kalerkantho

সোমবার । ৯ কার্তিক ১৪২৮। ২৫ অক্টোবর ২০২১। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

তাইওয়ান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অস্পষ্টতা

অনলাইন থেকে

১৩ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চীনা প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সাম্প্রতিক সময়ে ঘোষণা, তাইওয়ানের সঙ্গে পুনর্মিলন ‘একটি ঐতিহাসিক কাজ, যা অবশ্যই পূরণ করতে হবে এবং নিশ্চিতভাবেই পূরণ করা হবে’। দ্বীপটির এয়ার ডিফেন্স জোনের ভেতরে চীনা যুদ্ধবিমানের উসকানিমূলক আচমকা হানা দেওয়ার ঘটনাটি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এর বিপরীতে আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য যা কিছু করতে হয় তা-ই করা হবে—তাইওয়ানের নেতাদের এ ধরনের বেপরোয়া বক্তব্যে জটিলতা বাড়ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও প্রতিবেশী দেশগুলো অস্বস্তিতে রয়েছে। তাহলে যুদ্ধ কি আসন্ন?

বেশির ভাগ বিশ্লেষক মনে করেন, না, অন্তত এখনই নয়। আগের মৌখিক আক্রমণের বিপরীতে সেদিনের গ্রেট হল অব দ্য পিপলসে দেওয়া ভাষণে শি যাদের ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ বলে অভিহিত করেছেন, তাদের পরাজিত করতে তিনি শক্তি প্রয়োগের প্রকাশ্য হুমকি এড়িয়ে গেছেন। তবে চীনা নৌবাহিনী আক্রমণ পরিচালনার জন্য ঠিকই প্রয়োজনীয় উভচর যুদ্ধজাহাজ ও ল্যান্ডিং ক্রাফট (তীরে ভেড়ার উপযোগী সামরিক নৌযান) তৈরি করছে। তাইওয়ানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী চিউ কুও-চেং ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে বেইজিং ২০২৫ সাল নাগাদ আক্রমণ চালাতে প্রস্তুতি নিচ্ছে।

আপাতত শি তাঁর সময়ের বাস্তবতা মেনে নিয়েছেন বলে মনে হচ্ছে, যিনি সশস্ত্র সংঘাতের পরিণতি সম্পর্কে সচেতন। এর একটি হতে পারে আমেরিকার সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাত। কারণ তাইওয়ান বিষয়ে আমেরিকার দীর্ঘদিনের ‘কৌশলগত অস্পষ্টতা’ নীতিটি দিন দিন আরো রহস্যময় হয়ে উঠছে। ওয়াশিংটন তাইওয়ানকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না আবার অস্ত্র বিক্রি, কূটনৈতিক যোগাযোগ, মার্কিন বিশেষ বাহিনী ও মেরিন সেনাদের উপস্থিতি বৃদ্ধি করেছে। গত সপ্তাহে প্রকাশিত এই তথ্য ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতি আরো দৃঢ়তা প্রদান করেছে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস ও এর মিত্রদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে যে জো বাইডেনের অধীনে চীনা ইস্যু এবং বিশেষ করে তাইওয়ান সম্পর্কে মার্কিন নীতি উদ্বেগের মধ্য দিয়ে চলছে কি না। বাইডেন অবশ্য ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর দৃষ্টিভঙ্গির বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা বজায় রেখেছেন। তিনি দুই দেশের মধ্যে ‘চরম প্রতিযোগিতার’ কথা উল্লেখ করেছেন, তাইওয়ানের প্রতি ‘অনড়’ সমর্থন প্রকাশ করেছেন এবং সমর্থন পেতে যুক্তরাজ্য ও ন্যাটো দেশগুলোকে একত্র করেছেন। এর পরও যুক্তরাষ্ট্রের কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনের সভাপতি রিচার্ড হাস মনে করেন, বৈপরীত্য ও বিভ্রান্তি মার্কিন চিন্তা-ভাবনাকে বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি সম্প্রতি লিখেছেন, ‘চীনকে বাধা দেওয়ার জন্য সামরিক ব্যয়ের নিরন্তর বৃদ্ধি এবং শক্তি প্রয়োগের জন্য আরো বেশি ইচ্ছার প্রয়োজন হবে।’

