kalerkantho

বুধবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ১ ডিসেম্বর ২০২১। ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩

ফিলিস্তিন আন্দোলনের ভবিষ্যৎ কী

ওয়েইন জোন্স

২৬ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ফিলিস্তিনিরা শুধু নিজস্ব রাষ্ট্র থেকেই বঞ্চিত নয়, তারা মূলত নিজেদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আলোচনা থেকেও নির্বাসিত। এ সপ্তাহে ব্রিটিশ লেবার পার্টির প্রধান কেইর স্টারমারের ভাষণে এটা পরিষ্কার হয়ে গেছে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে লেবার সদস্যদের গ্রুপ ‘লেবার ফ্রেন্ডস অব ইসরায়েল’-এর বার্ষিক মধ্যাহ্নভোজে তিনি এ ভাষণ দেন। ইহুদিবিদ্বেষের (অ্যান্টিসেমিটিজম) অশুভ শক্তির নিন্দা করতে গিয়ে তিনি তাঁর বক্তব্য ঠিকই কাজে লাগিয়েছেন। এই বিদ্বেষ পশ্চিমা সমাজ ও সংস্কৃতিতে মিশে গেছে, যা বামপন্থী লোকদের মধ্যেও দেখা যায়। বিদ্বেষ পোষণকারীরা কোনো গ্রুপের প্রতিনিধিত্ব না করলেও তা ব্রিটেনে ইহুদিদের যন্ত্রণা দিচ্ছে। মোট কথা, অনেক ইহুদি ইসরায়েলকে কেন একটি লাইফবোট মনে করে, তার পেছনে এটাও একটা কারণ। সহস্রাব্দ ধরেই ছদ্মবেশী সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা তাদের নতুন নিপীড়নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে আবেগময় সমালোচনার পাশাপাশি অ্যান্টিসেমিটিজমের ঠিকঠাক নিন্দা করাটা বেমানান কিছু নয়। স্টারমার তাঁর ভাষণে দুটি বিষয়েই আলোকপাত করেছেন বটে। তিনি ‘দ্বন্দ্বের দ্বৈতবাদী দৃষ্টিভঙ্গি’ খারিজ করে দিয়ে বলেছেন যে তিনি ‘ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের বন্ধু’। এটা লেবার পার্টির দ্বিরাষ্ট্র সমাধানকে সমর্থন করার দীর্ঘ ইতিহাস (যদিও তা প্রায়ই কাজে নয়, কথায় দেখা যায়) এবং লেবার পার্টির ওপর ব্রিটিশ ইহুদিদের অনেকের আস্থা হারানো—দুই ক্ষেত্রেই বিশেষ অর্থ বহন করে। স্টারমার কিছুটা সেতুবন্ধ তৈরির চেষ্টা করছেন, কিন্তু তাঁর কৌশল ভুল পথে পরিচালিত। তাঁর অবস্থান খুবই যুক্তিসংগত মনে হতে পারে; কিন্তু একটি দরিদ্র, অবরুদ্ধ ও সামরিকভাবে অধিকৃত অঞ্চল এবং আরেকটি পরাশক্তি সমর্থিত হাই-টেক সামরিক বাহিনীসমৃদ্ধ শক্তিশালী রাষ্ট্রের ক্ষমতার মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে।

দুই পক্ষের মধ্যে সমতা খোঁজার চেষ্টার মাধ্যমে স্টারমার নিত্যনৈমিত্তিক মানবাধিকার সমস্যাগুলোকে গুরুত্বহীন করেছেন। তিনি সন্ত্রাসী হামলায় ইসরায়েলি নাগরিকদের হত্যার কথা উল্লেখ করেছেন; কিন্তু ২০০৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ইসরায়েলিদের তুলনায় ২২ গুণ বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হলেও তিনি শুধু “ফিলিস্তিনিদের ‘দৈনন্দিন অপমান, সীমাবদ্ধ চলাফেরা ও বিধি-নিষেধ’ নামমাত্র উল্লেখ করেছেন। ৫৪ বছরের পুরনো এই দখলদারির কথা সামান্যই উল্লেখ করা হয়েছে। স্টারমার তাঁর সাবেক লেবার নেতা হ্যারল্ড উইলসনের উদ্ধৃতি দিয়ে ‘মরুভূমির ফুল’ বানানো সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের” প্রশংসা করেছেন, কিন্তু সেই মরুভূমিটি যে ওই সব ফিলিস্তিনির বাসস্থান ছিল, যাদের সাত লাখ মানুষ ১৯৪৮ সালে নাকবায় জাতিগত নিধনের শিকার হয়েছিল, সেটি উল্লেখ করেননি।

