kalerkantho

রবিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৮ নভেম্বর ২০২১। ২২ রবিউস সানি ১৪৪৩

এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ

আবদুল মান্নান

১৭ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ

গত রবিবার বাংলাদেশে ঘটে গেল একটি যুগান্তকারী ঘটনা। পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্রে স্থাপিত হলো এই বিদ্যুেকন্দ্রের প্রথম ইউনিটে রিঅ্যাক্টর প্রেসার ভেসেল বা চুল্লি। এই চুল্লি স্থাপন এ বিদ্যুেকন্দ্রের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এর ফলে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে পরমাণু শক্তি ক্লাবের ৩৩ নম্বর সদস্য হলো। আমাদের প্রজন্ম, যাঁদের বয়স পঞ্চাশ বা ষাটোর্ধ্ব তাঁদের জন্য এমন সব উন্নয়ন কর্মকাণ্ড অনেকটা স্বপ্নযাত্রার মতো। কারণ স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল রিলিফের গম খেয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইন দিতে হয়েছিল রিলিফের একটি শার্টের কাপড়ের জন্য। ১৯৭৩ সালের আগস্ট মাসে ৪৫০ টাকা বেতনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিই প্রভাষক হিসেবে। উপাচার্য সাহিত্যিক আবুল ফজল। তিনি বঙ্গবন্ধুকে বিশেষ অনুরোধ করে শিক্ষক ও কর্মচারীদের জন্য রেশনের ব্যবস্থা করলেন। ১৫ দিন অন্তর দুই কেজি রিলিফের গম আর আধা কেজি চিনি। কেন বাংলাদেশের বর্তমান সার্বিক পরিস্থিতি দেখে স্বপ্নযাত্রা বলি তা এই প্রজন্মের মানুষ বুঝবে আশা করি। চোখের সামনেই বদলে যেতে দেখলাম দেশটাকে। এমন ভাগ্য খুব কম মানুষেরই হয়।

গত বছর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) হিসাব করে বলেছিল, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় গড়ে ভারতের চেয়ে বেশি। গত মঙ্গলবার আইএমএফ তাদের ‘ইকোনমিক আউটলুকে’ ঘোষণা করেছে, এ বছরও বাংলাদেশের এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতি ৩০০ বিলিয়ন ডলারের। বর্তমান ধারা অব্যাহত রাখতে পারলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির পরিমাণ হবে ৫১৬.২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ডেনমার্ক, সিঙ্গাপুর ও হংকংয়ের চেয়েও বেশি হবে (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ১৩ অক্টোবর ২০২১)। বিশ্বব্যাংক থেকে বিশ্বমুদ্রা তহিবল, সবার মতে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের ৪১তম বৃহৎ অর্থনীতি। ২০৩০ সাল নাগাদ তা ২৪তম হতে পারে। তবে কভিড অতিমারির কারণে হিসাব কিছুটা এদিক-ওদিকও হতে পারে। এই বিশ্ব অতিমারির সময়ও যে ২৩টি দেশ অর্থনীতির গতিকে সচল রাখতে পেরেছে তার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। বিশ্বসম্প্রদায় এটাও স্বীকার করেছে, কভিড অতিমারি মোকাবেলায় বাংলাদেশ এই অঞ্চলে অন্য সবার চেয়ে ভালো করেছে। অতিমারি ব্যবস্থাপনায়ও বাংলাদেশ পিছিয়ে নেই। জাপানের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক নিক্কির মতে, কভিড-১৯ সূচকে করোনা মোকাবেলায় ১২১ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ২৬তম আর দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শীর্ষে। এটি স্বীকার করতে হবে, শুরুতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এই দুর্যোগ মোকাবেলায় কিছুটা আনাড়িপনার পরিচয় দিয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপে তা দ্রুততম সময়ে দূর হয়েছে। প্রথমত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিষয়টির ভয়াবহতা বুঝতে পারেনি। প্রস্তুতিও তেমন ছিল না। অন্যদিকে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে বাংলাদেশ আগাম মূল্য পরিশোধ করে যে ৩০ কোটি ডোজ টিকা ক্রয়ের চুক্তি করেছিল তার সবটা সময়মতো সেরাম সরবরাহ করতে পারেনি। এর কারণ ভারতে কভিড-১৯ অতিমারির হঠাৎ ভয়াবহ আক্রমণ, যা মোকাবেলা করার জন্য ভারতের আগাম প্রস্তুতির অভাব ছিল। চটজলদি ব্যবস্থা হিসেবে তারা ভারত থেকে সব ধরনের টিকা রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। এটি ছিল একটি অনুচিত কাজ। তবে বাংলাদেশ বসে থাকেনি। শেখ হাসিনার নির্দেশে অন্যান্য দেশের টিকা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে নগদ অর্থে টিকা আনার ব্যবস্থা করা হলো। কিছু পাওয়া গেল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কোভ্যাক্স প্রকল্পের অধীনে। অন্যান্য দেশের তুলনায় আরো একটি বিষয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে আছে, তা হচ্ছে দেশের সব মানুষকে বিনা মূল্যে টিকা সরবরাহের ব্যবস্থা। ভারতে প্রতি ডোজ টিকা ৫০০ থেকে ৮০০ রুপি দিয়ে কিনতে হয়েছে। এখন  সেরাম ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের পাওনা টিকা সরবরাহ শুরু করেছে।

