kalerkantho

বুধবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ১ ডিসেম্বর ২০২১। ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩

এ দায় আপনার

কৌশিক আহমেদ

২৪ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



এ দায় আপনার

জলবায়ু পরিবর্তনের দায় একে-অন্যের ওপর চাপানোর রীতি নতুন নয়। চলমান এই রীতির প্রতি সম্মান জানিয়ে দায় আপনার তথা অন্যের ওপর চাপিয়ে নগদ সুখ থেকে বঞ্চিত না করাই বাঞ্ছনীয়। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের দায় থাকার পরও আপাতদৃষ্টিতে দায়ভার নগদে আমাকে-আপনাকে বহন করতে হচ্ছে না। দায়ভার তোলা থাকবে বাকির খাতায়, নিকট ভবিষ্যতেই জীবন দিয়ে তা সুদসমেত পরিশোধ করতে হবে আমাদের ও আমাদের উত্তরাধিকারীদের।

প্রকৃতির অপ্রতিরোধ্য প্রতিশোধ এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। বহু মানুষ উদ্বাস্তু হচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। তীব্রতা বাড়ায় দুর্যোগে ধনী দেশগুলোতেও মানুষ মরছে, যদিও এখনো নিহতের সংখ্যা সম্ভবত আমাদের তথা বিশ্বনাগরিকদের কাছে যথেষ্ট ‘সন্তোষজনক’ নয়। বিদ্যমান ভোগবাদী ব্যবস্থায় আমরা নগদ চাই। নিহতরা আমাদের কাছে সংখ্যামাত্র।

সদ্য করোনাপীড়িত বিশ্ব যখন থমকে যাওয়া জিডিপিকে দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে, ঠিক তখন অনুষ্ঠিত হয়েছে জলবায়ু সম্মেলন। ভবিষ্যৎ পরিণতি যা-ই হোক না কেন, ভোগবাদী জীবনব্যবস্থার পরিবর্তনের কথা বিশ্বসমাজ কল্পনাও করতে পারে না। এই বাস্তবতা জানার পরও এ সম্মেলন ঘিরে নানা রকম আশঙ্কার কথা জানিয়ে বারবার ‘অশান্তি’ সৃষ্টি করে চলেছে জাতিসংঘ। ‘চেতে’ উঠেছেন জলবায়ুকর্মী, বিজ্ঞানী ও গবেষকরা। এর মধ্যে সুইডেনের আলোচিত জলবায়ু আন্দোলন কর্মী গ্রেটা থুনবার্গ বলেছেন, মারাত্মক ‘আপত্তিকর ও অস্বস্তিকর’ কথা। বলেছেন, জনসাধারণের দাবিতে পরিবর্তন না এলে সম্মেলনের মাধ্যমে কাজের কাজ কিছু হবে না। ‘জনসাধারণকে বিদ্যমান ব্যবস্থার শিকড় উপড়ে ফেলতে হবে’। বাঁচতে হলে ভোগবাদী সমাজের ‘মৌলিক পরিবর্তন’ আনতেই হবে।

কী সর্বনাশের কথা! যেখানে রাষ্ট্রের কর্ণধারদের ওপর দায় ও দায়িত্ব চাপিয়ে আমরা বিশ্বের সাধারণ নাগরিকরা নিশ্চিন্তে রয়েছি, সেখানে ওই কিশোরী মেয়েটি এসব বলে কী! সব দায় নাকি আমার-আপনার তথা বিশ্বের সব নাগরিকের। সোজাসাপ্টায় ওই কিশোরী গুরুতর যে অস্বস্তির কথা বলেছেন তা হলো, পৃথিবীকে মানুষের বসবাসের উপযোগী রাখতে হলে আমাদের প্রত্যেকের ভোগ ত্যাগ বা সীমিত করতে হবে এবং বিদ্যমান ভোগবাদী তথা ‘পূজনীয়’ এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার শিকড় উপড়ে ফেলতে হবে। আগে পরিবর্তন আনতে হবে নিজেদের জীবনাচরণে, তারপর রাষ্ট্রের কাছে দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করতে হবে।

