kalerkantho

মঙ্গলবার । ১১ মাঘ ১৪২৮। ২৫ জানুয়ারি ২০২২। ২১ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

চলমান শিক্ষা ব্যবস্থাপনা এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন

এ কে এম শাহনাওয়াজ

১২ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



চলমান শিক্ষা ব্যবস্থাপনা এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন

এ দেশের চলমান শিক্ষা ব্যবস্থাপনার খোঁজ যাঁরা রাখেন তাঁরা এখন যে খবরটি পরিবেশন করতে যাচ্ছেন তা পড়ে কষ্ট পাবেন, হতাশ হবেন কিন্তু খুব বিস্মিত হবেন না। তার পরও মাঝেমধ্যে ক্ষণিকের জন্য হলেও বিস্মিত হতে হয়। যমুনা টেলিভিশনের অনলাইন ভার্সনের একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে গত ৮ নভেম্বর। বেশ টাটকা খবর।

বিজ্ঞাপন

খবরের শিরোনাম ‘এক শিক্ষকই নিচ্ছেন ষষ্ঠ-দশম শ্রেণির সব ক্লাস, পালন করছেন নৈশ প্রহরীর দায়িত্বও। ’ জানা গেল এই উন্নয়ন ও ডিজিটাল যুগে কোনো দূর-দূরান্তের চরাঞ্চল বা গ্রামে নয়, উপজেলা সদরের একটি সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের দশা এটি। স্কুলটি সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার জগন্নাথপুর সরকারি বালিকা বিদ্যালয়। রিপোর্টের সঙ্গে ক্লাসরুমের একটি ছবি ছাপা হয়েছে। বেশ ঝকঝকে পাকা কক্ষ। স্বাস্থ্যবিধি মেনে, মুখে মাস্ক পরে স্কুলড্রেসে মেয়েরা ক্লাস করছে। আর শিক্ষক ক্লাস নিচ্ছেন।

রিপোর্টের ভাষ্য অনুযায়ী এই বিদ্যালয়ে সাড়ে তিন শর বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী স্কুলে ৯ জন শিক্ষক থাকার কথা। কাগজে-কলমে আছেন তিনজন শিক্ষক। তাঁদের মধ্য থেকে একজন প্রেষণে চলে গেছেন ময়মনসিংহে, আরেকজন প্রশিক্ষণ নিতে গেছেন টিচার্স ট্রেনিং কলেজে। সুতরাং স্কুলে রয়েছেন সবেধন নীলমণি একজন শিক্ষক জয়ন্ত শেখর রায়। এই দায়িত্ববান শিক্ষক যথাসাধ্য চেষ্টায় স্কুলের দীপশিখা জ্বালিয়ে রেখেছেন। স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত এই শিক্ষককেই ক্লাস নিতে হচ্ছে। তাই দিনে একেক শ্রেণিতে দুটির বদলে একটি ক্লাস নিতে হচ্ছে। ২০১৮ সাল থেকেই নাকি স্কুলটির প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। সহকারী প্রধান শিক্ষকও নেই। হরফুন মৌলা জয়ন্ত রায়ই একা হাতে সব সামলাচ্ছেন। স্কুলে কোনো নৈশ প্রহরীও নেই। তাই শিক্ষক জয়ন্ত রায়কে সারা দিন স্কুলে ক্লাস নেওয়ার পর রাত ৯টা পর্যন্ত নৈশ প্রহরীর দায়িত্বও পালন করতে হচ্ছে।

আমি জানি না, উপজেলা সদরের একটি সরকারি স্কুলের দুর্দশা নিয়ে প্রকাশিত এই বিস্ময়কর রিপোর্ট পুরোটাই সত্য কি না। আমি সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব ও নিষ্ঠা নিয়ে প্রশ্ন তুলছি না। মাঝেমধ্যে সরকারি আমলা, জননেতা থেকে শুরু করে মন্ত্রী পর্যায় পর্যন্ত অনেককেই তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলতে শুনি ‘বাদ দেন পত্রিকার রিপোর্টের কথা—ওরা নিজেদের পছন্দমতো রিপোর্ট করে। ’

আমি অবশ্য ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও বন্ধুদের অভিজ্ঞতায় এমন অবহেলিত অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খবর জানি। বুঝতে পারি না একটি দেশ তার শিক্ষা ব্যবস্থাপনাকে নড়বড়ে রেখে কিভাবে সামগ্রিক উন্নয়ন প্রত্যাশা করতে পারে!

