kalerkantho

সোমবার । ৯ কার্তিক ১৪২৮। ২৫ অক্টোবর ২০২১। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

বাংলাদেশে কৃষি গবেষণার গুরুত্ব ও কেজিএফ

জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস

১৩ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বাংলাদেশে কৃষি গবেষণার গুরুত্ব ও কেজিএফ

কৃষি গবেষণা একটি অতি প্রয়োজনীয় ও চলমান প্রক্রিয়া। বাংলাদেশের বিভিন্ন কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কৃষির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, এমনকি কৃষির সঙ্গে সরাসরি জড়িত নয় এমন অনেক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও কৃষি নিয়ে গবেষণা করে থাকে। এ ছাড়া অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও করপোরেট সংস্থা ইদানীং কৃষি নিয়ে গবেষণা করছে।

গবেষণা চালিয়ে নিতে অর্থের দরকার হয়। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো (কৃষি মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়) সে অর্থ প্রয়োজনমাফিক দেশের সব সরকারি কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বরাদ্দ দিয়ে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য এই বরাদ্দ আসে সরকারের প্রধানত শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে। এ ছাড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বা অন্য কিছু মন্ত্রণালয়-প্রতিষ্ঠান-নির্বিশেষে কৃষিসংশ্লিষ্ট গবেষণার জন্য কিছু বরাদ্দ দিয়ে থাকে। কৃষির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর বার্ষিক উন্নয়ন খাত থেকে গবেষণার ব্যয়ভার বহন করা হয়। কিন্তু এই ব্যয়ভার ব্যাপক কৃষি সমস্যা সমাধানের জন্য সব সময় যথেষ্ট নয়। এ জন্য সরকার কখনো কর্মসূচি (মোটামুটি তিন বছরের জন্য পাঁচ থেকে ১০ কোটি টাকার মধ্যে) কখনো বা প্রকল্প (পাঁচ বছরের জন্য ১০ কোটির বেশি টাকার দরকার হলে) আকারে অতিরিক্ত কিছু অর্থ বরাদ্দ করে থাকে। কর্মসূচির জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় এবং প্রকল্পের জন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অনুমতি প্রয়োজন হয়। তবে এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট গবেষণাপ্রতিষ্ঠানকেই সক্রিয় ভূমিকা নিতে হয়। অর্থাৎ কর্মসূচি বা প্রকল্প তৈরি করে মন্ত্রণালয় বরাবর জমা দিতে হয়।

এখানে এক বা একাধিক প্রতিষ্ঠান জড়িত থাকতে পারে। আর কর্মসূচি বা প্রকল্পের উদ্দেশ্য নির্দিষ্ট থাকে সমসাময়িক কোনো সমস্যানির্ভর এবং অঞ্চলভিত্তিক, যা দিয়ে কৃষি গবেষণায় সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ কৃষির উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধি করে কৃষকের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে সহায়তা করা যায়। এভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য গবেষণার বরাদ্দ নিশ্চিত করতে বেশ জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে হয়। সময়ও লাগে বেশ। এসব জটিলতা নিরসনের তাগিদে গবেষকদের জন্য সহজ একটি অনুদান পদ্ধতির চিন্তা করা হয়, যেটি স্বল্প পরিসরে হলেও উপরোক্ত পদ্ধতির পাশাপাশি কাজ করবে। ব্যক্তিগত বা দলগতভাবে কেউ কোনো সমস্যার গভীরে প্রবেশ করতে চাইলে তাকে বা তাদের সাহায্য করবে। প্রয়োজনে গবেষকরা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে সঙ্গে রাখতে চাইলে তা পারবেন। এভাবে গবেষকদের মেধা যাচাই, মেধা লালন, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং উদ্ভাবনে সহায়ক প্রয়োজনীয় জ্ঞান উদ্ভাবন, কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন, সর্বোপরি কৃষকের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ইত্যাদির জন্য একটি টেকসই অর্থ অনুদান কৌশলের প্রয়োজনে কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন বা কেজিএফের জন্ম হয়।

