kalerkantho

বুধবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ১ ডিসেম্বর ২০২১। ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩

চীনের তাইওয়ান আক্রমণের আশঙ্কা ক্ষীণ

গাজীউল হাসান খান

২২ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ১২ মিনিটে



চীনের তাইওয়ান আক্রমণের আশঙ্কা ক্ষীণ

ইন্দো-প্যাসিফিক বলয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সম্প্রতি কোয়াড (QUAD) এবং অকাস (AUKUS) সামরিক জোট গঠন কিংবা চুক্তি স্বাক্ষরের পর জাতীয়তাবাদী চায়নিজ তাইপে (তাইওয়ান) নামে পরিচিত চীনের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপটির মধ্যে স্পষ্টতই আবার নতুন করে একটি স্বাধীনতার স্পৃহা জেগে উঠেছে। এটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন এটি তাদের দীর্ঘদিনের ঘোষিত ‘এক চীন’ নীতির বরখেলাপ মনে করে। ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে বিচ্ছিন্ন প্রাচীন ফরমোজা দ্বীপ বা তাইওয়ানকে শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়ায় মূল ভূখণ্ড অর্থাৎ বিশ্বের অন্যতম প্রধান পরাশক্তি গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের সঙ্গে একত্রীকরণের কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছিল বিগত সত্তরের দশকের আগে থেকেই। এ বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে ১৯৭১ সালে জাতিসংঘে অনুষ্ঠিত ভোটাভুটিতে মূল ভূখণ্ড অর্থাৎ চীনের দুই অংশের মধ্যে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনকে সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্য দিয়ে। শুধু তা-ই নয়, গণচীন তখন থেকেই জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে নিজের স্থান করে নিয়েছে। এবং তখন থেকেই আন্তর্জাতিকভাবেও ধরে নেওয়া হয়েছে যে জাতীয়তাবাদী কিংবা বিচ্ছিন্ন চায়নিজ তাইপে (তাইওয়ান) চীনের মূল ভূখণ্ডের অংশ। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অন্য স্থায়ী প্রতিনিধিরা এ বিষয়টি নীতিগতভাবে মেনেও নিয়েছিলেন। কিন্তু তাইওয়ান (চায়নিজ তাইপে) সেটি মেনে নিতে পারেনি এবং ভেতরে ভেতরে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা কার্যকর করার চেষ্টা করেছে। নব্বইয়ের দশক থেকে তাদের সে স্বাধীনতা অর্জনের নীরব কার্যক্রম সরব হয়ে উঠতে দেখা যায়। শুধু তা-ই নয়, তাইওয়ান ভূখণ্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা যুক্তরাষ্ট্রসহ আরো কয়েকটি রাষ্ট্র থেকে যথেষ্ট সামরিক অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয় করেছে। তখন থেকেই যুক্তরাষ্ট্র তার নয়া সাম্রাজ্যবাদী কৌশলে তাইওয়ানের সঙ্গে গোপনে অস্ত্রের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, জাতিসংঘের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ক্রমে ক্রমে তাইওয়ানকে আর্থ-রাজনৈতিক দিক থেকে পরোক্ষভাবে কিছুটা সমর্থনও দিতে শুরু করে। দক্ষিণ ও পূর্ব চীন সাগরে চীনের সামরিক প্রভাব ঠেকানোর উদ্দেশ্যে মরিয়া হয়ে ওঠা যুক্তরাষ্ট্র ও তার সহযোগীরা বর্তমানে এ ক্ষেত্রে তাইওয়ানকেও কাজে লাগানোর প্রয়াস পাচ্ছে। এ বিষয়টি চীন, রাশিয়া, পাকিস্তান, ইরানসহ বেশ কিছু দেশকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্নে বিচলিত করে তুলেছে।