প্রাচীন ভারতে পঞ্চতন্ত্রের কাহিনির জন্ম। পঞ্চতন্ত্রের কাহিনির গল্পগুলো নির্মাণের পেছনে একটি প্রচলিত ইতিহাস রয়েছে। প্রাচীন ভারতের এক রাজা বুঝতে পেরেছিলেন তাঁর যতই ধন-সম্পত্তি থাক না কেন, রাজপুত্র যদি মূর্খ হয়, তবে সে রাজ্য চালাতে পারবে না। তাই অবাধ্য মূর্খ ছেলের শিক্ষার দায়িত্ব দিলেন একজন জ্ঞানী পণ্ডিতের ওপর। তিনি রাজপুত্রকে একেকটি গল্প শুনিয়ে তাঁর মধ্যে নীতিবোধ তৈরি করতে থাকলেন। এই সব গল্পের সংকলনই পঞ্চতন্ত্রের গল্প। প্রাচীন বাংলায় তিন ধরনের প্রাথমিক শিক্ষা ছিল। গুরুগৃহ, চতুষ্পাঠী এবং পাঠশালা। গুরুগৃহ ধারণাটিই এসেছে রাজপুত্র, মন্ত্রিপুত্রদের শিক্ষিত করার প্রেরণা থেকে। কারণ রাজারা জানতেন পুত্র শিক্ষিত না হলে রাজ্য চালাতে পারবে না। এর বাস্তব ঐতিহাসিক সত্যও রয়েছে। আট শতকের মাঝ পর্ব থেকে এ দেশে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পাল রাজবংশের শাসন শুরু হয়। প্রায় ৪০০ বছর স্থায়ী এই বংশের শাসনকাল ছিল সোনাফলা। পাল রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় শিক্ষা-সংস্কৃতির ব্যাপক বিকাশ ঘটেছিল বাংলায়। এরপর বাংলার শাসনক্ষমতা আসীন হন দক্ষিণ ভারত থেকে আসা ব্রাহ্মণ সেন বংশীয় রাজারা। তাঁরা অনুদার শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।   শতাধিক বছরের শাসনকালে সেন রাজারা শূদ্র অভিধায় এ দেশের সাধারণ মানুষকে কোণঠাসা করে রেখেছিলেন। এ সময় শিক্ষার অধিকার বঞ্চিত করা হয় বাঙালিকে। কিন্তু এ ধারার আচরণের ফল কখনো ভালো হয় না। মূর্খতা শুধু অন্ধকার নামায়। তাই ১২ শতকের শুরুতে বহিরাগত তুর্কি মুসলমানদের আক্রমণে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে সেনদের শাসনকাঠামো। মধ্যযুগের বহিরাগত মুসলমান শাসক এবং সুফি-সাধকরা শিক্ষার গুরুত্ব বুঝেছিলেন। ধর্মীয় প্রেরণাও তাঁদের শিক্ষা বিস্তারে উৎসাহিত করেছিল।

এসব ইতিহাসের শিক্ষা গ্রহণ করে এ যুগে আমাদের অনেক শাসকগোষ্ঠী আলোকিত হতে চায় না। ক্ষমতার মোহ তাদের বিবেচনাবোধে অন্ধকার নামায়। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখাটাই তাদের কাছে প্রধান মোক্ষ। তাই সব কিছু দলীয়করণ করে বলয়বন্দি করে ফেলতে চায়। তাদের ধারণা, কথার চাতুর্য দিয়েই বোধ হয় সব ঢেকে ফেলা যাবে। দলীয়করণে বন্দি নতজানু সার্টিফিকেটে শিক্ষিতজনও বিবেক বিক্রি করে ফেলেন দলীয় নেতৃত্বের কাছে। ফলে তাদের মধ্যে একরকম মূর্খতাই বাসা বাঁধে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাপনার করুণ হাল হওয়ার প্রধান কারণ এখানেই। দলীয়করণের ধারণায় বন্দি রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো কোনো পক্ষ উন্নয়নমুখী অনেক আশাজাগানিয়া কাজ করলেও শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত সাফল্যে পৌঁছতে পারে না। আমি শিক্ষা ব্যবস্থাপনার কথাই যদি বলি তো দেখব এ অঞ্চলের পরিচালকরা প্রায় সবাই কঠিন দলীয়বৃত্তে বন্দি মানুষ। দলীয় লাভালাভের কথা মাথায় রেখে যদি শিক্ষাকাঠামো তৈরি হয়, তবে সেখানে মুক্তধারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিকশিত হতে পারে না। মুক্তচিন্তা করা প্রকৃত শিক্ষিতজনেরই থাকা উচিত শিক্ষাঞ্চল পরিচালনার দায়িত্বে। কিন্তু দলীয়বৃত্তে বন্দি সরকারগুলো অনুজ্জ্বল হলেও দল থেকেই বিধায়ক নিয়োগ করেন। তাই ধুতরাগাছে পদ্ম ফোটানো যায় না।

