kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২ ডিসেম্বর ২০২১। ২৬ রবিউস সানি ১৪৪৩

সাধারণ মানুষের চিকিৎসার মৌলিক অধিকার

এ কে এম শাহনাওয়াজ

২৬ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



সাধারণ মানুষের চিকিৎসার মৌলিক অধিকার

অনেক দিন পর রাজনীতির মাঠ কিছুটা উত্তপ্ত করতে পেরেছে বিএনপি। জনস্বার্থের বড় কোনো ইস্যু দিয়ে নয়, বিএনপি নেত্রীর উন্নত চিকিৎসার জন্য মুক্তি ও বিদেশে পাঠানোর দাবিতে। বিএনপিপক্ষের দাবি, সরকার মানবিক দিক বিবেচনায় খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানোয় সম্মতি দিতে পারে। সরকারপক্ষের মনে হচ্ছে, এর পেছনে বিএনপির রাজনৈতিক কুশলী চিন্তা রয়েছে। আমি অবশ্য এই লেখায় এ ধারার কোনো কূট বিতর্কে নিজেকে যুক্ত করতে চাইছি না। আমার প্রসঙ্গটি আলাদা।

আমি ভাবছি অন্য কথা। বিএনপি নেতারা খালেদা জিয়ার প্রতি সহানুভূতি অর্জনের জন্য প্রায় ‘তিনবারের প্রধানমন্ত্রী’ কথাটি যুক্ত করেন। তাহলে আমাদের প্রথম প্রশ্ন, এতকাল সরকার পরিচালনা করেও আপনারা দেশের চিকিৎসাব্যবস্থাকে এতটা অন্ধকারে রেখেছেন কেমন করে যে এখন নেত্রী অসুস্থ হলে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা ও চিকিৎসকদের প্রতি আস্থা রাখতে পারছেন না! উন্নত চিকিৎসার জন্য নেত্রীকে পাঠাতে চাচ্ছেন বিদেশে। হতেই পারে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা এতটা উন্নত নয় যে সব রোগের চিকিৎসায় ভরসা রাখা যায়। দ্বিতীয় প্রশ্ন, আপনারা সবাই জননেতা, জননেত্রী। জনগণের কল্যাণ করবেন বলেই রাজনীতি করছেন। তাহলে সাধারণ মানুষ বিএনপি নেত্রীর মতো ‘কঠিন’ রোগাক্রান্ত হলে তাদের চিকিৎসার বিষয় নিয়ে কেন কথা বলছেন না; নাকি আপনাদের রাজনীতিতেও ব্রাহ্মণ ও শূদ্রের ফারাক রয়েছে। শুধু বিএনপি কেন, আওয়ামী লীগও কম দিন ক্ষমতায় নেই। কিন্তু নেতা-নেত্রীরা মুখে যতই মুখরোচক কথা বলুন না কেন, শেষ পর্যন্ত শরীরটা কেমন কেমন করছে মনে হলেই বিদেশে পাড়ি জমান শরীর চেকআপ করানোর জন্য। বিপন্ন সাধারণ মানুষের কথা কারো স্মরণে থাকে না।

স্বাধীনতা-উত্তর বিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন জরুরি ছিল। তাই উন্নয়নের অনেক বেশি প্রত্যাশা অনেকেই করেনি। ১৯৭৫-পরবর্তী বাংলাদেশে বিএনপি, আওয়ামী লীগ আর জাতীয় পার্টি দীর্ঘ সময় ধরে শাসনক্ষমতায় ছিল। এ সময়ে একটি পরিবর্তন প্রত্যাশিত ছিল। বড় বড় বিলাসী বেসরকারি হাসপাতাল আর ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স দিয়েছে ঠিকই; কিন্তু সরকারি হাসপাতালের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন আর বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যয়ের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের সমন্বয়ের কথা কোনো সরকারপক্ষই ভাবেনি। রাজনীতি অঞ্চলের ক্ষমতাশালী মানুষ, সরকার পরিচালক ও ধনিক শ্রেণি সামান্য অসুখেও ছুটে যান থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে। তাঁরা নিজেরাই যেখানে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় আস্থাশীল না হয়ে দেশান্তরি হন, তাহলে আসল সংকটটি অনুধাবন করবেন কেমন করে। চিকিৎসাক্ষেত্রে উন্নতিই বা হবে কিভাবে! হয়তো ভাবেন, ‘আমরা নিরাপদে থাকি, পচনশীল স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় সাধারণ মানুষ মরুক-বাঁচুক তা দেখার দায় কি আমাদের?’

