kalerkantho

রবিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৮ নভেম্বর ২০২১। ২২ রবিউস সানি ১৪৪৩

বিশ্বের দৃষ্টি এখন কপ-২৬-এর দিকে

ধরিত্রী সরকার সবুজ

১৭ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বিশ্বের দৃষ্টি এখন কপ-২৬-এর দিকে

শিল্প বিপ্লবের পর থেকে বিশ্বের উষ্ণতা বাড়ছে। মূলত কলকারখানা, যানবাহনে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের ফলে বাতাসে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত ১০০ বছরে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় এক ডিগ্রি সেলসিয়াস। এখন সারা বিশ্বের চিন্তা, উদ্বেগ এবং পরিকল্পনা এ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত তাপমাত্রা বৃদ্ধির এই ধারাকে দেড় ডিগ্রি থেকে দুই ডিগ্রির মধ্যে আটকে রাখা। এ লক্ষ্য সামনে নিয়ে যুক্তরাজ্যের গ্লাসগো শহরে আগামী ৩১ অক্টোবর থেকে শুরু হচ্ছে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন, যা কপ-২৬ নামে সমধিক পরিচিত। সারা বিশ্বের পরিবেশসচেতন মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু এ সম্মেলন চলবে ১২ নভেম্বর পর্যন্ত। বিশ্বকে সব প্রাণীর জন্য বাসযোগ্য রাখার প্রত্যয় নিয়ে আমাদের চোখ এখন স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোর দিকে।

গ্রিনহাউস গ্যাস নামে পরিচিত কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড প্রভৃতি গ্যাসের বাতাসে উপস্থিতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাতাসে এ গ্যাসগুলো না থাকলে পৃথিবী রাতের বেলা থাকত একেবারেই হিমশীতল, যা যেকোনো প্রাণীর বসবাসের জন্য সম্পূর্ণ অনুপোযোগী। এ গ্যাসগুলোই সূর্য থেকে আসা তাপের কিছু অংশ আটকে রেখে পৃথিবীকে রাতের বেলা উষ্ণ রাখে।

শিল্প বিপ্লবের আগে উত্তর গোলার্ধে বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ ছিল ০.০২৮ শতাংশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত এর পরিমাণ তেমন একটা বৃদ্ধি পায়নি। কিন্তু তার পরই দ্রুত বাড়তে থাকে। ১৯৫০ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে এর পরিমাণ ০.০৩৫ শতাংশে দাঁড়ায়। বর্তমানে বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ ০.০৪ শতাংশ। বাতাসের ০.০২৮ শতাংশ কার্বন ডাই-অক্সাইড যে পরিমাণ তাপ পৃথিবীতে ধরে রাখত ০.০৪ শতাংশ কার্বন ডাই-অক্সাইড তার চেয়ে অনেক বেশি তাপ ধরে রাখছে। আর সে কারণেই পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে, ঘটছে ভূপৃষ্ঠের উষ্ণায়ন এবং জলবায়ুর পরিবর্তন।

১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিওডি জেনিরোর সম্মেলন দিয়ে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনের শুরু। তারপর চলে গেছে অনেক বছর। প্রতিবছর নভেম্বর বা ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হয় এ সম্মেলন। কপ-২৬ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালে যুক্তরাজ্যের গ্লাসগোতে। করোনা মহামারির কারণে সম্মেলন স্থগিত করা হয়েছিল। সে কপ-২৬ সম্মেলনটি এবারে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ৩১ অক্টোবর থেকে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা যতটুকু বাড়বে বলে ধারণা করা হয়েছিল, বৃদ্ধি হবে তার চেয়ে অনেক বেশি। এত দিন বিজ্ঞানীরা ধারণা করছিলেন, ২১০০ সালের মধ্যে পৃথিবীর সমুদ্রস্তরের উচ্চতা সর্বোচ্চ বৃদ্ধি পাবে এক মিটারের একটু কম। সর্বশেষ গবেষণাটি বলছে, সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়তে পারে তার প্রায় দ্বিগুণ।

‘প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস’ জার্নালে প্রকাশিত এ গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য বলছে, কার্বন নির্গমন যেভাবে চলছে তা কমানো না গেলে আগামী দিনের পৃথিবী এখনকার চেয়ে পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি উষ্ণতর হবে। সে ক্ষেত্রে ২১০০ সাল নাগাদ সমুদ্রস্তরের উচ্চতা ৬২ সেন্টিমিটার থেকে ২৩৮ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে।

২০১৩ সালে প্রকাশিত ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি)-এর পঞ্চম সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, এ শতাব্দীর শেষ নাগাদ সমুদ্রস্তরের উচ্চতা ৫২ থেকে ৯৮ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ওই হিসাব ছিল অনেক বেশি রক্ষণশীল। গত ৯ আগস্ট আইপিসিসির ষষ্ঠ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, যাতে বলা হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি বেশ দ্রুতগতিতে ঘটছে।

আশঙ্কার কথা হলো, সমুদ্রস্তরের উচ্চতা এভাবে বাড়লে ১.৭৯ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার পরিমাণ ভূমি পানির নিচে তলিয়ে যাবে, যার মধ্যে একটা অংশ থাকবে বাংলাদেশের। গবেষণাটিতে বলা হয়েছে, সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বেশ কিছু এলাকা মানুষের বসবাসের জন্য অযোগ্য হয়ে পড়বে এবং সেসব অঞ্চলের মানুষকে উদ্বাস্তু হয়ে অন্যত্র স্থানান্তরিত হতে হবে। তবে গবেষকরা এটাও বলছেন যে আগামী কয়েক দশকে কার্বন নির্গমনের হার কমানো গেলে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হতে পারে।