আমার-আপনার চাহিদা মেটাতেই কার্বন নিঃসরণ করে ঘোরে কারখানার চাকা, উৎপন্ন হয় ভোগ্যবস্তু। চলে ট্রেন, গাড়ি, জাহাজ, উড়োজাহাজ। পোশাক-পরিচ্ছদ, যাতায়াত থেকে খাদ্যাভ্যাস তথা আমার-আপনার প্রাত্যহিক ভোগই জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী। তাই প্রাণিজ খাবার বন্ধ করতে হবে বা কমিয়ে দিতে হবে, মানিব্যাগের স্বাস্থ্য ভালো থাকার পরও উড়োজাহাজে করে প্রমোদভ্রমণ পরিত্যাগ করতে হবে, জামাকাপড় থেকে শুরু করে সব ধরনের ভোগ্যপণ্য না হলেই নয়, এমন পরিমাণে ব্যবহার করতে হবে। গণপরিবহন ব্যবহার করতে হবে। কারণ প্রত্যেক নাগরিকের ভোগে নির্গত হওয়া কার্বনের সমষ্টিই হলো রাষ্ট্রের দায়।

এর আগে অনুষ্ঠিত হওয়া ২৫টি জলবায়ু সম্মেলন মূলত কোনো কাজেই আসেনি। কারণ একটাই, বিদ্যমান ভোগবাদী জীবনব্যবস্থা পরিবর্তনের কথা বিশ্বের মানুষ কল্পনায়ও আনতে পারে না। জিডিপির মোহ পরিত্যাগ করা মানবজাতির পক্ষে সম্ভব নয়, তার পরও নৈতিক দায় থেকে সম্মেলন হয়। মৌলিক পরিবর্তনের চিন্তা না করায় সম্মেলনগুলো মূলত সার্কাসে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রের নাগরিকরাই যেহেতু রাষ্ট্রের নেতা হন, তাই রাষ্ট্রের নাগরিকদের মানসিকতারই প্রতিফলন ঘটাচ্ছেন রাষ্ট্রের নেতারা। প্রতিবছরই জলবায়ু নিয়ে আলোচনা মৌসুমে মানবজাতির সম্মিলিত এই আত্মপ্রতারণার চিত্র ফুটে উঠছে। এবারের সম্মেলনে নেতৃত্ব দিয়েছে যুক্তরাজ্য, যারা উত্তর আটলান্টিকে নতুন বড় তেলকূপ খননের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সম্মেলনে বরাবরের মতো এবারও আমাদের মতো উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশের নেতারা ছিলেন জলবায়ু তহবিল থেকে যতটা পারা যায় ‘হাতিয়ে’ নেওয়ার ‘ধান্দায়’। সম্মেলন থেকে ফিরে বিশ্বনেতারা মনোযোগ দিচ্ছেন জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে। ফিরে এসেছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রীও। দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলছে সুন্দরবনে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ। তবে জলবায়ু তহবিল থেকে যতটা পারা যায় ‘হাতিয়ে’ নিতে পারলেই আমরা খুশি।

ভোগ নির্ভর করে মানিব্যাগের স্বাস্থ্যের তারতম্যের ওপর। তাই বিদ্যমান ভোগ ব্যবস্থা পরিবর্তনের দায় ও ‘প্যাড়া’ কোনোটিই নেই কথিত সভ্য সমাজের বাইরে থাকা দরিদ্রদের। কিন্তু বিদ্যমান ব্যবস্থায় অভ্যস্ত আমরা যারা মানিব্যাগের স্বাস্থ্য সাপেক্ষে কমবেশি ভোক্তা, তাদের সুখ নষ্ট করছেন এই সুইডিশ কিশোরী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী আমাদের উত্তরাধিকারীদের বাঁচিয়ে রাখতে হলে বিদ্যমান ভোগ ব্যবস্থায় লাগাম পরাতে হবে আমাদেরই।

