kalerkantho

বুধবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ১ ডিসেম্বর ২০২১। ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩

বিশ্বের দরকার এখন টিকা সুবিচার

অনলাইন থেকে

২২ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অ্যাস্ট্রাজেনেকার মহত্ত্ব হোঁচট খেয়েছে। কম্পানি যখন কভিড টিকা উৎপাদনের জন্য অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে যায়, তখন এর প্রতিশ্রুতি ছিল মহামারি থাকাকালে সে উৎপাদন খরচে টিকা বিক্রি করবে। কিন্তু কম্পানিটি এখন তার প্রথম লাভজনক চুক্তিতে স্বাক্ষর করছে। অ্যাস্ট্রাজেনেকার বলছে, তারা বিশ্বাস করে যে কভিডজনিত অসুস্থতা এখন মহামারি থেকে স্থানীয় প্রাদুর্ভাবের পর্যায়ে (এন্ডিমিক ফেজ) চলে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাপী মৃতের সংখ্যা ৫০ লাখ ছাড়িয়ে যাওয়ার পর তাদের এই দাবি অত্যন্ত সন্দেহজনক। এর মধ্যেই গত ১৫ নভেম্বর এক দিনে বিশ্বজুড়ে দুই লাখ ৫০ হাজারের বেশি নতুন সংক্রমণ এবং পাঁচ হাজার ৪০০ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে।

তবে অ্যাস্ট্রাজেনেকার বিবরণের দিকে মনোনিবেশ করা সম্পূর্ণ ভুল হবে। কারণ টিকা বিতরণে কম্পানিটি সক্ষমতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকার সময়েই তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা ঠিকই টিকা বিক্রি করে বিপুল অর্থ কামিয়ে নিচ্ছে। যেমন—ফাইজার জানিয়েছে, তারা কভিড ভ্যাকসিন বিক্রি থেকে এ বছর ৩৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঘরে তুলবে। সমস্যাটি হচ্ছে যেসব জায়গায় এখনো সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সেসব জায়গায়ই টিকার চালান সেভাবে যাচ্ছে না। ফলে এই প্রাদুর্ভাব দরিদ্র দেশগুলোর মহামারিতে পরিণত হচ্ছে। ৭০০ কোটির বেশি ডোজ এ পর্যন্ত বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে যেখানে ১২ বছরের বেশি বয়সী শিশুসহ যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের মধ্যে প্রতি ১০ জনের মধ্যে দুজনের বেশি বুস্টার ডোজও পেয়ে গেছে, সেখানে প্রাথমিক প্রয়োজন সত্ত্বেও আফ্রিকার প্রতি ১০ জন স্বাস্থ্যকর্মীর মধ্যে গড়ে একজনের চেয়েও কম ব্যক্তিকে পূর্ণ ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কভিড-১৯-এর কারিগরি বিষয়ক প্রধান ড. মারিয়া কারকোভের ভাষায় এটি মর্মান্তিক। তিনি বলেছেন, মহামারি বিদ্যা, অর্থনীতি ও নৈতিকতার বিষয় বিবেচনা করলে আমাদের টিকা ব্যবস্থা বলতে গেলে অনুপযুক্ত।

ফাইজার বলছে, বছর শেষে এটি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এক বিলিয়ন ডোজ পাঠাবে। বাস্তবতা হচ্ছে, এই সময়ে তার টিকা ভাণ্ডারের বড় অংশটি সমৃদ্ধ দেশগুলোই পাবে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্যে দেখা গেছে, সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে পাঠানো দুই বিলিয়ন ডোজের মধ্যে মাত্র ১৫.৪ মিলিয়ন দরিদ্রতম দেশগুলোতে গেছে। গবেষণা সংস্থা এয়ারফিনিটির মতে, জনসন অ্যান্ড জনসনের ভ্যাকসিনের প্রায় ৮৪ শতাংশ এবং মডার্নার ৯৬ শতাংশই উচ্চ-মধ্যম আয় ও উচ্চ আয়ের দেশগুলো পেয়েছে। যদিও জো বাইডেনের প্রশাসনের চাপের পর নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে আরো ডোজ বিক্রি করার চুক্তির পর্যায়ে রয়েছে বলে জানা গেছে।

