kalerkantho

বুধবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ১ ডিসেম্বর ২০২১। ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩

সেরা ভাবার লড়াই আর চাটুকারিতার দৌরাত্ম্য

গোলাম কবির

২২ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সেরা ভাবার লড়াই আর চাটুকারিতার দৌরাত্ম্য

১৭৫৭ সালের প্রাহসনিক যুদ্ধ জয় শেষে ১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হওয়ার পর স্বল্প সময়ের মধ্যে ব্রিটিশ শাসন প্রবর্তিত হতে থাকে ভারতজুড়ে। তখন রাজধানী নির্ধারিত হয় কলকাতা। প্রশাসনিক আইন-কানুন প্রতিষ্ঠার জন্য অনেকের সঙ্গে লর্ড মেকলে ইউরোপ থেকে কলকাতা আসেন। তিনি বাংলার মানুষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়ে বাঙালি চরিত্রের কিছু বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করেন। উদ্দেশ্য নিজেদের সেরা ভাবা এবং বাঙালি চরিত্রে নীচতার শিরোপা পরানো। মেকলে সাহেব বলতেন, বাঙালি ছিদ্রান্বেষী, পরশ্রীকাতর, মোসাহেব ইত্যাদি। তার পর্যবেক্ষণ শুধু বাঙালির নয়, মানব চরিত্রেরই বটে। এর তারতম্য বিচারে কেউ সেরা, কেউ সেরা নয়। তবে আমাদের মোসাহেবিপনা যে চরমে তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হবে না। আর এসব মোসাহেবি ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের জন্য। তাতে দেশ ও জাতি রসাতলে গেলেও কারো দ্বিধা থাকে না। এ তথ্যের সঙ্গে একটি সত্য নিহিত চাটুকারদের কাঁধে পা রেখে ব্রিটিশরা ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পাকিস্তানিরা অনেকটা নির্বিঘ্নে সম্পদ লুট করে নিয়ে গেছে। সুতরাং মোসাহেবরা বোধ করি তাদের লেখায় প্রশংসার্হ হওয়ার কথা ছিল। ইতিহাস নির্মম, তা হতে দেয় না। একটা সত্য সবার জানা, মোসাহেব যেমন অন্তঃসারশূন্য ব্যক্তিস্বার্থ অন্বেষী, তেমনি মোসাহেবের ইচ্ছা পূরণকারী নিজেকে ক্ষমতায় দেখতে পেলেই ডগমগ। দেশ ও জাতির কথা এদের মাথায় আসে না।

আমাদের ছেলেবেলায় শিক্ষকদের তেমন জুগুপ্সা-মত্ত হতে দেখিনি। যেটুকু সমালোচনা না করলে দেশ রসাতলে যাবে—তা তাঁরা করতেন। অবশ্যই ব্যক্তিগত উন্নতির জন্য নয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে নোয়াখালী সরকারি কলেজে আমি নিযুক্ত হই। তখনকার পূর্ব পাকিস্তান পাবলিক সার্ভিস কমিশনে পরীক্ষা দিতে যাওয়ার আগে আমার ঢাকা দেখাই হয়নি। নোয়াখালী দূর-অস্ত। সেখানে গিয়ে কিছু শিক্ষকের মাঝে সেরার বড়াই নিয়ে বচসা শুনতাম। দেশভাগের প্রায় দেড় যুগ পরে তখনকার সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে রাজনীতিমুক্ত রাখার অভিপ্রায়ে পূর্ব পাকিস্তানের নামকরা কলেজগুলো সরকারের আওতায় নিয়ে আসে। যেসব কলেজে অনেক নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক ছিলেন। তবে পরে ১৯৬৮ সালে মোনেম খান প্রতিটি জেলা সদরের কলেজকে সরকারি করে ফেলেন। তখন থেকে সরকারি কলেজের শিক্ষকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। কারণ পাবলিক সার্ভিস কমিশন কর্তৃক বাছাই করা শিক্ষক, ডিপিআইয়ের আপৎকালীন বা নানা কিসিমের উমেদারদের নিয়োগ করা শিক্ষক এবং আত্তীকৃত শিক্ষক। সংক্ষেপে তাঁদের পরিচয় ছিল যথাক্রমে হক-অ্যাডহক-নাহক। এ বিভাজন ছিল কৌতুকের। শিক্ষকরা নিজেদের যা-ই বিচার করুক না কেন, কষ্টিপাথর হলো যথার্থ ছাত্র-ছাত্রীরা। শিক্ষক-অশিক্ষক তারাই যাচাই করতে পারে।

প্রশাসনে সিএসএস, ইপিসিএসদের মধ্যে সেরার আভিজাত্যবোধ ছিল। তার সঙ্গে যুক্ত হয় সিও এবং নানা ধরনের বিএসএসের সংযুক্তি। শিক্ষকদের মধ্যে সেরা সাজার সিনাজোরি আর মোসাহেবির জারিজুরি কম নেই, প্রশাসনেও ওপরে ওঠার জন্য যত নিচে নামতে হয় তার কসুর করেন না অনেকেই।

