kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ মাঘ ১৪২৮। ১৮ জানুয়ারি ২০২২। ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

দিল্লির চিঠি

সম্পর্কে যেন চিড় না ধরে

জয়ন্ত ঘোষাল

২৯ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সম্পর্কে যেন চিড় না ধরে

বাংলাদেশে সশস্ত্র বাহিনীর জন্মের পর অর্ধশতাব্দীকাল অতিবাহিত হলো। বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর জন্মদিনটিকে সশস্ত্র বাহিনী দিবস বলা হয় এবং সেই দিবসে এবার ভারতের রাজধানী দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনের দপ্তরে খোদ প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং হাজির হলেন। এটা একটা ঐতিহাসিক ঘটনা। ৪০ বছর সাংবাদিকতা করলাম, কখনো ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে বাংলাদেশ হাইকমিশনে যেতে দেখিনি, তা-ও আবার বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী দিবসে। শুধু রাজনাথ নন, সেখানে উপস্থিত ছিলেন ভারতের চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ বেদ প্রকাশ মালিক।

বাংলাদেশের সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনী—এই তিন বাহিনীর প্রধান ভারত সফরে এসেছেন। আবার বাংলাদেশ সফরে গেছেন ভারতের স্থল ও বায়ুসেনা প্রধান। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে বোঝাপড়া আছে অনেক দিনই। পারস্পরিক প্রশিক্ষণ শিবির হয় এবং অনেক প্রতিরক্ষা বিষয়ে তথ্য বিনিময় হচ্ছে। কিন্তু এবারের সশস্ত্র বাহিনী দিবসে বাংলাদেশ হাইকমিশনে রাজনাথ সিংয়ের যাওয়া কেন বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ? আসুন, আমরা সেই রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা করি।

সেদিন বাংলাদেশ হাইকমিশনের নৈশ ভোজে গিয়েছিলাম। রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে কথাবার্তা হচ্ছিল আমাদের, সাংবাদিকদের। তিনি বাংলাদেশের হাইকমিশনার মহম্মদ ইমরান ও বাংলাদেশের ডিফেন্স অ্যাটাশের পাশে দাঁড়িয়ে বারবার বলছিলেন যে এখানে এসে  মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি এবং স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনের ঐতিহ্য—এসব কথাই তাঁর মনে পড়ছে।

এমনকি দিল্লির দরবারে আলোচনা চলছে যে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের ঢাকায় যাওয়ার পরিকল্পনা আছে। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে চুক্তি আছে, বোঝাপড়াও আছে। ভারতের সঙ্গেও বাংলাদেশের প্রতিরক্ষার বোঝাপড়া যথেষ্ট। এখন ভারত এই প্রতিরক্ষা বোঝাপড়াকে আরো দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে।

কিন্তু কেন?

আসলে এই মুহূর্তে আফগানিস্তানে তালেবান সরকার গঠনের পর ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার অজিত ডোভাল খুব সক্রিয়। রাশিয়া থেকে পুতিন ভারতে আসছেন। পুতিনের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর প্রথমে ফোনে কথা হয়েছিল, তারপর সাক্ষাতে কথা। শুধু পুতিনের ভারত সফর নয়, অজিত ডোভাল নিজে মস্কো গেছেন। অজিত ডোভাল শুধু রাশিয়া নয়, তিনি কিন্তু অন্যান্য দেশের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর গোটা পৃথিবীর ছোট ছোট দেশে যাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁকে বলেছেন, শুধু বড় দেশ নয়, ছোট দেশগুলোর সঙ্গেও সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। আবার অজিত ডোভালকে ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা ও অন্যান্য বিষয়ে সম্পর্ককে সুদৃঢ় করার জন্য বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কেননা এই মুহূর্তে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ভারতের নিরাপত্তা বিষয়টা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভারত সীমান্তে চীনের সাম্প্রতিক আক্রমণ, অনুপ্রবেশ এবং আক্রমণের চেষ্টা ছাড়াও পাকিস্তান, আফগানিস্তানের বন্ধুত্ব, তালেবান সরকারকে পাকিস্তানের পূর্ণ মদদ দেওয়া—এসবের পরিপ্রেক্ষিতে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রের সুসম্পর্ক রক্ষা করে যাওয়া তথা আরো মজবুত করা।

সে কারণে জয়শঙ্করকে বলা হচ্ছে ‘ডিভিডেন্ড মিনিস্টার’। অর্থাৎ এখন যে সফরগুলো তিনি করছেন সেগুলো তাঁকে ডিভিডেন্ড দেবে। সে কারণে তাঁকে অনেক বেশি বড় ভূমিকা নিতে হচ্ছে। আর অজিত ডোভালকে বলা হচ্ছে ‘নেইবারিং ইমপর্ট্যান্স’, অর্থাৎ প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে অনেক বেশি সম্পর্ক সুদৃঢ় করতে। সেই দায়িত্ব পালন করছেন অজিত ডোভাল।

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর সাম্প্রতিক যে হামলার ঘটনা ঘটেছিল এবং তাতে ভারতের ভেতরে বিজেপি ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মতো উগ্র হিন্দু সংগঠন যেভাবে বাংলাদেশ সরকারেরও বিরোধিতা শুরু করে, এমনকি হাইকমিশনের সামনে এসে হাসিনা মুর্দাবাদ ধ্বনি দেয়, তাতে প্রধানমন্ত্রী যারপরনাই রুষ্ট হন এবং এ ধরনের আচরণে নিয়ন্ত্রণ রক্ষার জন্য বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্বকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরামর্শও দেওয়া হয়েছে, যাতে এমন কোনো রাজনৈতিক আচরণ তাঁরা না করেন, যেখানে শেখ হাসিনা সরকারের শুধু সমস্যা হয় তা-ই নয়, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে যেন চিড় না ধরে।

এই কারণে এ ধরনের ভুল-বোঝাবুঝি নিরসন করার জন্য শেখ হাসিনার সরকারকে কিঞ্চিৎ তোয়াজ করতেই কিন্তু এখন ভারতের আগ্রহ বেশি। আমি মনে করি যে ভারত সঠিক কাজই করছে এবং ভারতের এখন অনেক বেশি প্রয়োজন বাংলাদেশের সঙ্গে আরো সুসম্পর্ক স্থাপন করা।

এই ৫০ বছরের মুক্তিযুদ্ধের যে ইতিহাস, সেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরের জন্মশতবর্ষেরও উদযাপন চলছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজে বাংলাদেশে গিয়ে সেই উদযাপনের কাজ শুরু করেছিলেন। ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ যাচ্ছেন ঢাকায়, এই উৎসবের সমাপ্তি করবেন।

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে আরো দৃঢ় হচ্ছে।

আমি মনে করি, কোনো চক্রান্তের কাছেই এই সম্পর্কের ব্যাপারে আমরা আপস করতে পারি না।

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠের বিশেষ প্রতিনিধি



সাতদিনের সেরা