kalerkantho

শনিবার ।  ২১ মে ২০২২ । ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৯ শাওয়াল ১৪৪৩  

রুখতে হবে বাজার সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য

তাপস হালদার

১২ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



রুখতে হবে বাজার সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য

বর্তমান সময়ে বিশ্বব্যাপী করোনার সংক্রমণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। জনজীবন স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। সংগত কারণেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যতই সচল হবে জ্বালানির চাহিদাও তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়বে।

বিজ্ঞাপন

চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে দাম, তৈরি হচ্ছে নতুন সংকট। প্রায় দুই বছর পুরো বিশ্ব কার্যত স্থবির ছিল। সে সময় কম দামে বিক্রি করতে হয়েছে জ্বালানি তেল। উত্তোলনকারী দেশগুলো ক্ষতি পুষিয়ে নিতে তেলের মূল্য বাড়ানোর কৌশল হিসেবে দৈনিক তেল উত্তোলনের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে। বিশ্বব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছে, বিগত বছর থেকে বর্তমান বছরে তেলের মূল্য ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। তবে সরবরাহ বাড়তে থাকলে আগামী বছরের মাঝামাঝি দিক থেকে জ্বালানি পণ্যের মূল্য কমতে থাকবে এবং ২০২৩ সাল নাগাদ জ্বালানি পরিস্থিতি স্থিতিশীল হবে।

সরকার সার্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করেই জ্বালানি পণ্যের মূল্য বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকার থেকে বলা হয়েছে, এই মূল্যবৃদ্ধি সাময়িক। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য কমলে আবার ডিজেল ও কেরোসিনের দাম সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বাংলাদেশের বাজার পরিস্থিতি অনেকটা ভারতের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। ভারতে কোনো পণ্যের মূল্য বাড়লে এ দেশেও বেড়ে যায়, না হলে পণ্য পাচার হয়ে যায়। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বিশাল সীমান্ত পাহারা দিয়ে পাচার রোধ করা প্রায়ই অসম্ভব। দেশের প্রথম সারির একটি পত্রিকা ‘বাংলাদেশ দিল শাস্তি, ভারত দিল স্বস্তি’ শিরোনামে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে বিভ্রান্তিমূলক একটি সংবাদ প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ভারতে পেট্রলের আবগারি শুল্ক কমানো হয়েছে পাঁচ রুপি এবং ডিজেলে ১০ রুপি। ভারত নিয়মিতভাবে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করে। তবে এবার বিশ্ববাজারে দাম বাড়তে থাকায় দেশটির সরকার বিকল্প পথে জ্বালানি তেলের দাম কমানোর ব্যবস্থা করল। অর্থাৎ সরকার জ্বালানি তেল বিক্রি করে যে রাজস্ব পেত, সেখান থেকেই ছাড় দিল। সংবাদটিতে কী সুন্দরভাবে মিথ্যা তথ্য দিয়ে সত্যকে আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে। এই তথ্য-প্রযুক্তির যুগে সত্যকে মিথ্যা দিয়ে আড়াল করা যায় না। ভারত সরকার ১০ টাকা কমিয়ে মূল্য নির্ধারণ করেছে ১০১ রুপি। আর বাংলাদেশে ১৫ টাকা বাড়ানোর ফলে হয়েছে ৮০ টাকা। গত ৩ নভেম্বর কলকাতায় ডিজেলের মূল্য নির্ধারণ করা হয় ১০১.১৫ রুপি, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১২৪ টাকা। পাকিস্তানে বিক্রি হচ্ছে ১৪২ টাকায়। অর্থাৎ বাংলাদেশ থেকে ভারতে ৪৪ টাকা এবং পাকিস্তানে ৬২ টাকা বেশি মূল্যে ডিজেল বিক্রি হচ্ছে। ভারতে মূল্য কমানোর পরও যে বাংলাদেশ থেকে অনেক বেশি মূল্যে বিক্রি হচ্ছে পত্রিকাটি সুকৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে গেছে।

সরকার জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ব্যাখ্যায় বলেছে, বর্তমান ক্রয়মূল্য বিবেচনায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন প্রতি লিটার ডিজেলে ১৩.০১ পয়সা ও ফার্নেস অয়েলে ৬.২১ টাকা ভর্তুকি দেওয়ার ফলে দিনে প্রায় ২০ কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে। শুধু অক্টোবর মাসে পেট্রোলিয়াম পণ্য থেকে প্রায় ৭২৭ টাকা লোকসান হয়েছে। এবং পার্শ্ববর্তী দেশে তুলনামূলকভাবে বেশি মূল্য হওয়ায় নানা কৌশলে জ্বালানি তেল পাচার হচ্ছে। এসব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়ানো হয়েছে।