অনেকে প্রশ্ন করেন যেখানে ইউরোপ, আমেরিকা অথবা পাশের দেশ ভারত যখন অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে হিমশিম খেয়েছে, যেখানে বিশ্ব অর্থনীতি ৬ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে সেখানে বাংলাদেশ কী জাদুমন্ত্রবলে তা ৪ শতাংশের ওপরে রাখতে পেরেছে? সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ঘোষণা করেছে, বাংলাদেশের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশ হবে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ যৌথভাবে ঘোষণা করেছে, দক্ষিণ এশিয়ায় তৃতীয় সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি হবে বাংলাদেশের। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধিকে ধরে রাখার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান কৃষি আর ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশের শ্রমিকরাও দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রেখেছেন।

শুরুর বাংলাদেশে পাকা রাস্তা বলতে ছিল ঢাকা, চট্টগ্রামের মতো কয়েকটি শহরে। এখন বাংলাদেশের প্রায় সব গ্রামে পাকা সড়ক হয়েছে। কোনো এক গ্রামে যেতে যেখানে আগে কমপক্ষে এক দিন সময় লাগত, সেখানে এখন দিনে গিয়ে দিনে আসা যায়। দেশের প্রায় ৯৯ শতাংশ বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ আছে। আমি নিজে চট্টগ্রাম শহরের বাসিন্দা। কলেজ পর্যন্ত পড়ালেখা করেছি হারিকেনের আলোয়। যে বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছিল শূন্য বৈদেশিক মুদ্রার তহবিল দিয়ে সেই বাংলাদেশে বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৪৮ মিলিয়ন ডলার। ধারদেনার ব্যবস্থা না হলে বাংলাদেশের বার্ষিক বাজেট প্রস্তুত সম্ভব ছিল না। সেই পরিস্থিতি আজ সম্পূর্ণ বদলে গেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ তার বাজেটের প্রায় ৯০ শতাংশ নিজের উৎস থেকে অর্থায়ন করে। উন্নয়ন বাজেটের ৮ শতাংশ আসে বৈদেশিক ঋণ থেকে আর ২ শতাংশ আসে অফেরতযোগ্য সহায়তা (গ্রান্ট) হিসেবে। আর সেই বাংলাদেশ বন্ধুপ্রতিম দেশ শ্রীলঙ্কাকে সম্প্রতি ২৫০ মিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছে। এর আগে নেপাল ও শ্রীলঙ্কাকে খাদ্য সহায়তা দিয়েছে। বাংলাদেশ বছরখানেক আগে ফিলিপাইনে ১০ লাখ টন চাল রপ্তানি করেছে।