জগন্নাথপুরের স্কুলটির দুর্দশা দেখে আমার মধ্যে একটি কৌতূহল তৈরি হয়েছে। আমি ভেবেছিলাম একজন আগ্রহী গবেষক যদি পাওয়া যেত, যিনি গ্রামগঞ্জে জরিপ করে আমাদের স্কুল-কলেজের দৈন্যদশার চালচিত্র উন্মোচন করবেন গবেষণা পদ্ধতি মেনে বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে। তেমন গবেষকের এমফিল বা পিএইচডির তত্ত্বাবধান আমি করতাম। আমার খুব দুঃখ হয় এই ভেবে যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এত পরিশ্রম করে দেশকে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু বেলাশেষে চারপাশ থেকে তিনি বোধ হয় কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা পাচ্ছেন না। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষার সব ক্ষেত্র যদি অরাজকতামুক্ত না হয়, রাজনৈতিক কূপমণ্ডূকতার বলয় যদি ভেঙে ফেলা না যায়, দুর্নীতি দুর্বৃত্তায়নের প্রতিবন্ধকতা যদি অপসারণ করা সম্ভব না হয়, তবে অন্তঃসারশূন্য হয়ে যাবে সব উন্নয়ন আয়োজন।

এই যেমন জগন্নাথপুর স্কুলের দশাটির কথাই যদি বলি, বছরের পর বছর একটি স্কুল প্রায় শিক্ষকবিহীন অবস্থায় ধুঁকে ধুঁকে চলছে, তাহলে প্রশ্ন জাগে এসব দুর্ভাগা ছাত্রী ও তাদের অভিভাবকদের পাশে কি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা দাঁড়িয়েছেন? স্থানীয় প্রশাসনের কি কোনো দায়িত্ব নেই? শিক্ষা কর্মকর্তা কি ঢাকার রথীদের কাছে আবেদন করেছেন? মহারথীদের কি সেদিকে দৃষ্টি দেওয়ার সুযোগ হয়েছে? আমরা মনে করি শিক্ষা ব্যবস্থাপনা পরিচালনার দায়িত্ব যদি শিক্ষিত, দৃঢ়চেতা মুক্তমনের মানুষদের ওপর অর্পিত না হয়, তাহলে প্রকৃত শিক্ষার বিকাশ ঘটানো সম্ভব হবে না।

আমি ২০১৬ সালে পর্তুগালের বিখ্যাত এভোরা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে বক্তৃতা করেছিলাম। সেখানে বলেছিলাম গ্রিস ও রোমের পতনের পর মধ্যযুগের ইউরোপ যখন শিক্ষার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েছিল তারও সহস্র বছর আগে থেকে শিক্ষাক্ষেত্রের উজ্জ্বল বিকাশ ঘটেছিল বাংলায়। ৯ শতকের দিকে ইউরোপে যখন চার্চকেন্দ্রিক প্রাথমিক শিক্ষার যাত্রা শুরু হয়, এরও প্রায় ২০০ বছর আগে বাংলায় বেশ কয়েকটি পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছিল। আমি লক্ষ করেছিলাম এই তথ্যে এভোরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গবেষকদের দৃষ্টিতে বিস্ময় ঝরে পড়েছিল। অনুভব করেছিলাম অমন দেশের মানুষ হিসেবে আমার মতো একজন শিক্ষকের মর্যাদা অনেক বেড়ে গিয়েছিল তাদের চোখে।

আমি ভেবে বিষণ্ন বোধ করি এমন ঐতিহ্য ধারণ করা একটি দেশের আজ শিক্ষার ক্ষেত্রে এতটা বিপন্নদশা দেখে! বহিরাঙ্গে চকচকে পোশাক পরে কি অন্তরের ক্ষত দূর করা যায়! এসব প্রশ্নের জবাব শুধু রাজনৈতিক সরকার ও রাজনীতিকদের কাছেই চাইতে পারি। আমরা এই সত্যটি বিশ্বাস করি, শিক্ষার প্রকৃত অগগ্রতি ছাড়া কোনো দেশের সামগ্রিক উন্নতি কখনো সম্ভব নয়।

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]



সাতদিনের সেরা