kalerkantho

বুধবার । ১১ কার্তিক ১৪২৮। ২৭ অক্টোবর ২০২১। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

অসাম্প্রদায়িকতার মেলবন্ধন

কালিদাস ভক্ত

১৪ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অসাম্প্রদায়িকতার মেলবন্ধন

ধরণিতে শারদের আগমনে প্রকৃতিতে নানা বৈচিত্র্য বিরাজ করে। মাঠে মাঠে ঘাসে ঘাসে শিশিরের নরম আলপনা আঁকে। শিউলি ফুলগুলো ঝরঝর করে পড়ে শারদের আঙিনায়। ধানের ক্ষেতে কোমলতা-সরলতার প্রতীক হয়ে দামাল হাওয়া দোল খেয়ে যায়। অতি সুনীল আকাশে মেঘের ভেলা উড়ে উড়ে চলে, সেই ছায়া পড়ে শান্ত-স্নিগ্ধ প্রকৃতিতে। তটিনীর তটে বিকশিত শুভ্র প্রাণের নয়নাভিরাম কাশফুল শুভ্রতার প্রতীক হয়ে চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। বনে বনে বিহগকুল আনন্দে-কলকাকলিতে মুখরিত করে। ভ্রমরেরা আলোর বন্যায় মেতে বেড়ায়। আকাশে বলাকা বেঁধে রাজহংসের দল শাঁইশাঁই আওয়াজ তুলে উড়ে চলে মানস সরোবরের পানে। বাংলার এই সৌন্দর্যময় পরিবেশে, মায়াময় ক্ষণে নিশ্চয়ই কোনো শুভবার্তা শোনা যাবে। আমাদের প্রাণের দেবী মহামায়া এই মহাতিথিতে মর্তে অবতরণ করে করুণার আঁখি উন্মিলন করেছেন। তিনি নিরাকার হয়েও যেকোনো আকার ধারণ করতে পারেন। তিনি বিশ্বকার্যের জন্য অপ্রপঞ্চ হতে প্রপঞ্চে অবতীর্ণ হয়েছেন। তিনি চিন্ময় জগৎ থেকে কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য স্বেচ্ছায় সাকাররূপে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছেন। তিনি শক্তির দেবী। মাতৃরূপী আদ্যশক্তি মহামায়া। তিনি মহাজাগতিক শক্তির অধিশ্বরী। তিনি দুর্গতি নাশ করেন বলে তাঁকে দুর্গা বলা হয়। আবার তিনি দুর্গম নামের অসুরকে বিনাশ করেছেন তাই তাঁর নাম দুর্গা। মার্কেণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্গত ‘শ্রীশ্রী চণ্ডী’ নামের গ্রন্থে দুর্গার আবির্ভাবের কাহিনি ও মাহাত্ম্য বর্ণনা করা হয়েছে। পৃথিবীতে যখন খুব খারাপ অবস্থা বিরাজ করে, অশুভ শক্তির কাছে শুভ শক্তি পরাস্ত, সমাজে বিরাজ করে চরম বিশৃঙ্খলা তখন দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালনের জন্য সব অশান্তি-অরাজকতা বিদূরীভূত করে দেবী মহামায়া শান্তির আবাস নির্মাণ করেন।