বিগত আশি, নব্বই ও বর্তমান বিশ শতকের প্রথম দুই দশকে অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে গণচীন। চীন আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বিশ্বের প্রথম অর্থনীতির দেশ হিসেবে নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করে ফেলতে পারে। তা ছাড়া রাশিয়ার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতায় চীন ষষ্ঠ জেনারেশনের জঙ্গি বিমান ও অন্যান্য ক্ষেত্রে হাইপারসনিক প্রযুক্তি অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। স্টিলথ কমব্যাট এয়ারক্রাফট এবং আরো উন্নত প্রযুক্তির সাবমেরিন তৈরি করার ব্যাপারে চীন দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে মধ্যম থেকে দূরপাল্লার প্রযুক্তি নিয়ে চীন বর্তমানে কাজ করছে। এ বিষয়গুলো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা শক্তিকে প্রতিনিয়ত তাড়া করছে। চীনের রয়েছে বিশাল সেনাবাহিনী, যা খুব শিগগির যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। এসব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে শুরু করে বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন হন্যে হয়ে উঠেছেন। অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার সহযোগীদের সাম্রাজ্যবাদী ধ্যান-ধারণা এবং আধিপত্যবাদী মনোভাব এখন চরম হুমকির মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন উত্তর আমেরিকায় বসে এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে ‘প্রক্সি ওয়ার’ চালিয়ে যাচ্ছে তার সহযোগীদের মাধ্যমে। নিত্যনতুন সামরিক জোট গঠন করছে অস্ট্রেলিয়া ও এশিয়াকে কেন্দ্র করে। কোয়াড কিংবা অকাস তার ব্যতিক্রম নয়। ফ্রান্সের ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতৃত্ব গ্রহণ এবং ন্যাটোর বাইরে ইউরোপের নিজস্ব প্রতিরক্ষা বাহিনী গড়ে তোলার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। সম্প্রতি তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। এ প্রক্রিয়ায় ভবিষ্যতে হয়তো যোগ দেবে কানাডা। তাতে গঠিত হবে ইংরেজিভাষী সাম্রাজ্যবাদী ও উপনিবেশবাদীদের এক নতুন ক্লাব। তাদের মূল লক্ষ্য হবে বিশ্বব্যাপী তাদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক আধিপত্য বজায় রাখা, চীনের মতো প্রগতিশীল রাষ্ট্রের উত্থানকে ঠেকিয়ে রাখা কিংবা প্রতিহত করা এবং নিজেদের কায়েমি স্বার্থ বজায় রাখা। তারা বিশ্বের কোনো ধ্বংসাত্মক সমস্যার সমাধান করবে না। প্রতিবেশী রাষ্ট্র কিংবা আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে সমস্যা, সংঘাত ও সংঘর্ষ টিকিয়ে রেখে তাদের কাছে বিভিন্ন ধ্বংসাত্মক অস্ত্রশস্ত্র কিংবা সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করা তাদের উদ্দেশ্য। কাশ্মীর সমস্যাকে কেন্দ্র করে ভারত ও পাকিস্তানের কাছে বিপুল অস্ত্রশস্ত্র বিক্রি করা কিংবা মধ্যপ্রাচ্যে বিরাজমান বিভিন্ন সমস্যাকে কেন্দ্র করে তুরস্ক, সৌদি আরব, আমিরাত, কুয়েত, মিসরসহ বিভিন্ন দেশের কাছে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র বিক্রি করা। উত্তর কোরিয়াকে দেখিয়ে দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা জাপানের সমরভাণ্ডার সমৃদ্ধ করাই হচ্ছে এদের মূল লক্ষ্য। এর বিনিময়ে অর্জিত অর্থে তারা তাদের অর্থনৈতিক পরাশক্তির অবস্থান ধরে রাখে।