একটি দেশের পরিবর্তন চলমান। কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিবর্তন থমকে গিয়েছিল সেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরপর। এরপর একে একে দুজন সামরিক শাসক এসেছেন। ১৯৯০ সালে এরশাদের পতনের পর দেশের প্রথম সেনা শাসক জেনারেল জিয়ার স্ত্রী খালেদা জিয়া নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় এসেছেন; কিন্তু তেমন কিছু একটা করতে পারেননি। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় এনেছেন ঠিক; কিন্তু তাঁর প্রশাসন ছিল অনেকটা জিয়া আর এরশাদ আমলের, তাদের সঙ্গে যোগ হয়েছিলেন খালেদা জিয়ার শাসনামলের কিছু কর্মকর্তা। তাঁদের লক্ষ্যই ছিল শেখ হাসিনাকে পেছন থেকে টেনে ধরা আর বাংলাদেশকে মিনি পাকিস্তানে রূপান্তর করার ধারা অব্যাহত রাখা। এর পরও সেই যাত্রায় শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে উন্নয়নের সড়কে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। মনোযোগ দিয়েছিলেন দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন প্রতিটি ইউনিয়নে কমিউনিটি ক্লিনিক। জোর দিয়েছিলেন নারীশিক্ষাসহ নারীর ক্ষমতায়নে। প্রথমবারের মতো দেশের সেনাবাহিনীতে নারী নিয়োগ শুরু হয়। কিন্তু ২০০১ সালে খালেদা জিয়া ফের ক্ষমতায় এসে এই সব কিছু বন্ধ করে দেন। দেশে তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমান হাওয়া ভবনকেন্দ্রিক একটি সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা চালু করেন। নিজে হয়ে ওঠেন দুর্নীতির বরপুত্র। এরপর এলো এক-এগারোর সরকার। যদিও এই সরকার এসেছিল একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার নির্বাচিত করে ক্ষমতা হস্তান্তর করার জন্য। কিন্তু তারা নির্বাচন করা বাদ দিয়ে যা তাদের করার কথা নয় তার সব কিছুই করেছে। সংবিধান তাদের ক্ষমতা দিয়েছিল তিন মাসের মধ্যে নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে; কিন্তু তারা বুঝতে পেরেছিল ক্ষমতার মজাই আলাদা। তাই থেকে গিয়েছিল দুই বছর। সব শেষে এক গণবিক্ষোভের মুখে তারা নির্বাচন দিতে বাধ্য হয় এবং সেই নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা ২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত এক ধস নামানো বিজয় লাভ করে। সেই থেকে বাংলাদেশের নবযাত্রার শুরু। দেশটির নিজের অর্থায়নে নির্মিত হয়ে গেল পদ্মা সেতু। কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে সুড়ঙ্গপথ নির্মাণ করে নদীর এপার-ওপারের মধ্যে সংযোগ সৃষ্টি করে দিল সরকার। ওপারে এখন গড়ে উঠবে আরেকটি চট্টগ্রাম, যা হবে মূলত একটি শিল্পনগরী, কর্মসংস্থান হবে কয়েক হাজার মানুষের। পদ্মার তলদেশ দিয়ে আরেকটি সুড়ঙ্গপথ তৈরির পরিকল্পনা চলছে। এক সময় এই ঢাকা বা চট্টগ্রামে গরুরগাড়ি চলত। এখন সেখানে চলবে মেট্রো রেল। যখন রাশিয়া মহাশূন্যে প্রথম উপগ্রহ (১৯৫৭ সাল, স্পুিনক) পাঠাল, এ দেশের মানুষ তখন অনেকটা অবিশ্বাসের সঙ্গে তা শুনল। এখন বাংলাদেশের উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু-১ মহাশূন্যে ঘুরছে। দ্বিতীয়টাও যাবে মহাশূন্যে দু-এক বছরের মধ্যে। এত সব কর্মযজ্ঞ ঘটে গেল আমাদের প্রজন্মের চোখের সামনে। নির্মোহভাবে চিন্তা করলে যেকোনো বিবেকবান মানুষ বর্তমান সরকারকে বাহবা দেবে। অবশ্য সরকারের সব অর্জনকে কিছুটা হলেও কালিমালিপ্ত করেছে সরকারি কিছু কর্মচারীর দুর্নীতি আর চরম অযোগ্যতা। তবে এবারের সরকারের সঙ্গে আগের সরকারগুলোর তফাত হচ্ছে, আগে এসব অপকর্মের বিচার হতো না, এখন হয়।

শেখ হাসিনার সামনে আরো কিছু বড় চ্যালেঞ্জ আছে। তাঁর চারপাশে একটি অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করা হয়েছে। সেখানে তিনি বুঝতে পারেন না এখন আওয়ামী লীগে কতজন জামায়াত আর কতজন বিএনপি। বুঝতে পারেন না কারা অর্থের বিনিময়ে মনোনয়ন, রাষ্ট্রীয় পদক, গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করেন। অনেক জায়গায় আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ নামধারীরা। প্রধানমন্ত্রীকে এই দেয়াল ভাঙতে হবে।

স্বাধীন বাংলাদেশের শুরুটার সাক্ষী আমার প্রজন্ম। ৫০ বছরে তার উত্থান, থমকে যাওয়া, কখনো কখনো পতন দেখেছি। আশা করছি আরো কিছুদিন আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখবেন শত বাধা আর ষড়যন্ত্র ডিঙিয়ে শেখ হাসিনার হাত ধরে বাংলাদেশের আরো কিছু অগ্রযাত্রা দেখতে।

লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক



সাতদিনের সেরা