kalerkantho

বৃহস্পতিবার ।  ১৯ মে ২০২২ । ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৭ শাওয়াল ১৪৪৩  

কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে বাধা ও দেশীয় কৃষি উপকরণ শিল্প

আবু নোমান ফারুক আহম্মেদ

৫ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে বাধা ও দেশীয় কৃষি উপকরণ শিল্প

কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি এবং বর্তমান শ্রমশক্তির প্রায় ৪০.৬ শতাংশ মানুষ কৃষিতে নিয়োজিত। বাংলাদেশ এখন খোরপোশের কৃষি থেকে লাভজনক, উদ্বৃত্ত ও রপ্তানিযোগ্য কৃষিতে পদার্পণ করেছে। কৃষির বর্তমান উন্নতি টেকসই করার জন্য স্থানীয় পর্যায়ে কৃষি উপকরণ শিল্প স্থাপন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কৃষির প্রধান উপকরণ যেমন—সার, বীজ, বালাইনাশক ও কৃষি যন্ত্রপাতির ওপর বিদেশনির্ভরতা আমাদের উৎপাদনব্যবস্থাকে বিঘ্নিত করতে পারে, যার নেতিবাচক প্রভাব সমগ্র কৃষিতে পড়তে বাধ্য।

বিজ্ঞাপন

দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ক্রমহ্রাসমান কৃষিজমিতে খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হলে কৃষি উপকরণভিত্তিক স্থানীয় শিল্পের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো কৃষিপ্রধান এই দেশে এখন পর্যন্ত প্রধান প্রধান কৃষি উপকরণ উৎপাদনে দেশীয় শিল্প তেমন গড়ে ওঠেনি।

বাংলাদেশের কৃষিতে বিপুল পরিমাণে রাসায়নিক সার, বীজ, বালাইনাশক ও কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহৃত হয়। বালাইনাশক চাহিদার প্রায় শতভাগই বিদেশ থেকে আসে, যেখানে দেশীয় শিল্পের অবদান খুবই সামান্য। অথচ কৃষি উপকরণ শিল্পের মধ্যে পেস্টিসাইড বা বালাইনাশক শিল্প অন্যতম, যা ফসল উৎপাদন ও সংরক্ষণে অপরিহার্য। দেশে বর্তমানে চার শতাধিক কম্পানি বালাইনাশক আমদানি ও বিপণনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে বালাইনাশকের ব্যবহার প্রায় চল্লিশ হাজার মেট্রিক টন বা কিলোলিটার, যার বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট কম্পানিগুলো হয় সরাসরি মোড়কজাত বালাইনাশক আমদানি করে থাকে অথবা আমদানীকৃত বালাইনাশক দেশে মোড়কজাত করে বিক্রি করে। ফলে একদিকে যেমন পণ্যের দাম বেড়ে যায়, অন্যদিকে অনেক সময় পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না।

অসীম সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও নানা ধরনের জটিলতায় দেশে স্থানীয় বালাইনাশক শিল্পের বিকাশ ঘটেনি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় ২৩টি দেশীয় কম্পানি বিদেশ থেকে বালাইনাশকের প্রায় ২০টি সক্রিয় উপাদান আমদানি করে নিজস্ব ফর্মুলেশন প্লান্টে বালাইনাশক উৎপাদন করছে। এতে দেশের কৃষকদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্পন্ন বালাইনাশক নিশ্চিত করার পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে বালাইনাশকের রপ্তানি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে; কিন্তু বিদ্যমান নানা ধরনের আইন-কানুনের বেড়াজালে এসব স্থানীয় বালাইনাশক উৎপাদন শিল্পগুলো গতিশীল হচ্ছে না।

সাধারণত স্থানীয় বালাইনাশক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বালাইনাশকের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল (সক্রিয় ও সহযোগী উপাদান) বিদেশ থেকে আমদানি করে থাকে। বিদ্যমান আইনে একটি প্রতিষ্ঠান এসব উপাদান শুধু রেজিস্ট্রেশনে উল্লিখিত নির্দিষ্ট সোর্স বা উৎস থেকে আমদানি করতে বাধ্য থাকে। ফলে তারা অনেক সময় নিবন্ধিত উৎস থেকে উচ্চমূল্যে কাঁচামাল কিনতে বাধ্য হয়। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে যা মোটেও যৌক্তিক কিংবা ব্যবসাবান্ধব নয়। তাই প্রস্তাবিত আইনে কাঁচামালের গুণগত মান ঠিক রেখে আমদানির উৎস উন্মুক্ত করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের জন্য বিদ্যমান অনুরূপ একটি আইন অনুসরণ করা যেতে পারে। উল্লেখ্য, কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে সোর্স উন্মুক্তকরণের ফলে ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিগুলো দেশের ৯৮ শতাংশ চাহিদা মিটিয়ে প্রতিযোগিতামূলক দামে বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি দেশে ওষুধ রপ্তানিতে সক্ষম হয়েছে।