আমরা শিক্ষায় ফিরে আসি। মানুষ চিরকালই ওপরে ওঠার জন্য বিবেক বিসর্জন দিয়েছে। সুধীজন মনে করেন, শিক্ষক কেন সে পথে হাঁটবেন! শিক্ষক তো মানুষ ও মনুষ্যত্বের প্রতিনিধি। তাইতো স্রষ্টা জনক-জননীর পর শিক্ষকের স্থান নির্ধারণ করেছেন। কিছু অতিলোভী শিক্ষকের কর্মকাণ্ডে তা কলুষিত হচ্ছে। এমনটি বোধ করি চলতে দেওয়া যায় না। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, লোভ অনেক অনিষ্টের মূল। আমি অশীতিবর্ষ অতিক্রম করেছি চলার পথে। হুমায়ূন কবিরের ভাষায়, ‘অশীতিবর্ষ বয়স আমার দুর্বল অতিদীন, কুব্জ-পঙ্গু-গণিতদন্ত-বধির দৃষ্টিহীন।’ চলার পথে শিক্ষক-প্রিন্সিপাল-ভিসি কম দেখিনি। আমাদের বিশ্বাস, রাষ্ট্র যে খোলসে পরিচালিত হোক না কেন শিক্ষক এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান নিয়মানুগ ও নিঃস্বার্থ থাকতে পারলে জাতির জ্ঞান তৃষ্ণা মরুপথে হারায় না।

নিকট-অতীতে দেখা গেছে কিছু ভিসি পদপ্রাপ্ত ব্যক্তি ডামাডোলের কালে চর দখলের মতো রাতের অন্ধকারে ভিসির পবিত্র আসন কলঙ্কিত করেছেন। কেউ কেউ স্বাধীনতার মূলধারায় অবস্থান করে ক্ষমতার হাতছানিতে প্রলুব্ধ হয়ে উল্টো পথে যাত্রা করেছেন। অনেককে দেখা গেছে মুখে বঙ্গবন্ধু জপমালা জপে অমোচনীয় অপরাধ করে গেছেন। এমনকি ঘাতকরা সত্য প্রতিষ্ঠার নামে হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে শিক্ষার্থীর হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে শিক্ষাকে জাহান্নামের দিকে ঠেলে দিয়েছেন।

আমার শিক্ষার্থী জীবনের একজন ভিসি আমার কাছে স্মরণীয় হয়ে আছেন। তিনি এমন নিয়মানুগ এবং সজ্জন ছিলেন, ছাত্ররা অনেক চেষ্টা করেও তাঁকে আগে সালাম দিতে পারেনি, প্রসংগত একটা কথা বলে রাখি, স্বর্ণপ্রসূ রাজশাহী কলেজ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর প্রথম দিকে অনেক মেধাবী শিক্ষক জোগান দিয়েছে। এমনকি প্রথম দিককার কয়েকজন ভিসি রাজশাহী কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ড. ই এইচ জুবেরি, ড. মমতাজ উদ্দিন আহমেদ, প্রফেসর মুহম্মদ শামসুল হক প্রমুখ। সবচেয়ে সজ্জন ভিসি ছিলেন মুহম্মদ শামসুল হক, অবশ্য আমার দৃষ্টিতে যাঁর কথা আগেই বলেছি। বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের ধারায় উনসত্তরের আগুনঝরা দিনের প্রথম শহীদ শিক্ষক শামসুজ্জোহার দাফনের পর সমবেত শোকসভায় ভিসি শামসুল হক সাহেব যে মর্মছেঁড়া বক্তৃতা দিয়েছিলেন তাতে কারো চোখ আর্দ্র না হয়ে পারেনি।

পত্রিকায় প্রকাশ শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ ও অন্যান্য বিষয়ে নানা অনিয়মের পর আগের ভিসি বিদায় হলে নতুন ভিসি নিয়োজিত হলেন ড. গোলাম সাব্বির সাত্তার, সেপ্টেম্বর ২০২১। লক্ষণীয়, ড. গোলাম সাব্বির সাত্তার শুধু রাজশাহী কলেজের ছাত্র ছিলেন তা-ই নয়, পুরুষানুক্রমে রাজশাহীর মাটির সন্তান। এ নিয়োগ রাজশাহীবাসীকে গর্বিত করেছে নিশ্চয়ই। রাজশাহীবাসী দেখতে চায়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলে আসা হিরণ্ময় ঐতিহ্য। সে ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে হলে অবশ্যই তাঁকে নিরপেক্ষ থাকতে হবে। কারণ তিনি ভিসি, সব মত ও পথের মানুষের। তবে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকবে সর্বাগ্রে। বঙ্গবন্ধু বিশ্বের সব সুবিধাবঞ্চিত মানুষের ন্যায়ানুগের প্রতীক। সে সত্য স্মরণে রেখে, সেরা সাজার প্রতিযোগিতা পরিহার এবং মোসাহেবদের দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে এলে ফিরে আসবে হারানো দিন। মানুষ দেখতে চায়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ জ্ঞানপীঠ। নিকট-অতীত কালে দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে, আব্বাসীয় খলিফা হারুন-মামুন মত-পথের দিকটি বড় করে না দেখে ধর্ম-নির্বিশেষে প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিদের বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, তাইতো একদা বাগদাদ বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বসেরা সাধনাপীঠে পরিণত হয়েছিল।

স্বাধীনতার জন্য প্রথম রক্ত দিয়েছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষাক্ষেত্রে অধোগামী বাংলাদেশকে সুবর্ণশিখরে উন্নীত করার নেতৃত্ব দিক এই বিশ্ববিদ্যালয় সেটাই আমাদের কামনা।

 

লেখক : সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ



সাতদিনের সেরা