শুধু কি ওই কিশোরী, জলবায়ুসংক্রান্ত ‘আলোচনা মৌসুমে’ জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থা একের পর এক উত্পীড়ন করে চলেছে। বাকির জন্য বিশ্ববাসী নগদ ত্যাগ করতে চায় না, এই বাস্তবতা জানার পরও তারা নানা আশঙ্কার কথা একের পর এক প্রকাশ করেই যাচ্ছে। তারা বলছে, বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি প্রাক শিল্প যুগের চেয়ে সর্বোচ্চ দেড় ডিগ্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হলে ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণের হার কমাতে হবে প্রায় অর্ধেক, জাতিসংঘ স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, আমরা যেভাবে চলছি, তাতে কমা তো দূরের কথা, কার্বন নিঃসরণ আরো ১৪ শতাংশ বাড়বে। জাতিসংঘ আরো বলেছে, ২০৫০ সালের মধ্যে ভুট্টাসহ পানি বেশি প্রয়োজন—এমন প্রধান ফসলের উৎপাদন ৮০ শতাংশ কমে যেতে পারে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষত সাইবেরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ায় ভয়াবহ দাবানলে কোটি কোটি টন কার্বন নিঃসৃত হয়েছে। ইউনেসকো জানিয়েছে, ‘এটা একটা ভয়াবহ চক্র। যত বেশি কার্বন নিঃসৃত হবে, পরিণতিতে তত বেশি দাবানলের ঘটনা ঘটবে। আবার যত বেশি দাবানল ঘটবে, কার্বন নিঃসরণও হবে তত বেশি।’ অর্থাৎ ওই চক্র একবার শুরু হলে চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়বে কার্বন নিঃসরণ। আর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি, অতিবৃষ্টি-অনাবৃষ্টি, দাবদাহ, শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়, বন্যাসহ নানা আশঙ্কার কথা বলে উত্পীড়ন করার বিষয়টি তো নতুন নয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দরিদ্ররা—এমন একটি বক্তব্য এত দিন আমাদের স্বস্তির কারণ ছিল, কিন্তু মানবজাতির সামাজিক-অর্থনৈতিক স্তরবিন্যাস না বোঝা করোনাভাইরাসের মতো ‘বেআক্কেল’ জীবাণুরা সে স্বস্তিও নষ্ট করে দিল। এই ‘বেআক্কেল’ জীবাণুর সংক্রমণে ধনী দেশগুলোতেই মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি। কেবল করোনা নয়, এমনকি জেগে উঠবে আদিকালের জীবাণুরাও। আদিকালের ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে মারা যাওয়া বহু মানুষ ও প্রাণীর কবর রয়েছে সাইবেরিয়ার পার্মাফ্রস্ট (বরফজমাট মাটি) এলাকায়। সেই বরফজমাট মাটি গলতে শুরু করায় জীবাণুরা সুপ্ত অবস্থা থেকে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে। ২০১৭ সালে বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৬ সালে রাশিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় দুর্গম অঞ্চল সাইবেরিয়ান তুন্দ্রায় (ইয়ামাল উপদ্বীপ নামে পরিচিত) ৭৫ বছর আগের অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয় ২০ জন। সম্প্রতি রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেখানকার বরফ গলা অব্যাহত রয়েছে। এর মানে দাঁড়ায় বৈশ্বিক উষ্ণতায় বরফ গলতে থাকলে, তা হবে রোগের প্যান্ডোরার বাক্স খুলে যাওয়ার মতো। অর্থাৎ কাণ্ডজ্ঞানহীন জীবাণুদের কারণে ফল নির্বিশেষে সবাইকে ভোগ করতে হবে। তা ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের ফল কী হতে পারে তার সবটাই যে মানুষ জানে, তা নয়। রয়েছে অজানা আশঙ্কাও। আর সবচেয়ে বড় অস্বস্তিকর বিষয় হলো, এই ফল ভোগ করতে হবে শিগগিরই। মানুষ বহুকাল আগেই জেনেছে কার্বন নিঃসরণের ফল কী হতে পারে। ১৮২৪ সালে ফরাসি পদার্থবিদ জোসেফ ফোরিয়ার পৃথিবীর প্রাকৃতিক গ্রিনহাউস প্রভাব সম্পর্কে প্রথম ধারণা দিয়েছিলেন। নগদবাদী মানুষ স্বভাবতই দূরবর্তী ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে না। এখন দেখা যাচ্ছে, ভোগবাদের মোহ এতটাই শক্তিশালী যে নিজেদের জীবনও তুচ্ছ। কার্বন নিঃসরণ ব্যাপক মাত্রায় হ্রাস না করলে বিজ্ঞানীদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এখনকার তরুণ ও শিশু-কিশোরদের জীবনই সংকটের মুখে পতিত হবে। আর বাস্তবতা হলো, বিদ্যমান ব্যবস্থা পরিবর্তনের ইচ্ছা ও ক্ষমতা কোনোটিই আমাদের নেই। চেতনে-অবচেতনে আমরা সবাই তা জানি, বুঝি। তাই ঝেড়ে ফেলুন যাবতীয় অস্বস্তি।

