kalerkantho

বুধবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ১ ডিসেম্বর ২০২১। ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩

ভিন্নমত

টাকার মান ধরে রাখা কঠিন হতে পারে

আবু আহমেদ

২৪ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



টাকার মান ধরে রাখা কঠিন হতে পারে

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো একটা স্বস্তিদায়ক মাত্রার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। আমাদের রিজার্ভ এখন ৪৬ বিলিয়ন ডলার। আমাদের আকারের কোনো অর্থনীতিতে এমনটা নেই। শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের মতো অনেক দেশই আমাদের পেছনে পড়ে আছে। বাংলাদেশের আরেকটি সুবিধা হচ্ছে, গত ১০ বছর ধরে আমরা ডেট সার্ভিসিং (সময়মতো সুদসহ ঋণ পরিশোধ) করে আসছি সফলভাবে। এর প্রধান কারণও বৈদেশিক মুদ্রার পর্যাপ্ততা। আমাদের ঋণ দেওয়ার ব্যাপারে এডিবি, ওয়ার্ল্ড ব্যাংকসহ বিশ্বের বড় ঋণদানকারী সংস্থাগুলোর আগ্রহ আরো বেড়েছে। কারণ বাংলাদেশ এখন ডেট সার্ভিসিংয়ে সক্ষম। এটাও আমাদের অর্থনীতির একটা সুবিধাজনক অবস্থান। এ ছাড়া রিজার্ভ ভালো থাকলে অর্থনীতিতে বিদেশি বিনিয়োগও ভালো আসে। কারণ বিনিয়োগকারী তাদের আয় বা লাভের অর্থ বিদেশি মুদ্রার মাধ্যমেই নিয়ে যেতে চায়। এদিক দিয়েও বাংলাদেশ গত ১০ বছরে সফলতা দেখিয়েছে। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী বলেই এটা সম্ভব হয়েছে। আমাদের অর্থনীতি ৩৫০ বিলিয়ন ডলার ছড়িয়ে গেছে। এই আকারের অর্থনীতিতে ৪৫ বিলিয়নের বেশি রিজার্ভ বলতে গেলে কারো নেই। তবে সম্প্রতি বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের দিক দিয়ে বাংলাদেশি টাকার মান চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

গত তিন মাস ধরে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমতে দেখা যাচ্ছে। ৮৫ টাকার মার্কিন ডলার এখন ৮৭ থেকে ৮৮ ডলারে বিক্রি হচ্ছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অফিশিয়াল রেট থেকে তা এক টাকা, ৫০ পয়সা করে বাড়ছে। এর মূল কারণ হচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতিতে পণ্যের চাহিদা বেড়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম গত ১৭ অক্টোবর প্রতি ব্যারেল ৮৩ ডলার উঠেছে, যা গত সাত বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। আমরা জ্বালানি তেলের সবটাই আমদানি করি। আবার এলপিজির দামও প্রায় শতভাগ বেড়েছে। আমাদের অভ্যন্তরীণ ভোক্তাদেরও তাই বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। এত দিন ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতির আরেকটা সুবিধা ছিল, আমরা মূল্যস্ফীতিকে সফলভাবে মোকাবেলা করতে পেরেছি। একটা জায়গায় রাখতে সক্ষম হয়েছিলাম। এই সফলতার পেছনে মূল কারণ ছিল বিদেশ থেকে আমরা যেসব জিনিস আমদানি করতাম, সেগুলোর দাম হয় পড়ে গিয়েছিল, না হয় স্থিতিশীল ছিল। যেমন—অপরিশোধিত তেলের মূল্য। এটা ক্রমাগত পড়ছিল। এ সুযোগে দেশের সরকারি পরিশোধন কম্পানিগুলোর লাভ হয়েছে। অথচ এখন বেশি দামে আনতে হচ্ছে। অন্যদিকে বিশ্ববাজারে ভোজ্য তেলের দামও চড়া। আমাদের এখানে তা দিন দিন বাড়ছে।