আমরা একটু পেছনে ফিরে দেখতে পারি কার্বন নির্গমনে বিশ্বব্যাপী প্রচেষ্টার সার্বিক অগ্রগতি কতটুকু। পোল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর কাতোভিচে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন কপ-২৪। ১৯৬টি দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছেন সে সম্মেলনে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন মোকাবেলায় ২০১৫ সালে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে অনুষ্ঠিত কপ-২১-এর প্রতিশ্রুতি কতটা পূরণ করা যায় সেটাই ছিল কপ-২৪-এর টান টান উত্তেজনা আর দুশ্চিন্তার বিষয়। ২০১৯ সালে স্পেনের মাদ্রিদে অনুষ্ঠিত কপ-২৫ সম্মেলন থেকে তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো অর্জন আসেনি।

প্যারিস সম্মেলনে বিশ্বের প্রায় ২০০টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি শিল্পযুগের আগের তুলনায় দুই ডিগ্রির মধ্যে এমনকি সম্ভব হলে দেড় ডিগ্রির মধ্যে রাখার বিষয়ে একমত হন। কিন্তু সময় যত গড়াচ্ছে প্যারিস জলবায়ু চুক্তি তত ঝুঁকির মুখে পড়ছে। জাতিসংঘ বলছে, এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে ২০৩০ সাল নাগাদ বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ বর্তমানের তুলনায় ৫৫ শতাংশ কমিয়ে আনতে হবে।

জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) জানিয়েছে, বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি শিল্পযুগের আগের তুলনায় দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ধরে রাখতে হলে প্যারিস চুক্তিতে স্বাক্ষর করা দেশগুলোকে তাদের প্রচেষ্টা ও উদ্যোগ আরো তিন গুণ বৃদ্ধি করতে হবে এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখতে হলে উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা বাড়াতে হবে পাঁচ গুণ।

সত্যিকার অর্থে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার ক্ষেত্রে বিশ্বের দেশগুলোকে প্রথমবারের মতো একতাবদ্ধ করতে পেরেছিল প্যারিস সম্মেলনের বৈশ্বিক জলবায়ু চুক্তি। তখন গ্রিনহাউস গ্যাস কমিয়ে আনতে ১৯৫টি দেশ যে ঐকমত্য পোষণ করেছে তাকে অনেক পর্যবেক্ষকই ঐতিহাসিক অর্জন বলে অভিহিত করেছেন। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, পৃথিবীতে আসন্ন জলবায়ু পরিবর্তনের বিপজ্জনক প্রভাব প্রতিরোধে প্যারিস চুক্তি দ্রুত কার্যকর করা প্রয়োজন।

প্যারিস চুক্তিতে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি দুই ডিগ্রি বা ১.৫ ডিগ্রির মধ্যে রাখা এবং জলবায়ু তহবিল গঠন ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের মধ্যে ছিল গাছ, মাটি ও সমুদ্র প্রাকৃতিকভাবে যতটা গ্রিনহাউস গ্যাস শোষণ করতে পারে ২০৫০ থেকে ২১০০ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ সেই পর্যায়ে নামিয়ে আনা ।

প্যারিস চুক্তিতে বলা হয়েছে উন্নত দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় উন্নয়নশীল দেশগুলোকে প্রতিবছর ১০০ বিলিয়ন ডলার অর্থ বরাদ্দ দেবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত উন্নত এবং ধনী দেশগুলোর যা উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে তাতে ১০০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি পূরণের লক্ষণ দেখা যায় না। আমরা আশা করছি গ্লাসগোর কপ-২৬ সম্মেলনটিও কপ-২১-এর মতো উল্লেখযোগ্য সম্মেলন হবে এবং ১০০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ বাস্তবায়নের সত্যিকার রূপরেখা এখান থেকে পাওয়া যাবে।

কিয়োটো প্রটোকলের হাত ধরে আমরা প্যারিস অ্যাগ্রিমেন্টের পথে এসেছি। কিন্তু এই দুয়ের মধ্যে কার্বন মার্কেট বা কার্বন ট্রেডিংয়ের সমন্বয় করে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়নি গত কয়েকটি কপ সম্মেলনে। প্যারিস রুল বুক তাই আজ পর্যন্ত পরিপূর্ণভাবে তৈরি করা যায়নি। বিশ্বের জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ, দ্বীপরাষ্ট্র এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য কার্বন ট্রেডিং বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো জরুরি।

আসন্ন কপ প্রেসিডেন্সি যুক্তরাজ্যের মন্ত্রী আলোক শর্মার প্রচেষ্টা আমাদের আশান্বিত করে। কপ-২৬ সম্মেলনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে অগ্রসর হচ্ছেন তিনি। সে লক্ষ্য পূরণে করোনা মহামারির মধ্যেও তিনি অনেক দেশ ভ্রমণ করেছেন এবং রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। ৪০টি দেশের মন্ত্রীদের নিয়ে জুলাই মাসে লন্ডনে দুই দিনের একটি সফল জুলাই মিনিস্টেরিয়াল আয়োজন করেছেন। আমরা আশা করছি, গ্লাসগোর কপ-২৬ সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় এমন কিছু সিদ্ধান্ত আসবে, যা প্যারিসের কপ-২১-এর মতোই স্মরণীয় করে রাখবে গ্লাসগোর কপ-২৬ সম্মেলনকে।

 লেখক : পরিবেশবিষয়ক লেখক ও গবেষক



সাতদিনের সেরা