ওপরে উল্লিখিত এই শ্বেতাঙ্গ পরাশক্তির জোটটি এখন চীনের বিরুদ্ধে অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এ ক্ষেত্রে তারা ভারত কিংবা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে চীনের জুজুর ভয় দেখিয়ে বলিদানের একই বেদিতে জমায়েত করেছে এবং বিভিন্ন কৌশলে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র বিক্রি করছে। এক জেনারেশনের যুদ্ধবিমান পুরনো হয়ে যাওয়ার আগেই পরবর্তী সময়ে উন্নত জেনারেশনের বিমান কিংবা সাবমেরিন কেনা নিয়ে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে প্রতিযোগিতা হয়ে যায়। অথচ তাদের মধ্যে এমন অনেক দেশ রয়েছে, যাদের নাগরিকদের প্রয়োজনীয় কিংবা পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান নেই। অর্থের অভাবে তারা মানবেতর জীবন যাপন করছে। প্রয়োজনীয় তহবিলের অভাবে দেশের জরুরি উন্নয়নের কাজ বাস্তবায়িত হচ্ছে না অথচ সামরিক অস্ত্রশস্ত্র কিংবা সাজসরঞ্জাম কেনা হচ্ছে নিয়মিতভাবে। তবে তাইওয়ান একটি উন্নত দেশ। অর্থনৈতিক দিক থেকে এ দেশটি যথেষ্ট সমৃদ্ধি অর্জন করেছে। শিল্পায়ন, বিনিয়োগ, উৎপাদন ও রপ্তানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তাইওয়ান বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি উল্লেখযোগ্য অবস্থানে পৌঁছে গেছে। চীনের মূল ভূখণ্ডের মধ্যেও তাইওয়ানের প্রচুর বিনিয়োগ রয়েছে। তারা স্থাপন করেছে যথেষ্ট শিল্প-কারখানা, বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং শিপিংলাইন। চীনের মূল ভূখণ্ডে সামরিক ক্ষেত্র ছাড়া বেসামরিক এমন বিশেষ কোনো খাত নেই, যেখানে তাইওয়ানবাসীদের বিনিয়োগ নেই। তারই সূত্র ধরে গণচীন চেয়েছিল বিচ্ছিন্ন চায়নিজ তাইপের সঙ্গে পর্যায়ক্রমে শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়ায় একত্রীকরণের পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করতে। কিন্তু তাইওয়ানের কিছু জাতীয়তাবাদী রাজনীতিক এবং ক্ষমতালোভী শক্তি যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় একত্রীকরণ কর্মসূচিকে বাদ দিয়ে স্বাধীনতা ঘোষণার পথে সম্প্রতি অত্যন্ত তৎপর হয়ে ওঠে। শুধু তা-ই নয়, তাইওয়ানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট সাই লিং ওয়েন তাঁদের জাতীয় দিবসে গণচীনের বিরুদ্ধে বেশ কিছু উসকানিমূলক বক্তব্য প্রচার করেন। তাতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংসহ কেন্দ্রীয় নেতারা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তাঁরা তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টসহ কায়েমি স্বার্থবাদী নেতাদের কার্যক্রমে অত্যন্ত শক্তিশালী বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ দেখতে পান। তাতে চারদিকে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে গণচীন যেকোনো সময়ে তাইওয়ান আক্রমণ করতে পারে। তাইওয়ানের নেতারা ধারাবাহিকভাবে প্রচার শুরু করেন যে চীন সম্প্রতি বারবার অর্থাৎ একাধিকবার তাইওয়ানের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে এবং তা অব্যাহত রেখেছে। তাইওয়ানের এ ধরনের অভিযোগের পেছনে কোনো সারবত্তা নেই এমন নয়। তবে ১৯৪৯ সালের পর থেকে চীন অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে অর্থাৎ ধৈর্যসহকারে তাইওয়ানের সঙ্গে একত্রীকরণের কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে।

