kalerkantho

বুধবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ১ ডিসেম্বর ২০২১। ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩

দিল্লির চিঠি

মোদিবিরোধী শিবিরের চিত্র স্পষ্ট নয়

জয়ন্ত ঘোষাল

২৫ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



মোদিবিরোধী শিবিরের চিত্র স্পষ্ট নয়

স্কুলের ইতিহাস বইয়ে পড়েছিলাম, কোনো একটি সাম্রাজ্যের উত্থান হলে সেই সাম্রাজ্য একদিন চরম শিখরে আরোহণ করে। তারপর একদিন সেই সাম্রাজ্যের পতনও হয়। এ হলো ইতিহাসের নিয়ম। শুধু তো সাম্রাজ্য নয়, আজকের গণতন্ত্রেও কত রাজা এলো! কত রাজা গেল! আমজনতাই শুধু ইতিহাসের অতন্দ্রপ্রহরী। মানুষ হলো ধ্রুবক, চিরন্তন সত্য।

২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি এলেন দিল্লির মসনদে। এ তো আগমন নয়, যেন ছিল আবির্ভাব! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে রকম জেমস বন্ড এসেছিলেন। হতাশাক্লিষ্ট ব্রিটেনবাসীর প্রয়োজন ছিল এক জেমস বন্ডের। ঠিক যে রকম ভারতে সত্তরের দশকে চূড়ান্ত আর্থিকসংকট, বেকারির মধ্যে বলিউডের মায়াবাজারে অবতীর্ণ হয়েছিলেন অ্যাংরি ইয়াংম্যান অমিতাভ বচ্চন। নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতাসীন হওয়ার পর মনে হয়েছিল মনমোহন সিংয়ের ১০ বছরের নীতি পঙ্গুতার বিদায়, বিদায় হলো দুর্নীতি, এবার এলো ‘আচ্ছে দিন’।

২০১৪ সালের পর সাত বছর অতিবাহিত হতে চলেছে। এবার আসছে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন। তার মাঝখানে আছে বেশ কয়েকটা রাজ্যে নির্বাচন। বিশেষত উত্তর প্রদেশ, যে উত্তর প্রদেশ ‘বিজেপির হৃদয়পুর’ বলে পরিচিত। খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে সেখানে বিজেপির যোগী আদিত্যনাথের সরকার থাকে কি না থাকে! এটা অনস্বীকার্য যে মোদির ২০১৪ সালের যে ‘ব্র্যান্ড ইকুইটি’, ২০২৪ সালে তা অবক্ষয়ের শিকার। বেশ কয়েকটা জনমত সমীক্ষাকারী সংস্থা তারা দেশে এবং বিদেশে সমীক্ষা করে জানাচ্ছে যে নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তা শতকরা ৫০ ভাগেরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নরেন্দ্র মোদি এ ব্যাপারে খুব সচেতন যে জনপ্রিয়তা কখন বাড়ছে, কখন কমছে। এসব ব্যাপারে তাঁর নিজস্ব টিম আছে, যাঁরা সারাক্ষণ এ ব্যাপারে  সমীক্ষা করেন এবং গবেষণা চালাতে থাকেন।

নরেন্দ্র মোদি এবং তাঁর সেনাপতি অমিত শাহ ভেবেছিলেন যে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে হয়তো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব হবে। যদি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব হতো, তাহলে কিন্তু আজ গোটা দেশেই পরিস্থিতিটা অন্য রকম তৈরি হতে পারত। মনে করুন যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে হেরে গেছেন। তাহলে আজ এই মুহূর্তে উত্তর প্রদেশে নির্বাচনের আগে মোদি এবং অমিত শাহর দল একটা ভৈরব হরষে, তাঁর আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে নির্বাচনী প্রচারে নামতে পারতেন। যে পশ্চিমবঙ্গে যেখানে কোনো দিন বিজেপি সরকার গঠন করতে পারেনি, যেখানে ছিল একদা দীর্ঘ কমিউনিস্ট শাসন, যে পশ্চিমবঙ্গে জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্মস্থান, সেই পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ক্ষমতা দখল, সেটা একটা নতুন আলেখ্য তৈরি করতে পারত বিজেপির ইতিহাসে। তাকে মূলধন করে নরেন্দ্র মোদির ‘দিদি’, ‘দিদি’ ডেকে যে বিধানসভার প্রচার তা অনেক বেশি কার্যকর হতে পারত। 