ব্রিটিশ বিরোধীদলীয় নেতা স্টারমার ফিলিস্তিনিদের ইসরায়েলবিরোধী ‘বয়কট, বিনিয়োগ হ্রাস ও নিষেধাজ্ঞা (বিডিএস)’ আন্দোলনের বিষয়ে নিজের বিরোধিতার কথাও উল্লেখ করেছেন। তাঁর পূর্বসূরি জেরেমি করবিনও বিডিএস আন্দোলনকে সমর্থন করেননি। অথচ এ বিষয়ে তাঁর নিন্দা জানানোকে চ্যালেঞ্জ করা উচিত ছিল। কারণ বিডিএসকে অ্যান্টিসেমিটিক আন্দোলন হিসেবে দেখানোর বিষয়টি বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু থেকে ট্রাম্প প্রশাসনের কথায়ও প্রতিধ্বনিত হয়েছে।

বিডিএস ফিলিস্তিনিদের আহ্বান করা একটি কৌশল, যা দখলদারির অবসান, ইসরায়েলি জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশ ‘ইসরায়েলি ফিলিস্তিনি’র সমান অধিকার এবং ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য ন্যায়বিচার পেতে চায়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা বি’তসেলেম সম্প্রতি একটি যুগান্তকারী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে ইসরায়েল যা করছে তার বর্ণনা দিতে গিয়ে ‘বর্ণবিবৈষম্য’ পরিভাষা ব্যবহারকে যথার্থ বলে প্রমাণ করেছে। আর দক্ষিণ আফ্রিকার তৎকালীন বর্ণবৈষম্যবাদী রাষ্ট্রে পরিবর্তন আনতে বয়কট একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিল। ইসরায়েলের কাছে বিষয়টি অজানা নয়।

স্টারমার তাঁর ভাষণে স্মরণ করিয়ে দেন যে রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলকে এমন এক ‘মানদণ্ডে’ রাখা হয়েছে, যেখানে অন্য কোনো দেশ নেই। অথচ সৌদি আরবের অপরাধের সঙ্গে, অন্তত ইয়েমেনকে মানবিক দুর্যোগে নিমজ্জিত করার ক্ষেত্রে, ব্রিটিশ সরকারের জড়িত থাকার নিন্দাও অনেকে জানাচ্ছে।

বিডিএস একটি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ কৌশল। এর পরও এটাকে অগ্রহণযোগ্য বলে খারিজ করে দেওয়া হয়। তাই প্রশ্ন ওঠে, ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধের বৈধ রূপটি তাহলে কী হবে? পশ্চিমা সরকারগুলোর নৈতিক চাপ থেকে কোনো ফল পাওয়া যায়নি। ইসরায়েলের ২০১৮ সালের ‘জাতিরাষ্ট্র’ আইনে ফিলিস্তিনিদের ন্যূনতম অধিকারের কথা উল্লেখ রয়েছে। গত মাসেও পশ্চিম তীরে আরো তিন হাজার অবৈধ বাড়ির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তাই ফিলিস্তিনিদের অপরাধ যখন ঘিরে ধরে, পশ্চিমারা শুধু তখনই বিরক্তি প্রকাশ করে।

প্রকৃতপক্ষে ফিলিস্তিনি কণ্ঠস্বর শোনার এই অস্বীকার গুরুতর কিছু প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে। অর্থাৎ মানুষ যদি ফিলিস্তিনি মাতৃভূমিকে সমর্থন করে, তাহলে এর রূপটি দেখতে কেমন হবে? ভবিষ্যতের লেবার সরকার কি ইসরায়েলকে অস্ত্র ও সমর্থন দেওয়ার পাশাপাশি ইসরায়েলি দখলদারির পক্ষে কিছুটা জোরেই কথা বলবে? যদি তা-ই হয়, তাহলে ইসরায়েলের শাসকদের মধ্যে পরিবর্তন আনার জন্য কী ধরনের উৎসাহ অবশিষ্ট থাকবে?

সুতরাং ফিলিস্তিনি ট্র্যাজেডি থেকেই যাচ্ছে। তাই এর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আলোচনা যতই প্রান্তিক হয়ে উঠবে, এর জনগণও নিজ ভূমিতে প্রান্তিক হয়ে থাকবে।

 

লেখক : দ্য গার্ডিয়ানের যুক্তরাজ্য কলামিস্ট

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান

ভাষান্তর : আফছার আহমেদ

 



সাতদিনের সেরা