গণশক্তি ও জনমনতুষ্টি বিষয়টি আমলে না এনে রাজনৈতিক পাণ্ডাদের পেশিশক্তির ওপর নির্ভরতা যেদিন থেকে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিশেষ জায়গা করে নিল, সেদিন থেকে রাষ্ট্রের সব জায়গায় প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতির নিশ্চিন্ত আশ্রয় হলো। দুর্নীতিবাজরা রাজনৈতিক সরকারকে নিজেদের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে। ক্ষমতাপ্রিয় রাজনৈতিক দলের নেতাদের ক্ষমতায় পৌঁছার সিঁড়ি হিসেবে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দেয়। তাই হাজার অন্যায় করলেও এদের সাতখুন মাফ হয়ে যায়। এ কারণে স্বাস্থ্য খাত থেকে শুরু করে দেশের সব খাতেই দুর্নীতিবাজরা সব অন্তঃসারশূন্য করে দিচ্ছে। রাজনৈতিক ক্ষমতাবান নেতা এবং সব ধরনের প্রশাসনে দুর্নীতির ভাইরাস এখন করোনার চেয়েও দ্রুতগতিতে ছড়াচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় করোনাকালে এসে আমাদের অত্যন্ত আতঙ্কের সঙ্গে দুর্নীতি আক্রান্ত স্বাস্থ্য খাতের দুর্দশা দেখতে হচ্ছে। দুর্ভাগ্য এই যে স্বাস্থ্য খাতের নানা ধরনের দুর্নীতির খবর বহুদিন ধরে গণমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ার পরও সরকারি দল ও সরকার এর তেমন কোনো প্রতিবিধানের চেষ্টা করেনি। তাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সব জায়গায়ই দুর্নীতিবাজদের অভয়ারণ্য তৈরি হয়েছে। হাসপাতালগুলোর জন্য বড় বড় বাজেট বরাদ্দ হয়েছে আর এর বড় অংশই অন্ধকার ড্রেন দিয়ে দুর্নীতিবাজদের পকেটে জমা হয়েছে। তাই প্রায় দুই বছর আগে করোনাকালে একে একে খসে পড়েছিল ঝুলির কালো বিড়ালগুলো।

করোনার মতো এত ভয়াবহ মহামারি মোকাবেলার জন্য অভিজ্ঞতা ও প্রস্তুতি আমাদের থাকার কথা নয়। এই বাস্তবতা অবশ্যই বুঝতে হবে। তবে করোনা আঘাত না হানলে আমরা বুঝতে পারতাম না দুর্নীতিবাজরা কতটা ঘুণপোকার মতো কুরে কুরে খেয়ে ফাঁপা করে ফেলেছে। ভেন্টিলেশন থেকে শুরু করে হাসপাতালের চিকিৎসক ও চিকিৎসাকর্মীদের জন্য স্বাস্থ্য সুরক্ষা সরঞ্জামের সংকট যে এত প্রকট হবে কে বুঝেছিল! ইউরোপ ও আমেরিকায় কভিড হানা দেওয়ার পর সতর্ক হওয়ার জন্য বেশ কিছুটা সময় আমরা পেয়েছিলাম। কিন্তু কোনো প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি। দুর্নীতিবাজদের বিবেক কখনো কাজ করে না। দেশপ্রেমের তো প্রশ্নই নেই। তাই হয়তো অপেক্ষা করেছে, সংকট কখন আঘাত হানে। তখন তড়িঘড়ি অবস্থা সামাল দেওয়ার জন্য নিজেদের দুর্নীতির হাত প্রসারিত করার মওকা পাওয়া যাবে। কার্যকারণ সূত্রে এই কল্পনা অনেকটা যেন মিলে গেল। এ দেশের ক্ষমতাবান রাজনীতিকরা মুখে যা-ই বলুন না কেন, দেশ বা জনগণ নয়—দল সুরক্ষাটাই প্রধান বিবেচনা করেন। ছোট দেশ; সবাই সবাইকে চেনে। চোখের সামনের ঘটনাগুলো আড়াল করা যায় না। দেশের মানুষের শ্রমের টাকার রাজস্ব থেকে সরকার উন্নয়নের কাজ করে। কিন্তু অসহায় মানুষ দেখে অভ্যস্ত সব সরকারের আমলেই স্থানীয় পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত দলীয় পাণ্ডারা ঠিকাদারি থেকে শুরু করে সব ধরনের লাইসেন্স পেয়ে যায়। তাই উপজেলা-জেলায় বিএনপি ও আওয়ামী লীগ যার যার সময় দলীয় অঙ্গসংগঠনের নেতাদের পৃষ্ঠপোষকতা করার জন্য ঠিকাদারির ‘ঠ’ অভিজ্ঞতা যাদের নেই, তারা ঠিকাদারির লাইসেন্স পেয়ে যায়। বিশেষ উপায়ে তারা টেন্ডারে জিতে কার্যাদেশও পায়। প্রায় সময় এসব কাজ বিক্রি করে দেয় সাব-কন্ট্রাক্টরদের কাছে। এভাবে কাজ শুরু হওয়ার আগে কমপক্ষে তিন জায়গায় বানরের পিঠা ভাগ হয়। ‘অফিস খরচে’ যায় এক ভাগ, মূল ঠিকাদার এক ভাগ রেখে সাব-কন্ট্রাক্টরকে দেয়। তিনি আবার তাঁর ভাগ রেখে—ধরি একটি রাস্তা মেরামতের কাজ শুরু করে। সেই কাজের মান কতটা রক্ষা পায় তা সহজেই অনুমেয়। তাই রাস্তার মাথা সংস্কার করে লেজের দিকে আসতে আসতে মাথা ভেঙে যায়। অর্থাৎ জনগণের টাকা দুর্নীতিবাজদের পকেট ভরতেই শেষ হয়ে যায়। জনকল্যাণ হোক বা না হোক, দলকল্যাণ তো হয়! করোনাকালের শুরুতেও তাই ঘটেছিল। ডাক্তার ও চিকিৎসাকর্মীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য অতি প্রয়োজনীয় মাস্ক কেনার কার্যাদেশ প্রায় প্রতিযোগিতাহীনভাবে পেয়ে গিয়েছিল সরকারি দলের নেতার প্রতিষ্ঠান। আর সরবরাহ করে ফেলল নকল মাস্ক। বিপুল টাকার ভাগবাটোয়ারা কত দূর পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছিল তা প্রমাণ করার ক্ষমতা জনগণের নেই।

বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের যন্ত্রপাতি ক্রয়ের সমুদ্রচুরির খতিয়ান তো বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়ে আসছে। মানুষ এসব খবর পায় এবং ক্ষুব্ধ হয়। কিন্তু এ সংবাদটি পায় না যে এসব দুর্নীতিবাজ বিচারের আওতায় এলো কি না; বরং এ তথ্য ভেসে আসে চিহ্নিত অনেক দুর্নীতিবাজ পুরস্কৃত হয় এবং নতুনভাবে দুর্নীতি করার মওকা খুঁজে নেয়। এভাবে দুর্নীতিবাজ বড় নেতা বা আমলা ফুলেফেঁপে বেলুন হয়ে এক সুন্দর সকালে কানাডা, সুইজারল্যান্ড বা অস্ট্রেলিয়ায় চলে যাবে।

সরকারের ঘরে দুর্নীতিবাজদের বসতি থাকলে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। সরকার দৃঢ় নয় বলে করোনাকালের সংকটেও বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে জনকল্যাণে এগিয়ে আসতে বাধ্য করতে পারেনি। বাধ্য করাতে হলে সততার শক্তির প্রয়োজন হয়। এর প্রমাণ তো আমরা এই দুঃসময়ে বেশ কয়েকটি নামি বেসরকারি হাসপাতালের উদ্যোগের নমুনায় দেখতে পাচ্ছি।

আমাদের বরাবর মনে হয়, রাজনৈতিক লাভালাভ আর প্রভাব থেকে আমাদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ও দুদককে মুক্ত করে দিতে পারলে এসব অনাচার থেকে আমরা অনেকটা মুক্তি পাব। একই সঙ্গে করোনার অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত। দেশবাসী চিকিৎসা পাওয়ার মৌলিক অধিকার হারাচ্ছে। আমাদের দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতার কারণেই উচ্চবিত্ত আর মধ্যবিত্ত সামর্থ্য বিবেচনায় চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন দেশে ছোটেন। কিন্তু কভিডের মতো সংকটে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যখন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল তখন তো চিকিৎসার জন্য নিজ দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার ওপরই নির্ভর করতে হয়েছিল। নাগরিকের চিকিৎসার অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারেরই। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর তো এরই মধ্যে প্রমাণ করছে তারা কিসিঞ্জারের তলাবিহীন ঝুড়ি পেতে রেখেছে। ওখানে কিছু ফেললেই নর্দমায় চলে যাবে। তাই প্রথমত এই অঞ্চল রাজনীতি প্রভাবমুক্ত করতে হবে। ঝুড়ির তলা সারাই করতে হবে। দুর্নীতিবাজদের ছায়ামুক্ত করে নতুনভাবে সব সাজাতে হবে। আমি বিশ্বাস করি, এ দেশের চিকিৎসকরা অকর্মণ্য, অদক্ষ আর অমেধাবী নন। মুক্ত পরিবেশে সুযোগ পেলে তাঁদের অনেকেই বিশ্বমানের চিকিৎসার কাঠামো গড়ে তুলতে পারবেন।

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

shahnawaz7b@gmail.com

 



সাতদিনের সেরা