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিতে চাইছেন বিজেপির অনেক এমএলএ। এ রকম একটা পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে বিরোধী একটা ঐক্যের চেহারা নিচ্ছে এবং মমতার অগ্রসরের একটা পথনির্দেশিকা দেখা যাচ্ছে।

একটা জিনিস খুব স্পষ্ট যে দেশের অর্থনীতির অবস্থা খুব খারাপ। চাকরিবাকরি নেই, কর্মসংস্থানের সেই রকম সুযোগ নেই, কর্মহীনতা তীব্র। আবার অন্যদিকে করোনা প্রতিষেধক নিয়েও একটা চূড়ান্ত ‘মিস ম্যানেজমেন্ট’ দেখা গেছে। যে রকম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের কাছ থেকে টাকা নিয়েও করোনার প্রতিষেধক পৌঁছায়নি সময়মতো, সেটা যেমন ভারতের বিদেশনীতিতে ধাক্কা খেয়েছে, আবার অন্যদিকে দেশের ভেতরেও চাহিদা ও জোগানের সমস্যা হয়েছে। এসবের মধ্যে এসে গেছে কৃষক আন্দোলন এবং এত দিন ধরে কৃষক আন্দোলন চলেছে। যদিও নরেন্দ্র মোদি কিছুতেই তিনটা বিল, যেগুলো সংসদে কৃষি বিল পাস রয়েছে, যেটার বিরোধিতা কৃষকরা করছেন, সেখানে কোনো পরিবর্তন আনতে রাজি নন। কিন্তু কৃষকরাও আন্দোলন থেকে সরে আসেননি। শত চেষ্টায়ও কৃষক আন্দোলনকে ভাঙা সম্ভব হয়নি। এখন এই পরিস্থিতিতে নরেন্দ্র মোদি কিভাবে মোকাবেলা করছেন সেটাই দেখার।

তবে একটা কথা মনে রাখতে হবে যে নরেন্দ্র মোদি হলেন নরেন্দ্র মোদি। নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক বিচক্ষণতা এবং নির্বাচনী রাজনীতিতে সাফল্য অর্জনের জন্য নরেন্দ্র মোদির সেনাপতি অমিত শাহর যোগ্যতা নিঃসন্দেহে এই মুহূর্তে ভারতের সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে নজরকাড়া। অনেক সময় মোদি-শাহর যুগলকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে ‘ইলেকশন ইঞ্জিন’ বলে অভিহিত করা হয়। ২০১৯ সালেও অনেকের মনে হয়েছিল যে ২০১৪ সালের জনপ্রিয়তা নেই, সুতরাং ২০১৯ সালে একটা রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যেটা হয়তো বিরোধীরা দখল করতে পারে। কিন্তু দেখা গেল, পুলওয়ামা আক্রমণ, অন্যান্য জাতীয়তাবাদী বিভিন্ন ইস্যুতে নরেন্দ্র মোদি বিপুল ভোটে আবার জয়লাভ করলেন। ২০২৪ সালের আগে নরেন্দ্র মোদি ঠিক কোন এজেন্ডা নিয়ে এগোবেন তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে একটা জিনিস বোঝা যাচ্ছে, করোনা ম্যানেজমেন্টের ব্যর্থতা দূরে সরিয়ে রেখে ১০০ কোটি মানুষকে প্রতিষেধক দেওয়ার সাফল্য অর্জনকে একটা মস্ত বড় ইস্যুতে পরিণত করা এবং তার জন্য সব সংবাদমাধ্যমের সাহায্য নিয়ে এবং জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে মোদি কিন্তু সেটাকে মস্ত বড় ইতিবাচক আল্লেখ্য তৈরি করতে সচেষ্ট।

