kalerkantho

রবিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৮ নভেম্বর ২০২১। ২২ রবিউস সানি ১৪৪৩

ডেভিড অ্যামেস : একটি মর্মান্তিক রাজনৈতিক মৃত্যু

অনলাইন থেকে

১৭ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



গত শুক্রবার ইংল্যান্ডের এসেক্সে নিজ নির্বাচনী এলাকার কর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে ব্রিটিশ এমপি স্যার ডেভিড অ্যামেসের মৃত্যু খুবই মর্মান্তিক ঘটনা। এ নিয়ে ১৯৭৯ সাল থেকে দশমবারের মতো কোনো ব্রিটিশ এমপি নিহত বা আক্রান্ত হলেন। মাত্র পাঁচ বছর আগে ইংল্যান্ডের পশ্চিম ইয়র্কশায়ারে নিজের নির্বাচনী এলাকার কর্মিসভায় যাওয়ার সময় গুলি ও ছুরিকাঘাত করে লেবার এমপি জো কক্সকে হত্যা করা হয়। ইইউ গণভোটের ঠিক এক সপ্তাহে আগে ঘটনাটি ঘটেছিল। ১৯৯০ সালে কনজারভেটিভ এমপি ইয়ান গোউ নিহত হওয়ার পর জো কক্সের মৃত্যুটি ছিল কোনো ব্রিটিশ এমপির প্রথম হত্যা। দক্ষিণপন্থী দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন ও বন্ধুভাবাপন্ন স্যার ডেভিড পুরো কমনস সভায় অমায়িক ও কঠোর পরিশ্রমী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর মৃত্যু দেশের জন্য একটি অন্ধকার মুহূর্ত এবং তাঁকে হারানোতে ব্রিটেন আরো দুর্বল হবে। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এক সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গণতন্ত্রে রাজনীতিবিদদের অবশ্যই ভোটারদের কাছে জবাবদিহি করতে এবং তাঁদের কাছাকাছি থাকতে হয়। তাই কর্মীদের জন্য কাজ করার সময় তাঁদের কেউ নিহত হওয়ার বিষয়টি গ্রহণযোগ্য নয়।

অন্য অনেক দেশের তুলনায় ব্রিটেনে কর্মিসভাগুলো ভোটারদের তাঁদের প্রতিনিধির সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের বড় সুযোগ এনে দেয়। ২০১০ সালে এক মুসলিম চরমপন্থী এক লেবার এমপির ওপর হামলা করার পর নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছিল। সম্ভবত এটি আর যথেষ্ট নয়। কমনস স্পিকার লিন্ডসে হোয়লি বলেছেন, পার্লামেন্ট সদস্যদের কিভাবে নিরাপদ রাখা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হবে। তবে স্যার ডেভিডের মৃত্যু উদার গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় মানসিকতা সম্পর্কে নিঃসন্দেহে ইঙ্গিতপূর্ণ এক বিতর্ক উসকে দেবে। যেসব কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে, তা এখনো আদালত দ্বারা প্রমাণিত হয়নি। অনেক নির্বাচিত প্রতিনিধির জন্য প্রাণনাশের হুমকিকে তাঁদের কাজের ভয়ংকর ও অনিবার্য অংশ হিসেবেই দেখা হয়। এটি অব্যাহত থাকার অর্থ হচ্ছে আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিজেই অসুস্থ।

ক্রোধের ক্রমবর্ধমান জোয়ার আমাদের অতি পক্ষপাতমূলক যুগের একটি অনিবার্য পরিণতি বলেই মনে হয়। ইন্টারনেটের ফলে জনগণের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিষয়টি নির্ধারিত হচ্ছে তারা কিভাবে তথ্যগুলো গ্রহণ করছে। ইন্টারনেট-পূর্ববর্তী সময়টা এমন ছিল না। এমপিদের সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যক্তিগত নির্যাতন সহ্য করতে হয়, তাঁদের অপ্রয়োজনীয় আক্রমণাত্মক ই-মেইল পাঠানো হয় এবং শারীরিকভাবে হুমকি সইতে হয়। নারী ও জাতিগত সংখ্যালঘু এমপিরা এখন নির্বিচারে বিদ্বেষের জোয়ারে আক্রান্ত হন। প্রায়ই অসহায়ত্বের অনুভূতি কাজে লাগিয়ে কিছু বিষয় সম্পর্কে মানুষের ক্রোধকে এমনভাবে বিকৃত করা হয়, যা আদৌ রাজনীতিবিদদের চিন্তার মধ্যে থাকে না।

জনসাধারণের চোখে যাঁরা থাকেন, তাঁদেরও একটি দায়িত্ব রয়েছে। ২০০৮ সালের আর্থিক মন্দার পর থেকে সমাজে ক্রমবর্ধমান বিভাজনের মধ্যে পশ্চিমা গণতন্ত্রজুড়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ বোধগম্য কারণেই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। যখন আবেগের মাত্রা কমিয়ে আনা উচিত, এমন একটা সময়ে প্রবীণ রাজনীতিবিদদের ভাষা ও আচরণ মানুষের আবেগকে উসকে দিতে পারে। আবার এটাও ঠিক যে জনগণেরও দায়বদ্ধতা রয়েছে। স্যার ডেভিড বলেছিলেন যে ২০১৭ সালের নির্বাচনী প্রচারের সময় যেভাবে তাঁকে আক্রমণ করা হয়েছিল, তাতে তিনি বিরক্ত হয়েছিলেন।

তাঁর মৃত্যু জনজীবনে আসলে কী ঘটছে, তা মনে করিয়ে দিচ্ছে। স্যার ডেভিড তাঁর ভোটারদের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন এবং প্রায় চার দশক ধরে পার্লামেন্টে ছিলেন। মানুষের ভিন্ন রাজনৈতিক মত থাকতে পারে; কিন্তু তাঁকে যারা চিনত, তাদের কেউই বলতে পারত না যে তিনি সমাজের জন্য সেরাটা চাইতেন না। পক্ষপাতদুষ্ট লোকদের একে অপরের প্রতি যে অবজ্ঞা রয়েছে, তা অবশ্যই রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে হবে। সহিষ্ণুতা ও সমঝোতার গুণাবলি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উপেক্ষা করা হচ্ছে। গত শুক্রবার বিকেলের নির্মম ঘটনা আমাদের সবাইকে মনে করিযে দেয় যে একটি দেশ হিসেবে আমাদের শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ গণতন্ত্রের জন্য একত্র হওয়া দরকার।

সূত্র : সম্পাদকীয়, দ্য গার্ডিয়ান (যুক্তরাজ্য)

ভাষান্তর : আফছার আহমেদ



সাতদিনের সেরা