তাইওয়ানের পোশাকি বা সরকারি নাম হচ্ছে রিপাবলিক অব চায়না। জনসংখ্যা প্রায় আড়াই কোটি। আনুষ্ঠানিক ভাষা মান্দারিন চায়নিজ। গণচীন থেকে বিচ্ছিন্ন হলেও তাইওয়ানের অনেক প্রাচীন ইতিহাস রয়েছে। চীনে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের আগে ১৯১১ সালে সংগঠিত এক গণ-আন্দোলনে কুইংদের উত্খাত করা হয়েছিল। পরে নবগঠিত রিপাবলিক অব চায়না সরকার তাইওয়ানের নিয়ন্ত্রণভার গ্রহণ করে ১৯৪৫ সালে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের আত্মসমর্পণের পর। তার কিছুদিন পর চীনের জনগণের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে রিপাবলিক অব চায়না সরকারের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক আন্দোলন শুরু হয়েছিল। তাতে তৎকালীন সরকার চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কাছে দেশের মূল ভূখণ্ড ছেড়ে দিয়ে ১৯৪৯ সালে তাইওয়ানে অবস্থান নেয়। চিয়াং কাইসেকের নেতৃত্বে সেখানে এক জাতীয়তাবাদী সরকার গঠন করা হয়েছিল। কুমিন টাংয়ের নেতা চিয়াং কাইসেক ১৯২৫ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত প্রশাসন পরিচালনা করেন। শুধু তা-ই নয়, সে তাইওয়ান অর্থাৎ রিপাবলিক অব চায়না তখন জাতিসংঘের সদস্য হিসেবে চীনের প্রতিনিধিত্ব করছিল। কিন্তু ১৯৭১ সালে প্রকৃত প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে অনুষ্ঠিত এক ভোটাভুটিতে কমিউনিস্ট চায়না, যা চীনের মূল ভূখণ্ড হিসেবে পরিচিত, তাদের পূর্ণাঙ্গ সদস্য পদ লাভ করে। গণচীন তখন থেকেই জাতিসংঘ থেকে শুরু করে সর্বত্র তাদের ‘এক চীন’ নীতি প্রচার করতে শুরু করে এবং চীনের দুই অংশের একত্রীকরণের উদ্দেশ্যে সর্বত্র বক্তব্য দিয়ে যেতে থাকে। কারণ গণচীনের কাছে তার রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে শুরু থেকে চীনের শত্রুর কোনো অভাব ছিল না। তা ছাড়া বিশাল জনসংখ্যার এই দেশটিতে মানুষের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা ছিল একটি অত্যন্ত দুরূহ কাজ। তখন থেকে পশ্চিমা পুঁজিবাদী ও প্রতিক্রিয়াশীল দেশগুলোর বিরোধিতা কাটিয়ে মাথা তুলে দাঁড়ানো চীনের পক্ষে ছিল অত্যন্ত দুঃসাধ্য ব্যাপার। বিগত দুই থেকে তিন দশকে চীন তার প্রায় ৪০ মিলিয়ন নাগরিককে দারিদ্র্যসীমার ওপরে টেনে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র কিংবা পশ্চিমা জোটের মতো চীন কারো ওপর যুদ্ধবিগ্রহ চাপিয়ে দেয়নি। চীন শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাসী। তার ‘পঞ্চশীলা নীতি’ প্রতিবেশীর সীমানা দখল কিংবা অন্যায় আক্রমণে বিশ্বাস করে না। তার পরও চীনকে নিজ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করতে হয় সম্প্রসারণ, আগ্রাসন ও আধিপত্যবাদীদের কারণে। চীনের উত্থানে দক্ষিণ ও পূর্ব চীন সাগরের তীরবর্তী প্রতিবেশীরা ভীতসন্ত্রস্ত বলে অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু সে অভিযোগের কোনো ন্যায়সংগত ভিত্তি নেই। দক্ষিণ ও পূর্ব চীন সাগরে এবং মালাক্কা প্রণালির মাধ্যমে চীনের বাণিজ্য জাহাজ চলাচল করে আদিকাল থেকে। কিন্তু এর কারণে চীনের প্রতিবেশী থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া কিংবা ভিয়েতনামের সঙ্গে সমুদ্র বাণিজ্য পথ নিয়ে তার কোনো সংঘর্ষ বাধেনি। তবে চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে তার বাণিজ্য পথ কিংবা জলসীমায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হয়েছে। তাতে প্রতিবেশী চীনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা বাদ দিয়ে তিন মহাদেশের ওপারে অবস্থান করা যুক্তরাষ্ট্রের তালে কিংবা উসকানিতে নৃত্য করার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ছোট দেশগুলোর কোনো যুক্তিগ্রাহ্য কারণ নেই। বরং দক্ষিণ চীন সাগরকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশীদের মধ্যে  আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী একটি জোট গঠিত হতে পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য কিংবা অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের প্ররোচনায় যুদ্ধ বাধাতে যাওয়া অত্যন্ত বোকামি হবে।