এবার সপ্তমী মঙ্গলবার হওয়ায় মা আসবেন ঘোড়ায় চড়ে। এ সম্পর্কে শাস্ত্রে বলা হয়েছে—‘ছত্রভঙ্গন্তরঙ্গমে’—তাই মর্তে চরম বিশৃঙ্খলা, সেই সঙ্গে করোনার মহামারি বহু ক্ষয়ক্ষতি থাকতেই পারে। আবার দশমী শুক্রবার হওয়ায় মা যাবেন দোলায়, তাই তার ফলও ভালো নয়। ‘দোলাং মড়কং ভবেৎ’ দোলায় গমনের ফল মড়ক। গত বছর দেবী দোলায় আগমনের ফলে পৃথিবীজুড়ে করোনার মতো রোগ মহামারি আকার ধারণ করছে। হাতিতে গমনের ফলে খাদ্যশস্যের ফলন ভালো হয়েছিল। এভাবে সঠিক বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করা গেছে। তবে তিনি মাতৃরূপা পরম দয়ালু। জগতের কল্যাণের জন্য, সন্তানের মঙ্গলের জন্য দুঃখ-ব্যথা লাঘব করবেন। সে জন্য তাঁর পূজায়, তাঁর প্রার্থনায় রত হতে হয়। তাঁর আবির্ভাবের কাহিনিতে শ্রীশ্রী চণ্ডীতে এ রকম দৃষ্টান্তই প্রতিভাত হয়েছে। এখানে ১৩টি অধ্যায়ে ৭০০ শ্লোক আছে। শ্রীশ্রী চণ্ডীতে বলা হয়েছে—ব্রহ্মার বরে বলীয়ান হয়ে মহিষাসুর নামের এক অসুর দেবতাদের পরাজিত করে স্বর্গরাজ্য দখল করে। দেবতারা স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হন। স্বর্গরাজ ইন্দ্রসহ সব দেবতা মিলিত হয়ে ব্রহ্মা ও শিবের কাছে যান। ব্রহ্মার পরামর্শে সবাই মিলে বিষ্ণুর কাছে যান। মহিষাসুরের অত্যাচারের কাহিনি শুনে সবাই অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন। তাঁদের শরীর থেকে তেজ বেরোতে থাকে। সব দেবতার তেজ একত্র হয়ে এক তেজঃপুঞ্জের সৃষ্টি হয়। সেই তেজঃপুঞ্জ এক নারীর রূপ নেয়। এই নারীই দেবী দুর্গা। ভারতবর্ষে প্রাচীন কাল থেকে শক্তির পূজা চলে আসছে। তবে বঙ্গদেশে এর প্রসার ও প্রচার সর্বাধিকভাবে পরিলক্ষিত হয়। গবেষকদের মতে, সম্রাট আকবরের সময়ে ষোড়শ শতকের শেষের দিকে বর্তমান রূপের শারদীয় দুর্গাপূজা প্রচলিত হয়। পূর্ব বাংলায় দুর্গাপূজা সূচিত হয় উত্তরবঙ্গের রাজশাহী অঞ্চলের রাজা কংসনারায়ণের সময়ে।

মহামায়া দুর্গারূপে দুর্ধর্ষ অসুররাজ মহিষাসুরকে বধ করেছিলেন। অসুরদের অত্যাচার থেকে দেবগণ মুক্ত হলেন, ফিরে পেলেন তাঁদের প্রিয় স্বর্গরাজ্য। দেবী দুর্গার আবাহনের মধ্য দিয়ে ধরামাঝে নারী শক্তি প্রকাশ পায়। বিভিন্ন মনীষী দুর্গারূপেই নারীকে কল্পনার কথা বলেছেন। তাঁর পূজার মাধ্যমে নারীর ভূমিকাকে আরো বড় করে দেখানো হয়েছে। দেবী দুর্গাকে জগজ্জননীরূপে বন্দনা করার মাধ্যমে নারীকেও মাতৃরূপে রূপায়িত করা হয়েছে। দুর্গা মহিষাসুর বধকারী হিসেবে মহাশক্তি দিয়ে অপশক্তি অপসারিত করেছেন। এমনিভাবে দেবী দুর্গা সৃষ্টির প্রতীক, সমৃদ্ধির প্রতীক, সুরক্ষার প্রতীক। নারীও মাতৃরূপে সৃষ্টির প্রতীক, সন্তান জন্ম দিয়ে সন্তানের মুখে আহার তুলে দিয়ে, সন্তানকে বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করেন। মহামহিমাময় নারী জগত্সংসারে ভালোবাসা দিয়ে, প্রেরণা দিয়ে, শক্তি দিয়ে বিজয়ী করে পরিত্রাণ করছেন। এই মাতৃসম নারী যেন বঞ্চনার শিকার না হন। নারীও যেন তব কর্ম দ্বারা খারাপ প্রবৃত্তির প্রসূত কলঙ্কিত না হন। সবাই মিলে মহত্তম গুণ দিয়ে ধরাকে আনন্দধাম করতে হবে। দেবী দুর্গার আবাহন হোক অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির প্রকাশ। শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিপালনের আহ্বান। অসত্যের বিরুদ্ধে সত্যের প্রকাশ। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে অসাম্প্রদায়িকতার মেলবন্ধন। আত্মকেন্দ্রিকতা থেকে উদার ধারণার উন্মেষ। অসুরশক্তির বিরুদ্ধে সুরশক্তির জয়গান। শত বিপদ থেকে মা যেন সন্তানকে রক্ষা করেন।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, সংস্কৃত বিভাগ, ঢাকা বিশশুবিদ্যালয়



সাতদিনের সেরা