কেজিএফ প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০৭ সালে। এটি একটি কম্পানি অ্যাক্ট-১৯৯৪ ভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। ১৫ সদস্যের জেনারেল বডি নীতিনির্ধারণ, বাজেট ও বার্ষিক প্রতিবেদন অনুমোদন করে থাকে। এই ১৫ সদস্য থেকে সাত সদস্য নিয়ে একটি বোর্ড অব ডিরেক্টরস গঠন করা হয়। বোর্ড অব ডিরেক্টরস কেজিএফের উদ্দেশ্যগুলো যথাযথভাবে অর্জিত হচ্ছে কি না, তা দেখভাল করে থাকে। কেজিএফের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাও এই বোর্ডের হাতে। প্রধান নির্বাহী হিসেবে নির্বাহী পরিচালক বোর্ড অব ডিরেক্টরসের নির্দেশনা অনুসারে কেজিএফের যাবতীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকেন।

শুরুতে কেজিএফের কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য তার নিজস্ব কোনো অর্থ ছিল না।

National Agricultural Technology Project phase-1 (NATP-1)-এর সহায়তায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে শুরু করে ২০০৮ থেকে।

 NATP-1-এর অর্থের জোগানদাতা ছিল বিশ্বব্যাংক,  IFAD এবং বাংলাদেশ সরকার। একই সময়ে কেজিএফকে টেকসই অনুদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড় করানোর তাগিদে সরকার Bangladesh Krishi Gobeshona Endowment Trust (BKGET) নামে একটি ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করে তার হাতে  Seed money হিসেবে কিছু অর্থ তুলে দেয়। তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয় কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মহোদয়কে। কেজিএফ প্রয়োজন অনুসারে ওই ট্রাস্টকে অর্থের চাহিদা জানালে ট্রাস্ট সেটি যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে বরাদ্দ দিয়ে থাকে। এভাবেই কেজিএফের কার্যক্রম চলে আসছে।

কেজিএফ কৌশলগত গবেষণাসহ মৌলিক, ফলিত ও অভিযোজন সংক্রান্ত গবেষণায় অনুদান দিয়ে থাকে। মৌলিক গবেষণার মাধ্যমে কৃষিবিজ্ঞানের যেকোনো শাখায় নতুন জ্ঞান উদঘাটন করা হয়। এই জ্ঞানকে প্রয়োগ উপযোগী করার জন্য মাঠ পর্যায়ে ফলিত গবেষণা করা হয়। ফলিত গবেষণায় উপযোগী প্রমাণিত হলে তা বিভিন্ন পরিবেশে কৃষকের মাঠে নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। কৃষকের চাহিদা কতখানি পূরণ সম্ভব, তা এই পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়ে যায়। এটি প্রযুক্তির অভিযোজন পরীক্ষা। অতঃপর কৃষক যদি গ্রহণ করে, তাহলে বুঝতে হবে প্রযুক্তিটি টেকসই হয়েছে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠিত প্রযুক্তি নিয়ে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অর্জনের উদ্দেশ্যে কৌশলগত গবেষণা করা হয়। এই পদ্ধতি কিছুটা লম্বা সময় ধরে চলে। কৃষিবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার সমন্বয়ে একাধিক সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান একযোগে এ ধরনের কার্যক্রমে শরিক হয়।

