kalerkantho

শনিবার । ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৪ ডিসেম্বর ২০২১। ২৮ রবিউস সানি ১৪৪৩

শক্ত একটা ভিত্তি প্রয়োজন

এ কে এম শাহনাওয়াজ

২৯ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



শক্ত একটা ভিত্তি প্রয়োজন

আমরা যারা ইতিহাস থেকে সত্য ধারণ করতে চাই। মুক্তিযুদ্ধের মহান স্মৃতি যাদের বুকের ফটোপ্লেটে এখনো উজ্জ্বল। দলপ্রেম নয়, দেশপ্রেম যাদের ধমনিতে। সুবিধাবাদ যাদের আকর্ষণ করতে পারেনি, তারা দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে কলুষমুক্তরূপে দেখতে চায়। আওয়ামী লীগ সরকারের দক্ষতায় দেশের অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক উন্নয়ন তাদের আমোদিত করে। তারা দেখতে পায় তেমন কোনো রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ ছাড়াই আওয়ামী লীগ সরকারের লক্ষ্য পূরণের সুযোগ রয়েছে। তবে শঙ্কা সুশাসনের অভাব এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্বৃত্তায়ন সব অর্জনকে না নড়বড়ে করে দেয়! দূরদর্শী আওয়ামী লীগ ও সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা তা বুঝতে পেরেছেন। তাই অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে নিজ ঘর থেকেই শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছিলেন। কিন্তু এ পথে সাফল্য পাওয়া খুব সহজ কথা নয়।

এই সরকারের শুভার্থী হিসেবে আমাদের ভেতর কিছু শঙ্কার কালো মেঘ জমাট বাঁধছে। বারবার আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব ও সরকারের পরিচালকরা দলীয়বৃত্তে আটকে গিয়ে মুদ্রার দুটি পিঠই কি দেখতে পাচ্ছেন? কারণ চারপাশে নানা পেশাজীবী ধামাধরা চাটুকারের সংখ্যা বাড়ছে। প্রকৃত সংকট তারা সরকারপ্রধানের দৃষ্টি থেকে সরিয়ে রাখতে চায়। অন্যদিকে ক্ষমতা ও শক্তির মোহে নানা খানাখন্দ কি দৃষ্টি এড়িয়ে যাচ্ছে? পাহাড়ে ওঠা কঠিন—তবে স্বস্তি, এই কাঠিন্য অনেকটাই জয় করতে পারছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁর দৃঢ় নেতৃত্বে। কিন্তু মুহূর্তের ভুলে বা বিভ্রান্তিতে পতন কিন্তু এক লহমায় হয়ে যেতে পারে। আমার এক স্কুল শিক্ষক বলতেন, আত্মম্ভরিতা মানুষকে অন্ধ করে দেয়।

দেশ উন্নয়নের উপরিকাঠামোর চাকচিক্য মোহাবিষ্ট করে ফেললে ভয়ংকর অন্ধত্ব পেয়ে বসতে পারে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা কি অন্তরের সংকট অনুভব করতে পারছেন? নিত্যপণ্যের অনিয়ন্ত্রিত বাজার। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর ঠুঁটো জগন্নাথ দশা, সব কিছু প্রান্তিক মানুষের দুর্দশার সঙ্গে এই কষ্টের উত্তাপ মধ্যবিত্তের গায়েও এখন আঁচড় দিচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা দেখে মনে হচ্ছে না মানুষের দুর্দশা লাঘবে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে সরকার।

করোনা মহামারি তো সবার জন্যই দুঃসহ অভিজ্ঞতা। দীর্ঘস্থায়ী এই সংকটে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সমাজজীবনে কয়েকটি অবধারিত সংকট দেখা দেবে তা সামান্য দূরদর্শিতা দিয়ে বোঝা যায়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কোনো পূর্বপ্রস্তুতি যেন সরকার পক্ষের নেই। ২৬ অক্টোবরের কালের কণ্ঠে প্রকাশিত রিপোর্টে দেখা গেল এক রাজশাহী জেলায়ই করোনাকালে বাল্যবিবাহ হয়ে গেছে ছয় হাজারের বেশি। সারা দেশের পরিসংখ্যান নিলে তা কোথায় দাঁড়াবে ভেবে বিপন্ন বোধ করছি। অথচ বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে আইন রয়েছে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীসহ স্থানীয় প্রশাসন রয়েছে। তৃণমূল পর্যন্ত জনপ্রতিনিধি রয়েছেন। কিন্তু কী লাভ হচ্ছে!