খ. দেশের বিপণনকারী কম্পানিগুলো বিদেশ থেকে বালাইনাশক আমদানি করতে পারলেও আইনগত সীমাবদ্ধতার কারণে স্থানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে কিনতে পারে না। এটি স্থানীয় বালাইনাশক শিল্পের একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। এ জন্য দেশীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্থানীয় প্রস্তুতকারক হিসেবে রেজিস্ট্রেশন ও স্বীকৃতি প্রদান করা জরুরি, যাতে তারা উৎপাদিত পণ্য অন্যান্য দেশীয় কম্পানির কাছে বিক্রি করতে পারে। সাধারণত কোনো একটি একক পণ্য অধিক পরিমাণে উৎপাদনের জন্য একটি শিল্প-কারখানা গড়ে তোলা হয়। কিন্তু উক্ত পণ্য যদি স্থানীয় কম্পানিগুলোর কাছে বিক্রি করা সম্ভব না হয়, তাহলে এ শিল্পকে লাভজনক করা সম্ভব নয়। বালাইনাশক উৎপাদনশিল্পের প্রসারের সঙ্গে বাজারজাতকরণের বিষয়টি বিশেষভাবে সম্পর্কযুক্ত। তাই স্থানীয় বালাইনাশক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে দেশের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কাছে সরাসরি বাজারজাতকরণের বাধাহীন নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন।

গ. বিদ্যমান বিধি অনুযায়ী কোনো নিবন্ধিত সংস্থা তিন বছরের মধ্যে কাঁচামাল আমদানি বা বালাইনাশক উৎপাদন না করলে উক্ত নিবন্ধন বাতিল হয়ে যায়। বিধিমালার এরূপ কঠিন শর্তাবলি শিথিল করা প্রয়োজন। কারণ নানা কারণে উক্ত সময়ের মধ্যে শিল্প-কারখানা স্থাপন করে পণ্য উৎপাদন করা সম্ভব না-ও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে নিবন্ধন নবায়নের সুযোগ রাখা প্রয়োজন।

ঘ. আমদানি করা বালাইনাশকের গুণগত মান যাচাই করার জন্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পরীক্ষা-নিরীক্ষার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বালাইনাশকের নিজস্ব পরীক্ষাগারে মান নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এ ছাড়া সরকারি নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা সরাসরি মান নিয়ন্ত্রণ পর্যবেক্ষণ করতে পারে। তাই দেশের চাহিদা ও উৎপাদনের নিরিখে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বালাইনাশক গ্রুপগুলোকে বিদেশ থেকে আমদানিতে নিরুৎসাহ করা যেতে পারে, যা ক্রমবর্ধমান এ শিল্পের বিকাশে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

ঙ. কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে বালাইনাশক উৎপাদনশিল্পের সক্ষমতা ও পরিধি বিস্তারের সুযোগ রয়েছে। নীতি সহায়তা পেলে মান ও মূল্যের বিচারে বাংলাদেশে উৎপাদিত বালাইনাশক আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশে সক্ষম। ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে বাংলাদেশে উৎপাদিত বালাইনাশক বহির্বিশ্বে রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে। এ জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বিত নীতি ও পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি বিদ্যমান জটিলতা নিরসনে আন্তরিক উদ্যোগ গ্রহণ খুবই জরুরি। এ ক্ষেত্রে ওষুধশিল্পের ন্যায় বালাইনাশকের রপ্তানি নীতিমালা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের জন্য বালাইনাশকের নিরাপদ ব্যবহার অপরিহার্য। দেশের অনেক বালাইনাশক কম্পানি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিত অতি উচ্চমাত্রা (শ্রেণি-১এ), উচ্চমাত্রা (শ্রেণি-১বি) ও মাঝারি মাত্রার (শ্রেণি-২) বিষক্রিয়ার শ্রেণিভুক্ত বালাইনাশক আমদানি করে থাকে। অনিয়ন্ত্রিতভাবে এসব ঝুঁকিপূর্ণ বালাইনাশক ব্যবহারে মাটি, পানি, বাতাস ও ফসলে বিষক্রিয়ার অবশিষ্টাংশ থাকার সুযোগ থাকে। এজাতীয় বালাইনাশকের আমদানি ও ব্যবহার ধারাবাহিকভাবে কমিয়ে আনা প্রয়োজন। অন্যদিকে জৈব বালাইনাশক কিংবা অপেক্ষাকৃত অধিক নিরাপদ শ্রেণি-৩-ভুক্ত বালাইনাশকের স্থানীয় উৎপাদনে সরকারি নীতিগত সহযোগিতা অপরিহার্য। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আগামী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ প্রাকৃতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