কেজিএফের অনুদানের প্রধান উপজীব্য হলো—ক্ষুধা, পুষ্টি সমস্যার নিরসন এবং কৃষকের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন। আমাদের সমস্যার শেষ নেই। তাই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমস্যা নির্ধারণ করা হয়। এ জন্য গবেষকরা নিজেদের বিচার-বিবেচনা দিয়ে সমস্যা চিহ্নিত করতে পারেন। তবে এ ক্ষেত্রে কেজিএফ নিজে তৎপর হয়ে অভিজ্ঞ কৃষিবিজ্ঞানীদের দ্বারা গঠিত নিজস্ব কারিগরি উপদেষ্টা কমিটি (Technical Advisory Committee বা TAC) আলোচনা সাপেক্ষে কৃষির বিভিন্ন কম্পোনেন্টের (কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ, কৃষি যন্ত্রায়ন, কৃষি অর্থনীতি) অধীনে গবেষণার জন্য বিভিন্ন থিমেটিক এরিয়া নির্দিষ্ট করে থাকে। যা হোক, থিমেটিক এরিয়ার অধীনে গবেষণা ইস্যু ঠিক করার পর একটি ইংরেজি পত্রিকা, একটি বাংলা পত্রিকা এবং কেজিএফের নিজস্ব ওয়েবসাইটের মাধ্যমে Concept note (preproposal) চাওয়া হয়। এ জন্য প্রয়োজনীয় ফরম্যাট ওয়েবসাইটে দেওয়া আছে। তবে সময় ও শ্রম বাঁচাতে সাম্প্রতিক সময়ে  Concept note -এর জন্য অপেক্ষা না করে সরাসরি প্রকল্প চাওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া কিছু গবেষক পত্রিকায় প্রকল্প চাওয়ার অপেক্ষায় না থেকে প্রকল্প জমা দিয়ে থাকেন। সেগুলোকে এত দিন অন্তর্বর্তীকালীন প্রকল্প হিসেবে বিবেচনায় আনা হয়েছে। যা হোক, প্রাথমিক বাছাই করে প্রকল্পগুলো কারিগরি উপদেষ্টা কমিটির মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ রিভিউয়ারের কাছে পাঠানো হয়। রিভিউয়ার শুধু প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা বা বৈজ্ঞানিক উপযোগিতাই দেখেন না, তিনি প্রকল্পের জন্য প্রযোজ্য অর্থের চাহিদা, ব্যবস্থাপনা, সংশ্লিষ্ট গবেষক ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা ইত্যাদিও বিচার-বিবেচনা করে থাকেন। পরে কারিগরি উপদেষ্টা কমিটি রিভিউয়ারের দেওয়া স্কোরের ওপর ভিত্তি করে কিছু প্রকল্প বাছাই করে এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্প ইনভেস্টিগেটরদের মৌখিক উপস্থাপনের জন্য আহ্বান করে। সামগ্রিক বিচারে নির্ধারিত স্কোরপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলোকে কারিগরি উপদেষ্টা কমিটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য বোর্ড অব ডিরেক্টরসের বরাবর প্রেরণ করে। কারিগরি উপদেষ্টা কমিটি অনুমোদিত সব প্রকল্পই পাস হবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।

শেষ কথা হলো, কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন থেকে দেওয়া অনুদানের পরিমাণ নিয়ে অনেকের মধ্যে কিছু ভুল ধারণা আছে। কারণ অতীতে অনুদানের সময় কেজিএফের Operational Manualযথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে সংস্করণে পরিষ্কার বলা আছে, একটি প্রতিষ্ঠান বা একটি ডিসিপ্লিনের জন্য বাজেট কোনোক্রমেই ৫০ লাখ টাকার বেশি হবে না। যদি একাধিক প্রতিষ্ঠান বা ডিসিপ্লিন জড়িত থাকে, তাহলে বাজেট ৮০ লাখ টাকার মধ্যে হতে হবে।

অনুদানের পরিমাণ অল্প হলে বেশিসংখ্যক গবেষককে কাজে লাগানো যায়। ফলে বৈচিত্র্যময় প্রযুক্তি উদ্ভাবনের পাশাপাশি ভবিষ্যতে গবেষণা করার জন্য বেশি বেশি মানবসম্পদ তৈরি সম্ভব। কেজিএফ তার সীমিত সাধ্যের মধ্য দিয়ে একটি নির্ধারিত মাইলস্টোন অর্জনে সাহায্য করে মাত্র। সেটি অর্জিত হলে সীমিত পরিসরে পাইলটিংয়ের চিন্তা-ভাবনা করা যেতে পারে। সেখানে সাফল্য অর্জিত হলে গবেষক সরকারের কাছে আরো বড় আকারে প্রকল্প জমা দিতে পারেন। কিন্তু কোনোক্রমেই সেটি কেজিএফের কাছে নয়। তাই প্রকল্প তৈরি করার আগে গবেষকদের কেজিএফের ওয়েবসাইটে গিয়ে তার অপারেশনাল ম্যানুয়াল ভালোভাবে পড়ে নিতে হবে। কারণ এই ম্যানুয়ালে অনুদানের ধরন, অনুদানের সীমা, প্রকল্প পরিচালনা এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি—সবই বিস্তারিত বর্ণনা করা আছে।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন

সাবেক মহাপরিচালক, ব্রি



সাতদিনের সেরা