kalerkantho

শনিবার । ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৪ ডিসেম্বর ২০২১। ২৮ রবিউস সানি ১৪৪৩

বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্পের মান

আবু তাহের খান

২৯ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্পের মান

বাংলাদেশে বৈদেশিক সহায়তার ধরন, বৈশিষ্ট্য ও ফলাফল নিয়ে এ পর্যন্ত বহু গবেষণা পরিচালিত হলেও সেগুলোর সারবক্তব্য প্রায় কখনোই সাধারণের মধ্যে খুব একটা প্রচার পায়নি। তবে গড়পড়তা মানুষের মধ্যে এসব সহায়তার প্রভাব এবং কার্যকারিতা নিয়ে এক ধরনের মিশ্র অনুভূতি ও প্রতিক্রিয়া রয়েছে। একটি বড়সংখ্যক মানুষই মনে করে, বৈদেশিক সহায়তা পেলে তা নেওয়াই উচিত এবং তা যত বেশি নেওয়া যায়, ততই ভালো। এমনকি রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের প্রচারণায় এমনটিই দাবি করার চেষ্টা করে যে যারা যত বেশি বৈদেশিক সাহায্য জোগাড় করতে পারে, বিদেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক তত ভালো এবং বৈদেশিক সাহায্যের পরিমাণ কমে গেলে বিরোধী রাজনীতিকরা একে ক্ষমতাসীন দলের ব্যর্থতা হিসেবেও তুলে ধরার প্রয়াস পান। পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের সহায়তা প্রত্যাখ্যান করার পর প্রথম দিকে বিরোধী দলসহ অনেকেই একে ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে অভিহিত করার চেষ্টা করে। অবশ্য এদের একটি বড় অংশই পরবর্তী সময়ে তাদের মত পরিবর্তন করে।

অন্যদিকে বৈদেশিক সাহায্যের নেপথ্যের নানা হিসাব-নিকাশ ও কার্যকারণ সম্পর্কে যাঁরা টুকটাক খোঁজখবর রাখেন তাঁরা ভালোভাবেই জানেন, এসব সাহায্যের একটি বড় অংশই দাতারা প্রদান করে তাদের নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থে এবং তা থেকে বাংলাদেশ খুব একটা লাভবান হয় না। বরং বহু ক্ষেত্রে এসব সাহায্য গলার কাঁটা বা ফাঁস হয়ে দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে তা উপকারের পরিবর্তে উল্টো ক্ষতির কারণ হওয়ার মতো ঘটনাও রয়েছে। আর ঋণভিত্তিক সাহায্য নিয়ে তা পরিশোধের দায় জনগণের ঘাড়ে চাপিয়ে প্রতিবছরের বাজেটে সাধারণের ওপর বাড়তি কর আরোপের যেসব ঘটনা ঘটে, সাধারণ মানুষকে তো তা বুঝতেই দেওয়া হয় না। এমনকি বহু বড় দাতা সংস্থার কর্মীরা তাঁদের চাকরিবাকরি ও পরামর্শ সেবা (কনসালট্যান্সি) টিকিয়ে রাখার জন্যও এসব সাহায্য প্রদান করে থাকেন। ইউএনএইচসিআরের ব্যাপারে তো প্রকাশ্য অভিযোগই রয়েছে যে তাঁরা রোহিঙ্গাদের দীর্ঘ সময় ধরে শরণার্থী হিসেবে পেতে এবং সে অনুযায়ী তাদের জন্য সাহায্য অব্যাহত রাখতে চান। বাংলাদেশের বৃহত্তর স্বার্থের বিপরীতে দাঁড়িয়ে বিশেষ উদ্দেশ্যে রেলপথ সংকুচিত করে ফেলার পরামর্শ একসময় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও বিশ্বব্যাংক মিলেই প্রদান করেছিল। দাতাদের এসব হীন সংশ্লিষ্টতার বিষয়গুলো এ দেশে দীর্ঘকাল ধরে চলে এলেও নানা শ্রেণি ও গোষ্ঠীর স্বার্থে এগুলো বেশ ভালোভাবেই টিকে আছে এবং শিগগিরই তা থামবে বলেও মনে হয় না।

