kalerkantho

বুধবার । ১১ কার্তিক ১৪২৮। ২৭ অক্টোবর ২০২১। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

দুর্গতিনাশিনী

ড. মাধবী রাণী চন্দ

১৪ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দুর্গতিনাশিনী

দুর্গতিনাশিনী মা। আনন্দস্রোতে ধরাকে স্নান করাতে তিনি আসছেন। আকাশে-বাতাসে এক অনির্বচনীয় আগমনী সংগীত। শরতের আগমনে সাদা কাশফুল, নীল আকাশ, মেঘ ও রৌদ্রের খেলা এবং শিউলির সমারোহের মধ্যেই দেবী দুর্গার আগমন। দৈনন্দিন জীবনে অশেষ দুঃখ সইতে সইতে মানুষ অতিষ্ঠ। সেই হতাশাময় জীবনে এক ঝলক আনন্দ বয়ে আনবেন আমাদের মা আনন্দময়ী।

শরৎকালে মায়ের অকালবোধন। দুর্গাপূজা বাঙালির জাতীয় উৎসব। আর এ উৎসবের জন্য আমাদের প্রস্তুতি সারা বছর ধরেই। আজকাল গুটিকয়েক বনেদি বাড়ি ছাড়া বাড়ির পূজা উঠেই গেছে। এখন সর্বজনীন পূজার মাতামাতি।

দুর্গা শব্দটি বিশ্লেষণ করলে তার স্বরূপের ব্যাখ্যা রয়েছে প্রতিটি বর্ণের মধ্যেই। শাস্ত্রে বলে ‘দ’ অক্ষরটি দৈত্যনাশক, ‘উ’ কার বিঘ্ননাশক, ‘র’ কার বা রেফ সর্বরোগনাশক, ‘গ’ কার পাপনাশক, এবং ‘আ’-কার শত্রুনাশক। দৈত্য, বিঘ্ন, রোগ, পাপ ও শত্রু থেকে যিনি রক্ষা করেন তিনি দুর্গা। যত দূর জানা যায়, দুর্গাপূজা প্রথম করেন রাজা সুরথ ও বৈশ্য সমাধি। তিন বছর পূজা করে রাজা সুরথ নিজ রাজ্য শত্রুর হাত থেকে উদ্ধার করেন। আর সমাধি বৈশ্য কৈবল্য লাভ করেন। তাঁদের পূজা বসন্তকালে হয়েছিল। তাই তাকে বাসন্তী পূজা বলা হয়। ত্রেতাযুগে শ্রীরামচন্দ্র রাবণের কবল থেকে সীতাকে উদ্ধারের জন্য শরৎকালে দেবীর পূজা করেন। শরৎকালে হয়েছিল বলে এর নাম শারদীয় দুর্গাপূজা। এটিকে অকালবোধন বলা হয়। মানুষের হৃদয়ে যে দৈব ভাব আছে তার জাগরণই বোধন। আত্মজ্ঞান লাভই এই পূজার বিশেষ অর্থ।

দেবী মহামায়া জগতের কল্যাণ সাধনের জন্য অনেক অসুরকে বধ করেছেন, কিন্তু মহিষাসুর ব্যতীত অন্য কোনো অসুর দেবীর পদতলে আশ্রয় লাভ করেননি। কেন?

পুরাণে আছে অপুত্রক রম্ভ নামে এক দৈত্য দীর্ঘকাল মহাদেবের তপস্যা করে এই বর পান যে, তিনি মহাপরাক্রমশালী হবেন। পরবর্তীকালে তাঁর এক পুত্র জন্মলাভ করে, তার নাম মহিষাসুর। ব্রহ্মার বরে অবলা নারী ব্যতীত আর সবার নিকট ছিল সে অবধ্য। তার অত্যাচারে সমস্ত জগৎ শঙ্কিত হয়ে পড়ল। তার অত্যাচার থেকে মুক্তি পেতে দেবতারা ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বরের শরণাগত হলেন। সম্মিলিত দেবগণের পুঞ্জীভূত তেজোরাশি দিয়ে গঠিত হলো এক সুন্দরী নারী মূর্তি। এরপর দেবতারা তাঁকে বিভিন্ন অস্ত্র দান করলেন। মহাদেব দিলেন ত্রিশূল, বিষ্ণু দিলেন চক্র, অগ্নি দিলেন শক্তি, ইন্দ্র দিলেন বজ ও ঘণ্টা, যম দিলেন দণ্ড। অন্য দেবতারা দিলেন আরো নানা অস্ত্র। দেবীরা তাঁকে নানা অলংকারে সজ্জিত করিয়ে দিলেন। তাঁর জ্যোতির্ময়ী রূপ দেখে মনে হলো যেন সহস্র সূর্য আকাশে উদিত হয়েছে। হিমালয় দিলেন দেবীর বাহন সিংহ। ভয়ংকর যুদ্ধ শুরু হলো। মহিষাসুরের সব চেষ্টা ব্যর্থ হলো। যুদ্ধ দেবীর হাতে মহিষাসুর নিহত হলো। মৃত্যুকালে মহিষাসুর দেবীর কাছে বর প্রার্থনা করে, ‘আমি যেন আপনার পদসেবা থেকে বঞ্চিত না হই।’ মহিষাসুরের প্রার্থনায় প্রীত হয়ে দেবী বর প্রদান করেন, ‘হে মহিষাসুর তুমি আমার হস্তে নিহত হলেও কোনোকালে তুমি আমার চরণ ত্যাগ করবে না। আমার পূজা যেখানেই হবে, সে স্থলেই তোমার এই মহিষাসুর শরীরের পূজা হবে।’ কৃতজ্ঞচিত্তে দেবতারা দেবীর স্তবস্তুতি করলেন। দেবী প্রসন্ন হয়ে আশীর্বাদ করলেন জগতের কল্যাণের জন্য তিনি বারেবারে আবির্ভূতা হবেন এবং সব বিঘ্ননাশ করে দেবতাদের এবং মানুষের সুখ-শান্তি দান করবেন।