শি চিনপিংয়ের উপদেষ্টারা সন্দেহাতীতভাবেই আমেরিকার এই বৈপরীত্য বা দোদুল্যমান সম্পর্কে সচেতন। তাঁরা জানেন, জলবায়ু সংকট, বৈশ্বিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি, পরমাণু বিস্তার এবং আফগানিস্তান ও কোরিয়ার মতো আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জসহ যেসব সমস্যা ওয়াশিংটন একা মোকাবেলা করতে পারবে না, সেসব ক্ষেত্রে বাইডেন চীনের সহায়তা চান। শির উপদেষ্টারা এটিও জানেন যে বাইডেন নিজের ঘর নিয়ে ব্যস্ত, যা মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিপদের কারণ হতে পারে।

গত সপ্তাহে জুরিখে বাইডেনের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেক সুলিভানের সঙ্গে দেখা করার সময় চীনা কর্মকর্তারা দৃশ্যত যে তাচ্ছিল্যপূর্ণ মনোভাব প্রদর্শন করেছিলেন, তা ব্যাখ্যা করতে এই বিবেচনাগুলো সহায়তা করতে পারে। সেখানে এজেন্ডার শীর্ষে ছিল তাইওয়ান। উভয় পক্ষই পরবর্তীকালে শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রতি তাদের অঙ্গীকারের পুনর্ব্যক্ত করে। কিন্তু শির সঙ্গে সরাসরি আলোচনার জন্য বাইডেনের নতুন করে অনুরোধ আবারও একটি শীতল প্রতিক্রিয়ার দেখা মেলে। এতে মনে হচ্ছে, শি তাঁর অবস্থানগত শক্তিকে বেশি করে দেখছেন, যা ভবিষ্যতের মারাত্মক ভুল হিসাবের বার্তা দেয়। তাইওয়ানকে আয়ত্তে আনতে এবং কমিউনিস্ট চীনের জন্মের ১০০ বছর পর এর একত্রীকরণ সম্পন্ন করার মধ্য দিয়ে নিজের উত্তরাধিকার সুরক্ষিত রাখার যে সংকল্প শির রয়েছে, তা নিয়ে কারো সন্দেহ থাকা উচিত নয়।

তবে চীনের দিক থেকেও বিপদ রয়েছে। কয়েক দশকের প্রবৃদ্ধি এবং প্রভাব সম্প্রসারণের পর আক্ষরিক অর্থে শির চীনে গ্যাস ফুরিয়ে আসছে। দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি ঘাটতির মধ্যে দেশটির অর্থনীতি ধীরগতিতে চলছে। রাষ্ট্রীয় ঋণ বাড়ছে, উত্পাদনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে এবং কর্মীরা (ওয়ার্কফোর্স) বুড়িয়ে যাচ্ছে। পরিবেশগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত জমিতে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে, যেখানে তারা বিশ্বের বৃহত্তম খাদ্য আমদানিকারক দেশ। এর মধ্যেই শির আক্রমণাত্মক নীতি এবং ‘নেকড়ে যোদ্ধা’ কূটনীতির কারণে চীনের বন্ধুর অভাব বাড়ছে।

চীন এখন এমন একটি দেশ, যে তার ক্ষমতা ও  গৌরবের স্বপ্ন নিয়ে আশঙ্কায় থাকে যে তা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। বিভক্ত আমেরিকা এখন এমন এক দেশ, যে তার নিজের মন ঠিকমতো জানে না। গণতন্ত্র ও কর্তৃত্ববাদের মধ্যে বৈশ্বিক আদর্শগত সংগ্রামের প্রতীক এখন নির্ভীক তাইওয়ান। এগুলো বিপর্যয়ের উপাদান। এখন এই বিষয়গুলোকে স্বীকৃতি  দেওয়া এবং সমাধান করা ভবিষ্যৎ বিপর্যয় রোধ করতে পারে।

সূত্র : দ্য অবজারভার (যুক্তরাজ্য)

ভাষান্তর : আফছার আহমেদ

 



সাতদিনের সেরা