করোনাজনিত জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় এমন কিছু বৈদেশিক সহায়তাপুষ্ট প্রকল্প সম্প্রতি দেশে গ্রহণ করা হয়েছে, যেগুলোর গুণাগুণ ও ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ রয়েছে। এগুলোর কোনো কোনোটির বাস্তবায়ন পর্যায়ের নানা অনিয়ম, অসংগতি ও অপ্রাসঙ্গিকতার তথ্য এরই মধ্যে মূলধারার গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। আর সেসব তথ্য যাচাই-বাছাই ও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণান্তে দেখা যাচ্ছে যে এসব কভিড সহায়তা প্রকল্পের একটি বড় অংশজুড়েই রয়েছে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জন্য যানবাহন ও অন্যান্য আয়েশি সামগ্রী ক্রয়, পরামর্শ সেবা এবং বিভিন্ন আঙ্গিকের পরিচালন ব্যয়, যেসবের সঙ্গে করোনা রোগীর চিকিৎসা, চিকিৎসা উপকরণ সংগ্রহ বা চিকিৎসা গবেষণার কোনো সম্পর্ক নেই, কিন্তু করোনার মতো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলার বিষয়টি সামনে রেখে প্রকল্পগুলো যখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের জন্য পেশ করা হয়, তখন তারাও হয়তো সেগুলো অতটা যাচাই-বাছাই করে দেখেনি। আর সেই সুযোগে প্রকল্প উপস্থাপনকারী কর্মকর্তাদের খায়েশমতো এমন অনেক কিছুই সেখানে ঢুকিয়ে নেওয়া হয়েছে, যা করোনা রোগীর কোনো উপকারে না এলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মনোবাসনা পূরণে যথেষ্টই সহায়ক হয়েছে।

অন্যদিকে বিভিন্ন দুর্যোগ-দুর্বিপাকে এজাতীয় দাতারা সাধারণত দেখাতে চায় যে সমস্যাগ্রস্ত দেশকে সাহায্যদানে তারা দ্রুত এগিয়ে এসেছে। সরকার বা জনগণও তা দেখে যথেষ্টই প্রীত হয়, কিন্তু সে সাহায্যের কতটা কাজে আসে আর কতটা নানা পর্যায়ে ভাগাভাগি হয়ে যায়, তার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ কখনোই জনগণের প্রীতবোধের সঙ্গে মিলল কি না তা খতিয়ে দেখা হয় না। তবে পত্রপত্রিকায় এসব প্রকল্পের নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার খবর প্রকাশিত হওয়ার পরই শুধু কিছুটা খোলাসা হয় যে, যেসব উদ্দেশ্য ও কাজের কথা বলে এসব প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, বাস্তবে সেসব লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনে তা কোনো কাজে আসছে না। এর পাশাপাশি অত্যন্ত মনঃকষ্টের সঙ্গে লক্ষ করতে হয় যে প্রায় কোনো উপকারেই না আসা এ প্রকল্পগুলোতে দাতাদের কাছ থেকে অর্থের জোগানটি গ্রহণ করা হয় ঋণ হিসেবে, অনুদান হিসেবে নয়। অর্থাৎ এ সহায়তা জনগণের কোনো কাজে না এলেও তাদেরকে তা সুদ-আসলেই পরিশোধ করতে হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে পত্রিকায় প্রকাশিত খবর থেকে দেখা যায় যে বিশ্বব্যাংকের ঋণের টাকায় করোনা চিকিৎসার জন্য কেনা যন্ত্রপাতি, সরঞ্জাম ও অন্য উপকরণাদি বিমানবন্দরে, হাসপাতালের গুদামে ও অন্যান্য জায়গায় অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থেকেছে। পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ বৈদেশিক সহায়তাপুষ্ট কভিড চিকিৎসাসংক্রান্ত প্রকল্পগুলোতেই এ ধরনের দুর্নীতি সবচেয়ে বেশি হয়েছে। অন্যদিকে প্রকাশিত এসব তথ্য থেকে এটিও প্রমাণিত হয় যে উল্লিখিত এই প্রকল্পগুলো যথেষ্ট যাচাই-বাছাই ও সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়াই যেমন গ্রহণ করা হয়েছে, তেমনি বাস্তবায়ন পর্যায়ে দুর্নীতির সুযোগ ও অনিয়ম সাধনের জন্য সচেতনভাবে ফাঁকফোকর রেখেই প্রকল্পগুলো প্রণয়ন করা হয়েছে।

আগামী অন্তত দু-তিন বছর বাংলাদেশকে করোনার সঙ্গে বসবাস করেই কাটাতে হবে বলে মনে হয়। আর এ সময়ের মধ্যে দাতারা নিশ্চয়ই আরো বেশ কিছুসংখ্যক করোনা সহায়তা প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে আসবে। সে ক্ষেত্রে দাতা সংস্থাগুলোকে পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাই ও উপযুক্ত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়া কোনো প্রকল্প গ্রহণ করা উচিত হবে না। কারণ শেষ পর্যন্ত এ অর্থ বাংলাদেশের জনগণকেই পরিশোধ করতে হবে। কারণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যেহেতু তা ঋণ। জনগণের নামে আনা এসব ঋণ শেষ পর্যন্ত জনগণকেই তো পরিশোধ করতে হবে। আমরা করোনা থেকে যেমন মুক্তি চাই, তেমনি বৈদেশিক সাহায্যের অপ্রয়োজনীয় ফাঁদ থেকেও রেহাই পেতে চাই। আর সাহায্য নিতে হলে ততটুকুই চাই, যতটুকু আমাদের কাজে আসবে এবং অবশ্যই তা জনগণকে জানিয়ে নিতে চাই।

লেখক : পরিচালক, ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সেন্টার, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ; সাবেক পরিচালক, বিসিক, শিল্প মন্ত্রণালয়



সাতদিনের সেরা