এর মধ্যে স্বস্তির বিষয় হলো, মিডিয়াজুড়ে ‘চেতে’ ওঠা এই ‘মৌসুমি’ ইস্যুটি স্বল্পমেয়াদি। সম্মেলনে বিশ্ব-সামাজিক চক্ষুলজ্জার খাতিরে রাষ্ট্রের কর্ণধাররা প্রতিবারের মতো নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছেন। দেশে ফিরে মনোনিবেশ করছেন জিডিপি প্রবৃদ্ধির হিসাব-নিকাশে। তারপর বেশ কিছুদিন আমাদের আর উত্পীড়ন সহ্য করতে হবে না। আমরা বরাবরের মতোই ‘সুড়সুড়’ করে টাই পরে অফিসে যাব। উৎপাদন বাড়িয়ে কিভাবে করোনার ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যায়, সে তদারকি করে নিজের ও দেশের তথাকথিত কল্যাণ বয়ে আনব। আমাদের সামনে হাতছানি দিতে থাকবে নানা দামের, নানা জাতের, নানা পদের, নানা সুবিধার ভোগ্যপণ্য। পুঁজিবাদ নামের ‘আশ্চর্য প্রদীপ’-এর আলোক-ফাঁদের দিকে ছুটতে ছুটতে বেঘোরে প্রাণ হারাব আমরা, যেমন হারায় পোকামাকড়। এই আলোর মোহের কাছে জীবন অতি তুচ্ছ, সংখ্যামাত্র।

আবার যখন উদ্বেগের মৌসুম শুরু হবে, ‘চেতে’ উঠবে জাতিসংঘ, তখন আমরা ইস্যুটিকে কৃত্রিম দুঃখ বানিয়ে তা উপভোগ করতে পারি। মানবজাতির এই অদ্ভুত সুখের বর্ণনা দিয়েছিলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর একটি চরিত্রে : ‘কুন্দ এত সুখী যে শখ করিয়া দুটো-একটা কৃত্রিম দুঃখ বানাইয়া সে উপভোগ করে’ (পুতুলনাচের ইতিকথা)।

মরার আগ পর্যন্ত প্রতিবছর জলবায়ুসংক্রান্ত আলোচনা মৌসুমে আমরা ভবিষ্যতের আশঙ্কাগুলোকে কৃত্রিম দুঃখ বানিয়ে কুন্দর মতো উপভোগ করতে পারি। হয়তো সেটাই করে চলছি, বলাটাই বাতুলতা।

 লেখক : সাংবাদিক

 



সাতদিনের সেরা