বাঙালি আবেগপ্রবণ জাতি। বিভিন্ন লোকগাথা ও পুরাণগুলোর কাহিনি থেকেই মহাজাগতিক দেব-দেবীরা চলে এসেছেন একেবারে আমাদের ঘরে। বাঙালি পণ্ডিতদের ধারণা হিমালয়ের অপূর্ব স্বর্গরাজ্যে কৈলাসে শিব-দুর্গা পতি-পত্নীরূপে বাস করেন। তাঁদের চারটি সন্তান—সিদ্ধিদাতা গণেশ, সম্পদদাত্রী লক্ষ্মী, বিদ্যাদেবী সরস্বতী এবং শৌর্যের প্রতীক কার্তিক। আর মা দুর্গা হলো বাঙালি কন্যার একটি রূপ। গভীরভাবে লক্ষ করলে বোঝা যাবে মায়ের এই চারটি সন্তান যেন সমাজের চার বর্ণের প্রতীক। সমাজের চার বর্ণ হলো বুদ্ধিজীবী ব্রাহ্মণ, শাসকশ্রেণি-ক্ষত্রিয়, বৃত্তিজীবী-বৈশ্য এবং শ্রমজীবী-শূদ্র। সরস্বতী-বুদ্ধি ও জ্ঞানের অধিষ্ঠাত্রী ও সত্ত্বগুণস্বরূপিণী। তাই তিনি ব্রাহ্মণগণের প্রতীক। বীরত্ব ও তেজের প্রতীক কার্তিক ক্ষত্রিয় শক্তির প্রতিনিধিত্ব করছেন। দেবী লক্ষ্মী অন্ন, শস্য, সমৃদ্ধি ও ধন-সম্পদের অধিষ্ঠাত্রী, যা বৈশ্যদের দ্বারা সম্পাদিত কৃষিকাজ ও ব্যবসার মাধ্যমে পূর্ণ হয়। আর গণপতি গণেশ যেন গণদেবতারূপে শ্রমিক শ্রেণিকে বা শূদ্রদের কর্মদক্ষতা প্রদান করছেন। চারটি বর্ণেরই গুরুত্ব আছে। শরীরে মাথার যেমন প্রয়োজন, তেমনি পায়েরও প্রয়োজন। সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ঠিকমতো কাজ করলে তবেই শরীর সুস্থ থাকবে।

দুর্গাপূজা বাঙালির অন্তরের আরাধনা। পুত্র, কন্যা পরিবেষ্টিতা, পরিবার-সমন্বিতা ভগবতী দুর্গার আরাধনা বাংলার মাতৃবন্দনার একটি উল্লেখযোগ্য সম্পদ ও বৈশিষ্ট্য। সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী এই তিন দিন দেবী পিতৃগৃহে অবস্থান করেন। তার পরই আসে বেদনাবিধুর দশমী। সেই দিন আপামর বাঙালির অশ্রুসজল পুনঃআহ্বানের মধ্যেই মৃন্ময়ী মূর্তি জলে অবগাহন করে।

এই শারদোৎসবে রথযাত্রার দিন দেবীর কাঠামো তৈরি থেকে শুরু করে বিসর্জন পর্যন্ত দুর্গাপূজার উপকরণাদি সংগ্রহের জন্য মালি, তাঁতি, পতিতা, কর্মকার, কুম্ভকার সবাই যুক্ত থাকেন। তাই এই পূজা মহামিলনের পূজা।

লেখক : অধ্যাপক, সংস্কৃত বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 



সাতদিনের সেরা