বালাইনাশকের নাম শুনলেই আমরা শহুরে মানুষরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। কিন্তু কোনো দেশেই বালাইনাশক ছাড়া ফসল উৎপাদিত হয় না; বরং অনেক উন্নত দেশে ফসলের জমিতে নিরাপদ পদ্ধতিতে অনেক বেশি পরিমাণ বালাইনাশক ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ফসলের জমিতে হেক্টরপ্রতি বালাইনাশক ব্যবহারে বাংলাদেশের অবস্থান ৩০তম। চীনে প্রতি হেক্টর ফসলের জমিতে গড়ে বালাইনাশক ব্যবহৃত হয় প্রায় ১৩ কেজি। জাপান, ইসরায়েল ও দক্ষিণ কোরিয়ায় এর পরিমাণ প্রায় ১২ কেজি এবং নিউজিল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও মালেশিয়ায় প্রায় আট কেজি। অন্যদিকে বাংলাদেশে প্রতি হেক্টর ফসলের জমিতে বালাইনাশকের ব্যবহার হয় প্রায় দুই কেজি। আমাদের দেশে উন্মুক্ত চাষাবাদ পদ্ধতিতে বিস্তীর্ণ এলাকায় ক্রমাগত একই ফসলের চাষাবাদের কারণে বালাইয়ের প্রাচুর্যতা বেশি। তাই এখানে বালাইনাশক ব্যতীত ফসল উৎপাদন প্রায় অসম্ভব। এটা সত্য যে অনিয়ন্ত্রিত বালাইনাশক ব্যবহারে পরিবেশ, মানবস্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে নিয়ম মেনে নিরাপদ বালাইনাশক ব্যবহারে ক্ষতির মাত্রা কমিয়ে আনা সম্ভব।

দেশে প্রতিবছর বালাইনাশক আমদানিতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অপচয় হয়। স্থানীয় বালাইনাশক উৎপাদনের মাধ্যমে যা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। আবার বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। এ ছাড়া দেশে উৎপাদিত বালাইনাশকের গুণগত মান সর্বদা মনিটরিংয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত করা যায়। ফলে কৃষক গুণগত মানসম্পন্ন বালাইনাশক দিয়ে কার্যকরভাবে বালাই দমন করতে পারবে। দেশে উৎপাদনের ফলে ফসলের সুরক্ষায় জরুরি আপৎকালীন বালাইনাশকের সরবরাহ নিশ্চিত করা যাবে। শুল্কমুক্ত রেয়াত সুবিধায় আমদানীকৃত কাঁচামালের মাধ্যমে উৎপাদিত বালাইনাশকের উৎপাদন খরচ কম হবে বিধায় কৃষক সাশ্রয়ী মূল্যে বালাইনাশক ক্রয় করতে পারবে। এতে ফসলের উৎপাদন খরচ কমবে এবং কৃষকের আয় বৃদ্ধি পাবে। দেশীয় বালাইনাশক শিল্পের বিকাশে দেশে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

আমাদের বালাইনাশকশিল্প সরাসরি বিদেশনির্ভর, যা আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এক বড় হুমকি। বাংলাদেশের বালাইনাশকশিল্পের যথাযথ বিকাশের মাধ্যমে গুণগত মানসম্পন্ন বালাইনাশক উৎপাদন এবং রপ্তানি সক্ষমতা অর্জন সময়ের ব্যাপার মাত্র। এ জন্য সরকারি নীতি সহায়তার পাশাপাশি বিদ্যমান বিধি-বিধান পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা সংযোজনের মাধ্যমে আধুনিক ও যুগোপযোগী পেস্টিসাইড নীতিমালা প্রণয়নপূর্বক সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আন্তরিক উদ্যোগ একান্ত কাম্য।

লেখক : অধ্যাপক, উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগ

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়



সাতদিনের সেরা