বাংলাদেশকে আমরা যত বলি খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশ, কথাটা ঠিক নয়। দেশে প্রায় ২৫ মেট্রিক টন খাদ্য ঘাটতি রয়েছে, মোট চাহিদার এক-পঞ্চমাংশের মতো। সমস্যা হচ্ছে, চাল আমদানির ক্ষেত্রে উৎস দেশগুলোর অবস্থা সুবিধার নয়। এর মধ্যে ভারত, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে চালের দাম বেড়ে গেছে। সরকার সম্প্রতি আমদানি শুল্ক কমিয়েছে। কিন্তু তার পরও সস্তায় আনা সম্ভব হবে না। কারণ বিশ্ববাজারে দাম বেড়েই যাচ্ছে। শুধু উৎপাদন নয়, খাদ্যপণ্য আমদানিতে সামগ্রিক সরবরাহ চেইনটাই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। করোনা পরিস্থিতির পর লোকবল কমে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ নিতে হচ্ছে, জাহাজ ভাড়া দিগুণের বেশি বেড়ে গেছে, কনটেইনার পাওয়া যাচ্ছে না, বন্দরগুলোও ঠিকমতো হ্যান্ডল করতে পারছে না। ফলে কভিড-পরবর্তী সময়ে বিশ্ব অর্থনীতি গতিশীল হওয়ায় এখন সবখানেই ঘাটতি চোখে পড়ছে। বাংলাদেশের ওপর এসবের প্রভাব পড়ছে। পরিবহন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। বিদেশে তৈরি পোশাক পাঠাতে গিয়েও অতিরিক্ত পরিবহন খরচ বহন করতে হচ্ছে।

ভাগ্যক্রমে বাংলাদেশের একটি প্লাস পয়েন্ট হচ্ছে রপ্তানি বৃদ্ধি পাওয়া। বিশেষ করে তৈরি পোশাক রপ্তানি। এর বড় কারণ হচ্ছে আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলো আমাদের মতো এতটা কম দামে পণ্য দিতে পারছে না। ভারত, চীন ও ভিয়েতনামে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। কিন্তু বাংলাদেশ স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে এবং খুব প্রতিযোগিতামূলক দাম প্রস্তাব করতে সক্ষম হচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে পরিবহন ব্যয় ও সরবরাহ বিলম্ব হওয়ায় সার্বিক ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এই মুহূর্তে আমাদের রেমিট্যান্সে একটু স্থবিরতা চলছে। কভিডের কারণে আমাদের লোকজন চলে আসায় এবং সংকটময় পরিস্থিতির কারণে অগ্রিম অর্থ পাঠানোর কারণে আমাদের রেমিট্যান্স প্রবাহ বেশ ভালো হয়েছে করোনাকালে। কিন্তু গত কয়েক মাসের তুলনায় রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক অবস্থায় রয়েছে। এর আরেকটা কারণ হচ্ছে বাজারে সব কিছু উন্মুক্ত হয়েছে। প্রবাসীদের অনেকে এখন অর্থটা অফিশিয়াল চ্যানেলে না পাঠিয়ে আন-অফিশিয়ালি চ্যানেলে পাঠাচ্ছে। এতে তারা এক-দেড় টাকা বেশি পাচ্ছে। যেটা করোনার আগেও ছিল। এ জন্য সরকারি হিসাবে রেমিট্যান্স কম আসছে। তাই বলা যায় যে রিজার্ভ গড়ে ওঠা হয়তো আগের মতো অত দ্রুতগতিতে হবে না। এ বিষয় চূড়ান্ত কিছু বলতে হলে সামনের কয়েকটা মাস অন্তত অপেক্ষা করতে হবে।