আগামী দিনে আরো নিশ্চয়ই নানা ধরনের নতুন নতুন বিষয় নিয়ে তিনি আসবেন এবং যেটা আজকের আধুনিক যুগে বলা হয় যে ঞযব ওহভড়ৎসধঃরড়হ মধসব রহ ফবসড়পত্ধপু—সেই ‘ইনফরমেশন গেম’-এর ক্ষেত্রে নরেন্দ্র মোদির জন্য সবচেয়ে যেটা আনন্দের, কারণ সেটা হচ্ছে ছত্রভঙ্গবিরোধী। অন্যদিকে বিরোধী দল হলো কংগ্রেস। সেই কংগ্রেসের কাণ্ডারি রাহুল গান্ধী, তিনি কংগ্রেসের সভাপতি হন, এখন তিনি পদে ইস্তফা দিয়েছেন। সোনিয়া গান্ধী দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সর্বশেষ বৈঠকে। তবে রাহুল গান্ধী থেকেও নেই। তিনি সারাক্ষণ টুইট করেন, কিন্তু কোনো দায়িত্বে তাঁকে দেখা যায় না। যেসব রাজ্যে কংগ্রেস ক্ষমতায় পাঞ্জাব, ছত্তিশগড়ে; সেখানে ভয়াবহ অস্থিরতা এবং যেসব জায়গায় আন্দোলন করা প্রয়োজন আসাম কিংবা হরিয়ানায়, সেখানে কিন্তু কংগ্রেসকে দেখা যায় না। এমনকি উত্তর প্রদেশেও প্রিয়াঙ্কা যতটা সক্রিয়, রাহুল গান্ধীকে এখনো সেভাবে সক্রিয় হতে দেখা যায়নি। রাহুল গান্ধীর সঙ্গে আসতে অখিলেশ যাদব উত্তর প্রদেশে রাজি নন। কেননা গতবারের নির্বাচনে তাঁর বদ্ধমূল ধারণা যে রাহুলের সঙ্গে জোট বাঁধায় তাঁর ক্ষতিই হয়েছে, লাভ হয়নি। মায়াবতীও উত্তর প্রদেশে আলাদা রয়েছেন। তিনি অখিলেশের সঙ্গে জোট বাঁধতে রাজি নন।

এভাবে বিরোধী যে শিবির তাতে ঐক্যের চিত্র স্পষ্ট নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চাইছেন যে এই ঐক্যটা গড়া হোক এবং একটা ইউপিএ থ্রি গঠন করা হোক, যাকে সামনে রেখে সব দল এগোবে। প্রধানমন্ত্রীর প্রার্থী এখন না-ই বা ঠিক হলো, কিন্তু বিরোধীরা ঐক্যবদ্ধ একটা আন্দোলন করবে—এটাই তো অবশ্য কাম্য। তবে এ ব্যাপারেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যতটা সক্রিয়, অন্য বড় দল হিসেবে কংগ্রেসের সেই সক্রিয়তা এখনো দেখা যাচ্ছে না।

কাজেই উত্তর প্রদেশে নির্বাচনের ফল দেখার পর বিরোধীরা কতটা কী সক্রিয় হবে, কতটা হবে না—সেটা আরো বোঝা যাবে। কিন্তু এ মুহূর্তে আজ যা পরিস্থিতি, তাতে একদিকে যেমন মোদির জনপ্রিয়তা ক্ষয় হচ্ছে, যেমন নানা ধরনের আর্থিক এবং কৃষক আন্দোলন এবং আরো বিবিধ ইস্যুতে মোদি সমস্যার জালে জড়িয়ে পড়ছেন, আবার এটাও ঘটনা যে একটা পাল্টা বাস্তবতা তৈরি করে ইতিবাচক আবহ তৈরি করার ক্ষমতা, সেটা কিন্তু এখনো মোদির বেশি। সেখানে কিন্তু ভোটের এখনো অনেক দেরি। এখনো বিরোধীরা মোদিকে ক্ষমতাচ্যুত করে দেবে, এমন একটা কনফিডেন্ট, সেটা বিরোধী শিবির তথা সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়নি।

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠের বিশেষ প্রতিনিধি

 

 



সাতদিনের সেরা