যদি কোনো কারণে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের বাণিজ্য পথকে কেন্দ্র করে যুদ্ধও বেধে যায়, তাহলে সে যুদ্ধে লড়বে না যুক্তরাষ্ট্র। তার দু-একটি নৌবহর প্রশান্ত কিংবা ভারত মহাসাগরে বসিয়ে রেখে জাপান, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামকে বলা হবে যুদ্ধ করতে এবং তার বহু আগে থেকে শুরু হবে তাদের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রি করা। পশ্চিমা পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদীদের এটি একটি কৌশল। এ পরিস্থিতিতে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের বাণিজ্য পথ কিংবা নৌচলাচলকে (সামরিক) কেন্দ্র করে যে আশঙ্কা প্রতিবেশীদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে তাতে তাইওয়ানকে উসকানিমূলকভাবে টেনে আনা হচ্ছে কেন? চীন তো কোনো উসকানির মুখে কোনো দিনই তাইওয়ানে আক্রমণ চালায়নি কিংবা দখলদারি প্রতিষ্ঠা করতে যায়নি। ভাবতে হবে—এই তাইওয়ান যদি যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি আটলান্টিকের কোনো অঞ্চলে অবস্থিত হতো, তাহলে পেন্টাগন কি তাকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী ভূমিকা পালনের জন্য অক্ষত রেখে দিত। শুধু তা-ই নয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, কূটনীতি ও বিভিন্ন আইন অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রও ১৯৭১ সালে জাতিসংঘে অনুষ্ঠিত ভোটাভুটির আগে বেইজিংয়ের ‘এক চীন’ নীতিকে অগ্রাহ্য করতে পারেনি। কিন্তু আজ যখন চীন শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামরিক শক্তির দিক থেকেও বিশ্বের এক নম্বর পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যেতে শুরু করেছে, তখনই ওয়াশিংটন শুরু করেছে নানা ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের লেজুড়বৃত্তি করা যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার মতো বান্ধবরা প্রশান্ত মহাসাগর থেকে আফ্রিকার শেষ প্রান্তে অবস্থিত ভারত মহাসাগরে পাহারা জোরদার করতে শুরু করেছে। তা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র মনে-প্রাণে তৈরি হয়ে আছে চীনের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও বাণিজ্য রোধ করার জন্য। সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে বর্তমান জো বাইডেন চীনের গতিরোধ করতে এখন এক পায়ে খাড়া। যুক্তরাষ্ট্র চায় তার মিত্ররা আজীবন তাকে বিশ্বের এক নম্বর সামরিক ও অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে টিকিয়ে রাখুক এবং তারা সবাই তার তাঁবেদারি করুক। এটাই হচ্ছে নয়া সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যবাদীদের চরিত্র।

ওপরে বর্ণিত চিত্র কিংবা ঘটনাবলির পরিপ্রেক্ষিতে উত্তেজিত হয়ে চীন হঠাৎ করে তাইওয়ান আক্রমণ করে বসবে, এমন আশঙ্কা খুবই ক্ষীণ। তবে চীন তাইওয়ানকে সাম্রাজ্যবাদীদের দোসরে পরিণত হতে দেবে না। এটা অনেকটা নিশ্চিত। বিশ্বব্যাপী চীনের ‘বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ নস্যাৎ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেকেই অনেক কিছু করছে। তাতে কি চীন তার সূচিত মহাপরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে? চীন পরিকল্পিত ও দীর্ঘ অপেক্ষার প্রকৃতিগত কৌশলে বিশ্বাস করে। চীন ভালো করেই জানে পশ্চিমাদের উসকানিতে তাইওয়ান কতটা এগোতে পারবে। শেষ পর্যন্ত নিজ স্বার্থেই তাইওয়ানকে চীনের বন্ধুত্ব মেনে নিতে হবে।

লেখক : বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশ দূতাবাসে নিযুক্ত সাবেক মিনিস্টার

[email protected]



সাতদিনের সেরা