কথায় আছে, বাঙালির হাত তিনটি। ডান হাত, বাঁ হাত আর অজুহাত। তৃতীয় হাত অর্থাৎ অজুহাতই শক্তিশালী। যাঁরা বলছেন, তেলের মূল্য বেড়ে যাওয়ার কারণে পরিবহন ব্যয় বাড়বে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বাড়বে। তাঁদের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত নই। তবে তেলের মূল্যবৃদ্ধিটা সিন্ডিকেট দুর্বৃত্তদের কাছে আরেকটা নতুন অজুহাত হতে পারে। ২০১৩ সালের পর জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়েনি কিন্তু পরিবহনের ভাড়া তো বেড়েই চলছে। ঈদ, পূজা, রোজা, শীত, গ্রীষ্ম নানা অসিলায় এরা ভাড়া বাড়িয়ে থাকে। পরিবহন মালিকরা কাউকে পরোয়া করেন না। অনেক সময় জনগণকে জিম্মি করে তাঁদের দাবি মানতে সরকারকে বাধ্য করেন। পরিবহন মালিকরা তেলের মূল্য কমানোর জন্য কর্মবিরতির নামে ধর্মঘট করেননি। তাঁরা ভাড়া বাড়ানোর অজুহাত হিসেবে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধিকে হাতিয়ার করেছে।

তবে আশার কথা হচ্ছে, সরকার এখনো পর্যন্ত যেটুকু বাসভাড়া বাড়িয়েছে তা যদি সঠিকভাবে মনিটর করে, তাহলে জনজীবনে তেমন প্রভাব পড়বে না। যেমন—ধরুন জিগাতলা থেকে রামপুরা পর্যন্ত তরঙ্গ পরিবহনের ভাড়া ছিল ২০ টাকা। এখন তারা নিচ্ছে ৩০ টাকা। যদিও সরকারি তালিকা অনুযায়ী এ দূরত্বের ভাড়া হবে ১৯ টাকা। যা আগে ছিল ১৫ টাকা। মনিটরিংয়ের অভাবে আগেও পাঁচ টাকা বেশি আদায় করা হয়েছে। আর এখন বাড়তি ভাড়া নিচ্ছে ১১ টাকা। এই বাড়তি ভাড়া কঠোর মনিটরিংয়ের মাধ্যমে বন্ধ ও পাশাপাশি আইন অমান্যকারীদের শাস্তির আওতায় আনা গেলে এই ভাড়া যাত্রীদের বোঝা হয়ে দাঁড়াবে না। সরকার ডিজেলচালিত গাড়ির ভাড়া বাড়িয়েছে, কিন্তু গ্যাসচালিত গাড়ির ভাড়া নয়। মালিকপক্ষ বলেছে, গ্যাসচালিত গাড়িতে তারা আলাদা স্টিকার লাগিয়ে দেবে। প্রশাসনকে এই বিষয়টিতেও নজরদারি ও আইনের সঠিক প্রয়োগ করতে হবে।

নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানোর বিষয়টি আজ নতুন নয়। অস্বীকার করার উপায় নেই, দ্রব্যমূল্য আকাশছোঁয়া। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির আগে থেকেই নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। কারণ বিশ্লেষণে ব্যবসায়ীদের কাছে একই অজুহাত। কৃত্রিম সংকট, সরবরাহে ঘাটতি ও আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, সেই একই পুরনো কাসুন্দি। অসৎ ব্যবসায়ী, কালোবাজারি ও মুনাফালোভী সিন্ডিকেটের কারণে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়।

জনগণকে স্বস্তি ও সিন্ডিকেটমুক্ত বাজার তৈরি করতে সরকারকে আরো কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। কৃষকদের জন্য বাজার তৈরি করতে হবে, যেন ভোক্তারা সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে পণ্য কিনতে পারেন। অস্থিরতা শুরু হয় খুচরা বাজার থেকেই। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বাজারে প্রতিদিন মনিটর করা। যারা বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করবে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। টিসিবিকে জেলা-উপজেলা পর্যন্ত আরো সক্রিয় হতে হবে। বাজার সংকটে পড়লে দ্রুত পরিস্থিতি মোকাবেলার সক্ষমতা থাকতে হবে।

সরকারকে সারা বছর বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা চালু রাখতে হবে। নিত্যপণ্যের বাজারে যথাযথ নজরদারি ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে পণ্যের অহেতুক মূল্যবৃদ্ধি বন্ধ করতে হবে। দুর্নীতিবাজ অসৎ ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সাধারণ মানুষকেও দ্রব্যমূল্য সম্পর্কে সচেতন করতে হবে, গড়ে তুলতে হবে সামাজিক আন্দোলন।

বাজার কিংবা পরিবহন খাত সবই সিন্ডিকেটের মুঠোবন্দি। জনগণকে জিম্মি করে এরা তাদের অসৎ স্বার্থ উদ্ধার করে। এই মুনাফালোভী দুর্বৃত্তদের কাছে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নতুন আরেকটি অজুহাত হতে পারে। এদের কাছে সরকার পরাজিত হতে পারে না। সরকারকে আরো কঠোর হতে হবে। বন্ধ করতে হবে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য।

লেখক : সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ এবং সাবেক ছাত্রনেতা

[email protected]



সাতদিনের সেরা