বাল্যবিবাহের এই হিড়িক সমাজ বাস্তবতারই প্রকাশ। প্রান্তিক মানুষের অর্থনৈতিক দুর্দশার এক ধরনের প্রকাশ। দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। কায়ক্লেশে যাঁরা সন্তানকে পড়াতেন তাঁরা ক্ষতি পোষাতে পাশে সরকারকে পাননি। যেখান থেকে তাঁরা নির্ভরতা পাবেন সুদিনের অপেক্ষা করার। অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি সামাজিক অবক্ষয়ের বিরূপ প্রভাব তো রয়েছেই। ফলে অসহায় অভিভাবক সন্তানকে বাল্যবিবাহ দিয়ে নিজেদের যেন রক্ষা করতে চান। সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো উজ্জীবিত থাকলে সামাজিক সংকট মোকাবেলা করা যেত। নৈতিকতা ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এসব সংগঠন এখন অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। দেশ উন্নয়নের এই যাত্রাপথে দেশের উপরিকাঠামোর নিচের অংশটি যদি অস্বীকার করি, তাহলে দুর্গতি এড়াব কেমন করে।

ছাত্ররাজনীতির বিষফোড়ার সঙ্গে নানা রকম সন্ত্রাস এ দেশে নতুন নয়। যখন থেকে ছাত্ররাজনীতি অঙ্গ বা সহযোগী যে নামেই হোক, মূল দলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, তখন থেকে ক্যাম্পাসে রাজনীতির শক্তিতে খুনাখুনির যাত্রা শুরু হয়েছে। একসময় তো ছাত্রশিবিরের রগকাটা রাজনীতির বিভীষিকা ছড়িয়ে ছিল, বিশেষ করে রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই দলটি জামায়াতে ইসলামীর অঙ্গ। তাদের রগকাটা ইমেজ বেশ মানিয়ে গিয়েছিল। কারণ মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতের হিংস্র চেহারা আমরা ভুলতে পারি না। সুতরাং এই দলটির অঙ্গ তো আর ভিন্ন আচরণ করবে না। অন্যদিকে রাজনীতিকে ‘ডিফিকাল্ট’ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েই তো জিয়াউর রহমান রাজনীতি ও সরকার পরিচালনা করেছিলেন। অস্ত্র আর অর্থ তুলে দিয়েই তো ছাত্রদলের যাত্রা শুরু করিয়েছিলেন তিনি। সে সময়েও তো খুনাখুনি কম হয়নি। আর এই দলের বাইপ্রডাক্টই তো ছিল এরশাদের ছাত্রসমাজ। তাই অস্ত্রচর্চা এরাই বা কম করবে কেন!

মানুষ তো সুন্দরের স্বপ্ন বুনতেই পছন্দ করে। আশা নিয়েই নাকি মানুষের বাঁচা। আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর মানুষ শুভ প্রত্যাশা কিছুটা করেছিল। ভেবেছিল ঐতিহ্যবাহী দল ছাত্রলীগ। যার বয়স আওয়ামী লীগের চেয়েও বেশি। নানা গৌরবময় আন্দোলন-সংগ্রামে যুক্ত থেকে নিজের উজ্জ্বল ঐতিহ্য গড়েছে দলটি। সেই গৌরবের ছাত্রলীগে বেড়ে ওঠা আজকের আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতারা দলে ও সরকারে থেকে একটি শোভন ছাত্ররাজনীতির দীক্ষা দেবেন, এটিই প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের, এ যুগে এসে ছাত্রলীগকে সেই মার্জিতরূপে আমরা দেখতে পাইনি। ছাত্ররাজনীতি ষণ্ডাতন্ত্রে আটকে যাওয়ায় ক্যাম্পাসে মেধাবীরা রাজনীতিবিমুখ হয়েছে। অর্থশক্তি আর পেশিশক্তির মোহে ছাত্ররাজনীতির ক্ষমতাসীন তরুণরা আসক্ত হয়ে পড়েছে। সুস্থ রাজনীতি চর্চা না থাকায় কখনো শাসন ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য, আবার কখনো শাসন ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য বড় রাজনৈতিক দলগুলো ছাত্ররাজনীতির নামে তরুণদের দলের লাঠিয়াল বানিয়েছে। এর পরিণতি শেষ পর্যন্ত ভালো হতে পারে না।

আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের একটি সমস্যা আমি দেখতে পাই। তাঁরা দেশের মানুষকে বোকা ভাবতে পছন্দ করেন। তাই এমন সব কথা বলেন, যা আসলে সচেতন মানুষকে বিরক্তই করে। এই যেমন আবরার হত্যাকাণ্ডের পর আওয়ামী লীগ নেতারা বলতেন, এটি নাকি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। তাই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর দায় ছাত্রলীগ নেবে না। এই ছেলেদেরও দুর্ভাগ্য, আওয়ামী লীগ নিজ ঘর ঠিক রাখতে চায়। তাই অপকর্মের জন্য এরা বলি হলেও নেতৃত্বের কিছু যায়-আসে না। তাই এঁদের গ্রেপ্তার করিয়ে আদালতের হাতে দিয়ে তা নিরপেক্ষতার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হিসেবে প্রচার করতে পারবে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সব ক্যাম্পাসেই যে ছাত্রলীগ অনেকটা বখাটে হয়ে গেছে এই সত্য তো তারা স্বীকার করতে চাইছে না। এখানেই আমাদের আশঙ্কার জায়গা।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের হল খুলেছে। এখন কি নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন? দলীয় নেতারা ও সরকার কি এখন মন্দ রাজনীতির প্রভাবমুক্ত সুস্থধারার ক্যাম্পাস গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। এই যে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে সাধারণ ছাত্রদের ছাত্রলীগ এক রকম জিম্মি করে রাখত, তা কি কেন্দ্রীয় নেতারা জানেন না? মিছিলে না গেলে, ছাত্রলীগের বড় ভাইদের আদেশ না শুনলে বা ভিন্ন মত প্রকাশ করলে তাঁদের যে গেস্টরুমে বা তথাকথিত টর্চার সেলে নিপীড়ন করা হতো। যেখানে হল প্রশাসন প্রায়ই প্রতিবিধান না করে অক্ষমতা প্রকাশ করে যেত এ কথা কি কারো অজানা? নেতারা উচ্চাসনে বসার কারণে যদি না-ই দেখতে পান, তবে এত সব গোয়েন্দা সংস্থা কী রিপোর্ট দেয়! নাকি দাপট দেখিয়ে চলার মধ্যেই বীরত্ব দেখছে। বাহবা দিচ্ছে!

আওয়াজটা যদিও পুরনো, তবে আবরার হত্যার পর আবার বুয়েট থেকে নতুন করে শুরু হয়েছিল যে ক্যাম্পাসে সাংগঠনিক ছাত্ররাজনীতি বন্ধ হোক। যেকোনো সচেতন মানুষ ও ভুক্তভোগীরা বলবেন, দলীয়বৃত্তে বন্দি ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতি সব শাসন যুগে ক্ষমতাসীনদের উপকারে লাগলেও শিক্ষার স্বাভাবিক ও কাঠামোগত উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করেছে। এতে সাধারণ্যে অস্বস্তি যেমন তৈরি হচ্ছে, ক্ষোভও বাড়ছে তেমনি। এতে দল ও দলীয় সরকার অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একটি খুব অদ্ভুত কথা সুবিধার স্রোতে ভাসা রাজনীতিকরা বলেন, ছাত্ররাজনীতি না করলে নাকি রাজনীতির ট্রেনিং পাওয়া যায় না। তাই ছাত্ররাজনীতি না থাকলে ভবিষ্যৎ রাজনীতির হাল ধরবে কারা।

তাহলে রাজনীতির প্রশিক্ষণ পাওয়া যে দলীয় ছাত্রসংগঠনগুলোর পরিচয় আমরা পাচ্ছি তাতে ভবিষ্যৎ রাজনীতির হাল ধরে এরা খুনির পৃষ্ঠপোষকতা করবে, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি আর কমিশন বণিকদের আশ্রয়দাতা হবে। দুর্নীতি আর সন্ত্রাসের অভয়ারণ্য হয়ে যাবে দেশ।

এসব অপসংস্কৃতি যদি বন্ধ না হয়, তবে বিশ্ববিদ্যালয় তার সৌন্দর্য ফিরে পাবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি, প্রো-ভিসি বা ট্রেজারার নিয়োগে যদি দল আনুগত্যের বিচারে না গিয়ে পাণ্ডিত্যের বিচার করা না হয়, স্খলন চলতেই থাকবে। একজন সুশিক্ষিত দৃঢ়চেতা দল নিরপেক্ষ ভিসি আপন যোগ্যতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক নেতৃত্ব যেমন দিতে পারেন, তেমনি দক্ষ প্রশাসকের ভূমিকায়ও সফল হন। নানা তদবিরে আসা দুর্বল ভিসিদের দশা তো আমরা দেখছিই। বিদগ্ধ পণ্ডিত জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী স্যারের মতো ভিসিরা ব্যর্থ হননি। কারো দয়া-দাক্ষিণ্যের পেছনে তাঁদের ছুটতে হয়নি। এখন প্রতিষ্ঠানটি এমনভাবে ভেঙে ফেলা হয়েছে যে ভিসির দায়িত্ব নেওয়ার জন্য এ সময়ের একজন জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীকে রাজি করানো কঠিন হবে।

এসব বাস্তবতা সামনে রেখে উন্নয়নের উপরিকাঠামোয় মোহাবিষ্ট হলে চলবে না। শিকড়কে তাজা না রেখে কোনো সাফল্যই শেষ আলো দেখাতে পারে না।

 

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]



সাতদিনের সেরা