাদের চারপাশে কিছুটা উষ্ণতা ছড়িয়েছে।

আমাদের রাজনৈতিক মনন এতেই অনেক সুখী!

 

 লেখক : তথ্যচিত্র নির্মাতা, লেখক ও চিকিৎসক



সাতদিনের সেরা