বিদেশে সরবরাহ চেইন ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার প্রতিফলন বাংলাদেশেও ঘটছে। আমাদের এখানে মূল্যস্ফীতি যেখানে ছিল ৫.৫ বা ৬ শতাংশের মধ্যে, তা বেড়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে গেছে। ভোজ্য তেলের দাম অনেক বেশি পরিমাণে বেড়েছে। চিনির দাম বেড়ে গেছে। গুঁড়া দুধের দাম বেড়েছে। এর বাইরে সাবানসহ অন্যান্য প্রসাধনী ও গৃৃহস্থালিসামগ্রীর দামও বেড়েছে। অবশ্য খাদ্যপণ্য ছাড়া অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়ার বিষয়টি মানুষ ততটা গুরুত্বের সঙ্গে নেয় না। তবে এটা ঠিক যে সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতি আগের জায়গায় না থাকার সম্ভাবনা বেশি। এই পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকলে আবার ডলারের চাহিদা বেড়ে বাংলাদেশি টাকা চাপের মধ্যে পড়ে যাবে। একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমতির দিকে থাকলে ডলারের চাহিদা বাড়বে। আবার অর্থনীতি খুলে যাওয়ার কারণে ব্যক্তিগত ভ্রমণ ও বিদেশে গিয়ে চিকিৎসাসেবা বেড়ে যাওয়ার কারণে ডলারের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব বিদেশগামী মানুষ খোলাবাজার থেকে ডলার ক্রয় করছেন। ফলে তাঁরা ব্যাংক রেটের চেয়ে বেশি দামে ডলার ক্রয় করছেন। সব মিলিয়ে ডলারের চাহিদা বেড়ে যাচ্ছে। তাই ডলারের দাম চাহিদা-সরবরাহ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই চলছে। সহজ হিসাবটা হচ্ছে ডলারের চাহিদা বাড়ছে, আমাদের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়ছে। ফলে আমি যা দেখতে পাচ্ছি, সামনের দিনগুলোতে ডলারের বিনিময় হার আরেকটু বাড়তে পারে, যাতে বাংলাদেশি টাকা চাপের মধ্যে থাকতে পারে। এই চাপটা কতটুকু বেশি হবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। কারণ এটা নির্ভর করছে আমাদের রেমিট্যান্স প্রবাহ ও রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ওপর। এ ছাড়া অপরিহার্য পণ্য (নন-অ্যাসেনশিয়াল) আমদানিতে আমরা কতটা নিরুৎসাহ করতে পারি সেটার ওপরও অনেকটা নির্ভর করছে। তাই সরকার চিন্তা করতে পারে বিলাসী পণ্যে সম্পূরক শুল্ক বসাবে কি না। এটা সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ব্যাপার। সরকারি ব্যয় কমানো হতে পারে আরেকটি উপায়। অর্থাৎ এস্টাবলিশমেন্ট কস্ট কমিয়ে আনা। কারণ অর্থ সরবরাহ বেশি হলে মূল্যস্ফীতি বাড়বেই। তবে উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়ন বন্ধ রাখা যাবে না।

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বলতে বোঝায় মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং বৈদেশিক মুদ্রা বনাম স্থানীয় মুদ্রার মান স্থিতিশীল পর্যায়ে রাখা। এর মধ্যে থেকেই অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে হয়। এটা করতে হলে আমাদের এখন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের দিকে নজর দিতে হবে, যেন এটা দ্রুত কমে না যায়। সুতরাং আমাদের টাকার মান বনাম মার্কিন ডলারসহ অন্যান্য প্রভাবশালী মুদ্রা ইউরো, ব্রিটিশ পাউন্ড বা চীনা ইউয়ানের দিকে নজর রাখতে হবে। আমাদের চিন্তা করা জরুরি হয়ে পড়েছে, কয়েক বছর ধরে আমরা অর্থনীতিতে যে স্বস্তিটা অনুভব করতাম, সেটা যেন আমরা বজায় রাখতে পারি। আমাদের সেভাবেই নীতিনির্ধারণ করতে হবে।

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

অনুলিখন : আফছার আহমেদ



সাতদিনের সেরা