পরিমিত অগ্রগতির আরো কিছু লক্ষণ রয়েছে। ফাইজারের অংশীদার বায়োএনটেক আফ্রিকার রুয়ান্ডা এবং পরে সেনেগালে তাদের প্রথম কভিড ভ্যাকসিন উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণ করবে। গত মঙ্গলবার ফাইজার ৯৫ দরিদ্র দেশে তার নতুন কভিড ওষুধ তৈরি ও সস্তায় বিক্রি করার অনুমতি দিয়ে একটি চুক্তির ঘোষণা দিয়েছে। যদিও ১০৫টি দেশের সঙ্গে মার্কের করা একই ধরনের একটি চুক্তির পর তারা এই ঘোষণা দিয়েছে। ফাইজারের কভিড বড়িগুলো বিশেষত ওই সব অঞ্চলের জন্য সহায়ক হতে পারে, যেখানে মানুষের পক্ষে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেওয়া কঠিন।

তবে চুক্তিটিকে যতই স্বাগত জানানো হোক, এটি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশকে বাদ দিয়েছে। বিশেষ করে ব্রাজিলের মতো দেশ, যারা কভিডের কারণে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে। দেশটিকে ফাইজার থেকে সরাসরি ওষুধটি কিনতে হবে। নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা যদি সহজে পাওয়া না যায়, তাহলে কোনো চিকিৎসাব্যবস্থাই কাজে আসে না। আর এটা অবশ্যই সংক্রমণ কমাতে ভ্যাকসিনের মতো কাজে লাগবে না।

সামগ্রিকভাবে মানুষের জীবন বাঁচাতে আমাদের যেখানে লাফ দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার কথা, এর পরিবর্তে ছোটখাটো সুনামের অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছি। ইইউ ও যুক্তরাজ্য টিকার ক্ষেত্রে পেটেন্ট ছাড় আটকে দেওয়া অব্যাহত রেখেছে এবং ধনী দেশগুলো এখনো তাদের দরকারের চেয়ে বেশি ডোজ আগলে রেখেছে। শুধু ব্রিটেনই এই গ্রীষ্মে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার কারণে ছয় লাখের বেশি অ্যাস্ট্রাজেনেকা টিকার ডোজ ফেলে দিয়েছে। অক্সফার্ম মনে করছে, এ বছরের শেষের দিকে জি-৭-ভুক্ত দেশগুলো কমপক্ষে ১০০ মিলিয়ন ডোজ অব্যবহৃত থেকে যাওয়ার কারণে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যাবে। আর অন্যদের এত বেশি দেরিতে টিকা পৌঁছানো  হয়েছে যে সেগুলো সময়মতো বিতরণ করা যাবে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বুস্টার ডোজের ওপর স্থগিতাদেশের আহবান জানানোর পরও যুক্তরাজ্য ৪০ বছরের কম বয়সীদের এখন তৃতীয় ডোজ প্রদান করবে এবং একই ধরনের ক্যাম্পেইন অন্য দেশেও চলছে। অথচ সংক্রমণ প্রশমন ব্যবস্থায় আরো ভালো কাজ করত বাধ্যতামূলক মাস্ক ও ভ্যাকসিন পাসপোর্টের মতো পদক্ষেপগুলো।

বিশেষজ্ঞরা এখন নির্দেশনা দিতে দিতে ক্লান্ত হওয়ার মধ্যেই ধনী দেশগুলোর টিকা মজুদদারি কেবল অনৈতিকই নয়, বোকামিও। কারণ ভাইরাসটি অনেক জায়গায় কার্যত অনিয়ন্ত্রিতভাবে ছড়িয়ে পড়ায় নতুন ও সম্ভাব্য ভ্যাকসিন-প্রতিরোধী ভেরিয়েন্ট আবির্ভাবের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। সুতরাং টিকার ডোজ এবং এর উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো ভাগাভাগি করা অপরিহার্য। সীমিত সংকেত নয়, বরং বিশ্বের জন্য বড় আকারের মৌলিক ও নীতিগত পদক্ষেপ প্রয়োজন।

 

সূত্র : সম্পাদকীয়, দ্য গার্ডিয়ান (যুক্তরাজ্য)

ভাষান্তর : আফছার আহমেদ



সাতদিনের সেরা